মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে বিশ্বের শীর্ষ ধনী দেশ কারা

কোনো একটি দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিয়ে কথা বলতে গেলে প্রথমেই মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রবৃদ্ধি সামনে আসে। এটি মূলত একটি দেশের অর্থনীতির আকার সম্পর্কে ধারণা দেয়। একটি দেশের জনগণের মাথাপিছু আয় তাদের সমৃদ্ধি ও জীবনমান সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেয়। এই মানদণ্ড বোঝায়, ওই দেশের মানুষ কতটা ধনী।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সূচক বিশ্লেষণ করে ২০২৫ সালের বিশ্বের শীর্ষ ১০টি দেশের তালিকা করা হয়েছে। জেনে নেওয়া যাক বর্তমান বিশ্বের সেরা ধনী দেশ কারা, কীভাবে এ অবস্থানে উঠে এসেছে সেসব সম্পর্কে।

লিচেনস্টাইন

কৃষিনির্ভর সমাজ থেকে আজ উদ্ভাবননির্ভর শিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে লিচেনস্টাইন
ফাইল ছবি: রয়টার্স

ইউরোপের দেশ লিচেনস্টাইন। মাত্র ৬২ বর্গমাইল (১৬০ বর্গকিলোমিটার) আয়তনের দেশটি বিশ্বের ষষ্ঠ ক্ষুদ্রতম দেশ। কিন্তু ধনী দেশের তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছে। দেশটির মাথাপিছু আয় ২ লাখ ১ হাজার ১১২ ডলার।

একসময়ের কৃষিনির্ভর সমাজ থেকে রূপান্তরিত হয়ে আজ উদ্ভাবননির্ভর শিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। অর্থনীতি মূলত আধুনিক উৎপাদনশিল্প, বিশেষায়িত যন্ত্রপাতি, দন্তচিকিৎসা-সংক্রান্ত পণ্য এবং একটি শক্তিশালী আর্থিক সেবা খাতের ওপর ভর করে এগিয়ে চলছে।

সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকায় দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা আরও মজবুত হয়েছে। দেশটির মুদ্রাবাজারে সুইস ফ্রাঁ চলে। এ ছাড়া ইউরোপীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল ও ইউরোপীয় মুক্তবাণিজ্য সংস্থার মাধ্যমে বিশেষ বাজার সুবিধা পায় তারা। ছোট দেশ হলেও ক্রেডিট রেটিং এএএ। এ ছাড়া দেশটির বেকারত্বের হার খুবই কম। উৎকর্ষতার পেছনে রয়েছ গবেষণা ও উন্নয়নে ধারাবাহিকভাবে বিপুল বিনিয়োগ।

সিঙ্গাপুর

একসময়ের দরিদ্র বন্দরনগরী থেকে সিঙ্গাপুর বৈশ্বিক ব্যবসা ও প্রযুক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে
ফাইল ছবি: রয়টার্স

আরেকটি ছোট দেশ সিঙ্গাপুর। এশিয়ার দেশটির উত্থানের গল্প বিস্ময়কর। একসময়ের দরিদ্র বন্দরনগরী থেকে দেশটি আজ বৈশ্বিক ব্যবসা ও প্রযুক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

১৯৬৫ সাল থেকে সিঙ্গাপুর রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধি, সুশাসন ও শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ধারাবাহিক উন্নয়নের পথে এগিয়ে এসেছে। বতর্মানে দেশটির মাথাপিছু আয় ১ লাখ ৫৬ হাজার ৯৬৯ ডলার।

সিঙ্গাপুরের অর্থনীতি মূলত উৎপাদন, আর্থিক খাত, বাণিজ্য ও ডিজিটাল সেবার ওপর নির্ভরশীল। বিশ্বব্যাংকের হিউম্যান ক্যাপিটাল ইনডেক্সে দেশটির অবস্থান প্রথম।

লুক্সেমবার্গ

ধনী দেশের তালিকায় চতুর্থ অবস্থানে ইউরোপের দেশ লুক্সেমবার্গ
ফাইল ছবি: রয়টার্স

ধনী দেশের তালিকায় চতুর্থ অবস্থান ইউরোপের দেশ লুক্সেমবার্গের। দেশটির মাথাপিছু আয় ১ লাখ ৫২ হাজার ৩৯৫ হাজার টাকা।

লুক্সেমবার্গের অর্থনীতি প্রধানত শক্তিশালী আর্থিক সেবা খাতনির্ভর। যুক্তরাষ্ট্রের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিনিয়োগ তহবিল কেন্দ্র হিসেবে স্থান করে নিয়েছে দেশটি।

এ খাত মূলত আন্তসীমান্ত তহবিল, বেসরকারি ব্যাংকিং ও বিমা খাতে কেন্দ্রীভূত, যা আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারকে আকর্ষণ করছে। আরও শক্তিশালী অবস্থান নিশ্চিত করতে লুক্সেমবার্গ গ্রিন এক্সচেঞ্জ ইতিমধ্যে এক লাখ কোটি ডলারের বেশি টেকসই বন্ড তালিকাভুক্ত করেছে, যা দেশটিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) শীর্ষস্থানীয় সবুজ অর্থনীতি কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

আয়ারল্যান্ড

আয়ারল্যান্ডের আয়োর উৎস প্রযুক্তি, ফার্মাসিউটিক্যাল ও আর্থিক খাত
ফাইল ছবি: রয়টার্স

আয়ারল্যান্ডের অর্থনৈতিক উত্থান প্রধানত প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) পরিচালিত। বিশেষ করে প্রযুক্তি, ফার্মাসিউটিক্যাল ও আর্থিক খাত থেকে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য পদ ও উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন শ্রমশক্তিও দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরও শক্তিশালী করেছে। দেশটির মাথাপিছু আয় ১ লাখ ৪৭ হাজার ৮৭৮ ডলার।

কাতার

কাতারের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রধান ভিত্তি প্রাকৃতিক গ্যাসের বিপুল ভান্ডার
ফাইল ছবি: রয়টার্স

মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতার। দেশটির সমৃদ্ধির প্রধান ভিত্তি প্রাকৃতিক গ্যাসের বিপুল ভান্ডার। এ ছাড়া তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানিকারক হিসেবে অবস্থানের কারণে বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

জ্বালানি খাতের আয় দেশটির অবকাঠামো, জনসেবা ও বৃহৎ অর্থনীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সহায়তা করেছে। কাতার ন্যাশনাল ভিশন ২০৩০ সালের মাধ্যমে পর্যটন, শিক্ষা ও ব্যাংকিং খাতে সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। এ ছাড়া এলএনজি খাতের সম্প্রসারণের মাধ্যমে আগামী কয়েক বছরে দেশটির প্রবৃদ্ধি আরও বাড়াবে।

নরওয়ে

পশ্চিম ইউরোপে সবচেয়ে বেশি তেল ও গ্যাসের খনি রয়েছে নরওয়েতে
ফাইল ছবি: রয়টার্স

ইউরোপের দ্বিতীয় জনবহুল রাষ্ট্র নরওয়ে। পশ্চিম ইউরোপে সবচেয়ে বেশি তেল ও গ্যাসের খনি রয়েছে দেশটিতে। পশ্চিম ইউরোপীয় দেশগুলোতে সবচেয়ে বেশি পেট্রোলিয়াম সরবরাহ করে নরওয়ে। দেশটির জনগণের মাথাপিছু আয় ১ লাখ ৬ হাজার ৬৯৪ মার্কিন ডলার।

তেল খাত থেকে প্রাপ্ত আয় তাৎক্ষণিকভাবে খরচ না করে নরওয়ে সরকার প্রায় সব পেট্রোলিয়াম আয়কে একটি তহবিলে বিনিয়োগ করে। ২০২৫ সালে তহবিলে ২ লাখ কোটি ডলারের বেশি জমা পড়েছে, যা বিশ্বের সবচেয়ে বড় সার্বভৌম সম্পদ তহবিল।

কঠোর অর্থনৈতিক নিয়ম মেনে তহবিল থেকে সীমিত একটি অংশ প্রতিবছর জাতীয় বাজেটে ব্যবহার করা যায়। এই পদ্ধতি মূল্যস্ফীতি, চাহিদা ও উৎপাদনের সমন্বয় করতে সাহায্য করে। পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সম্পদ সংরক্ষণ নিশ্চিত করে।

সুইজারল্যান্ড

ইউরোপের দেশ সুইজারল্যান্ড অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি
ফাইল ছবি: এএফপি

পর্যটকদের কাছে স্বপ্নের দেশ সুইজারল্যান্ড। ইউরোপের এ দেশে রয়েছে অপরূপ প্রাকৃতিক নৈসর্গিক সৌন্দর্য। পাশাপাশি অর্থনীতিও বেশ স্থিতিশীল।

রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা, স্থিতিশীল প্রতিষ্ঠান ও দামি রপ্তানি পণ্যের ওপর ভিত্তি করে সুইজারল্যান্ডের সমৃদ্ধিশালী হয়েছে। মূল্যবান ধাতু, যন্ত্রপাতি এবং কম্পিউটার ও মেডিকেল ডিভাইস রপ্তানি করেও প্রচুর টাকা উপার্জন করে দেশটি। সুইজারল্যান্ডের জনগণের মাথাপিছু আয় ৯৭ হাজার ৬৫৯ মার্কিন ডলার।

ব্রুনেই

তেল ও গ্যাস খাত ব্রুনেইকে সাফল্য এনে দিয়েছে
ফাইল ছবি: এএফপি

এশিয়ার দেশ ব্রুনেই। দেশটির জনসংখ্যা বেশ কম। জ্বালানি খাতের মাধ্যমে অর্জিত আয় মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির প্রধান কারণ। বতর্মানে দেশটির মাথাপিছু আয় ৯৪ হাজার ৪৭২ ডলার।

২০২৪ সালে ব্রুনেই দারুসসালাম ৪ দশমিক ২ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, যা ১৯৯৯ সালের পর সবচেয়ে বেশি।

তেল ও গ্যাস খাতের সাফল্য ব্রুনেইকে এ অবস্থায় নিয়ে এসেছে। ২০২৪ সালে দেশটি আসিয়ান অঞ্চলের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে।

গায়ানা

জ্বালানি তেল গায়নার আয়ের বড় উৎস
ছবি: রয়টার্স

গায়ানা দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির একটি দেশ। ধনী দেশের তালিকায় দেশটির অবস্থান নবম। মাথাপিছু আয় ৯৪ হাজার ১৮৯ ডলার।

সম্প্রতি সমুদ্রে তেল আবিষ্কারের পর নিম্ন-আয়ের দেশ থেকে প্রধান জ্বালানি তেল রপ্তানিকারক দেশে পরিণত করেছে। এ ছাড়া দ্রুত জিডিপি বৃদ্ধি, কম ঋণ ও প্রাকৃতি সম্পদের তহবিলের মাধ্যমে সম্পদের সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা দেশটির অবকাঠামো ও মানবসম্পদে বিনিয়োগকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

১০

যুক্তরাষ্ট্র

মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র
ফাইল ছবি: এএফপি

যুক্তরাষ্ট্র এখনো জিডিপি অনুযায়ী বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে রয়েছে। দেশটির বর্তমান মাথাপিছু আয় ৮৯ হাজার ৫৯৮ ডলার।

উদ্ভাবনভিত্তিক অর্থনীতি থেকে দেশটির আয় হয়। প্রযুক্তি, আর্থিক সেবা, স্বাস্থ্যসেবা ও উন্নত উৎপাদনশিল্প অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। এ ছাড়া বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়, শক্তিশালী পুঁজিবাজার ও উচ্চ উৎপাদনশীলতা যুক্তরাষ্ট্রকে বড় দেশ হওয়া সত্ত্বেও বিশ্বের ধনী দেশগুলোর মধ্যে স্থান করে দিয়েছে।