এআই দিয়ে কীভাবে বোমা তৈরি, হামলার পরিকল্পনা ও যুদ্ধকৌশল ঠিক করছে আইএস

যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো বোমা তৈরি, হামলার পরিকল্পনা ও যুদ্ধকৌশল নির্ধারণসহ নানা কাজে এআই ব্যবহার করছে। বোকো হারামের সাবেক ২৭ সদস্যের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে গবেষণাটি করা হয়েছে। এতে শুধু ২০২৩ ও ২০২৪ সালে এআই ব্যবহারের তথ্য উঠে এসেছে। গোষ্ঠীগুলো এখনকার আরও উন্নত এআই মডেল ব্যবহার করতে পারলে পরিস্থিতি কতটা গুরুতর হতে পারে, তা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

নাইজেরিয়ার গামবারুতে বিদ্রোহী গোষ্ঠী বোকো হারামের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নিয়োজিত মধ্য আফ্রিকার দেশ চাদের এক সেনাসদস্য। ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ফাইল ছবি: রয়টার্স

যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, নাইজেরিয়াভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠী বোকো হারামের যোদ্ধারা আরও শক্তিশালী বোমা তৈরি, হামলার পরিকল্পনা এবং যুদ্ধের সময় বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন (এআই) চ্যাটবট ব্যবহার করছেন।

গবেষকেরা বোকো হারামের দুটি উপদলের সাবেক ২৭ সদস্যের সঙ্গে কথা বলেছেন। উপদল দুটি হলো আইএসআইএল-সংশ্লিষ্ট ইসলামিক স্টেট ওয়েস্ট আফ্রিকা প্রভিন্স (আইএসডব্লিউএপি) ও জামা’আত আহল আস-সুন্নাহ লিদ-দাওয়াহ ওয়াল-জিহাদ (জেএএস)।

এ ২৭ সদস্যের বেশ কয়েকজন বলেছেন, হামলার আগে, হামলার সময় এবং হামলার পর নিয়মিতভাবে প্রযুক্তিগত ও সামরিক পরামর্শের উৎস হিসেবে তাঁরা স্যাম অল্টম্যানের নেতৃত্বাধীন ওপেনএআইয়ের চ্যাটজিপিটি, অ্যানথ্রপিকের ক্লদ, গুগলের জেমিনাই, ইলন মাস্কের গ্রক, মার্ক জাকারবার্গের মেটা এআই ও চীনের ডিপসিক ব্যবহার করেছেন।

আল-জাজিরার হাতে আসা বিশেষ কিছু নথিপত্র থেকেও বৃহত্তর আইএসআইএল (আইএসআইএস) আন্দোলনের সমর্থকেরা এআইয়ের নিরাপত্তাব্যবস্থা এড়িয়ে যাওয়া ও অস্ত্র-সংক্রান্ত তথ্য পাওয়ার নির্দেশনা কীভাবে নিজেদের মধ্যে ছড়িয়ে দিচ্ছেন, জানা গেছে।

সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা সংগঠন টেক এগেইনস্ট টেররিজমের গবেষকেরা আইএসআইএলপন্থী একটি প্রযুক্তিবিষয়ক ফোরামে অনুপ্রবেশ করতে সক্ষম হন। সেখানে আইএস সমর্থকেরা একে অপরকে কীভাবে এআই ব্যবহার করতে হবে ও এর নিরাপত্তাবিধিনিষেধ এড়িয়ে যেতে হবে, সে বিষয়ে নির্দেশনা দিচ্ছিলেন।

আইএসআইএল ও এর সহযোগী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে, এমন এক উদ্বেগের মধ্যে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার ফলাফলটি প্রকাশ করা হলো। গত ফেব্রুয়ারিতে জাতিসংঘের কর্মকর্তারা নিরাপত্তা পরিষদকে সতর্ক করে বলেছিলেন, আইএসআইএল ও এর সহযোগী গোষ্ঠীগুলো উন্নত এআইয়ের ব্যবহার বাড়িয়েছে।

একই সময়ে গবেষক ও প্রযুক্তি খাতের বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি সতর্ক করে বলেছেন, ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে ওঠা এআই সিস্টেম নিরাপত্তাব্যবস্থার চেয়ে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অনিয়ন্ত্রিত অগ্রগতি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর জন্য প্রযুক্তিটির অপব্যবহার করাকে আরও সহজ করে তুলছে বলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

আইএসডব্লিউএপির সাবেক এক কমান্ডার গবেষকদের বলেন, ‘এমন কোনো প্রশ্ন নেই, যার উত্তর আমরা (এআইয়ের কাছে) পাইনি।’

বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা কোম্পানি টেসলার প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক। এআই প্রতিষ্ঠান এক্সএআইও তাঁর নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠান
ফাইল ছবি: রয়টার্স

প্রজেক্টর থেকে রণক্ষেত্রে

বোকো হারামের সাবেক যোদ্ধারা জানান, নাইজেরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রিত একটি ঘাঁটির গভীরে এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য একটি অত্যন্ত সুসংগঠিত ও অত্যাধুনিক ব্যবস্থা রয়েছে।

কেমব্রিজের গবেষণা অনুযায়ী, প্রযুক্তিতে দক্ষ কিছু কর্মী আইএসডব্লিউএপি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় গিয়ে সংগঠনটির জ্যেষ্ঠ সদস্যদের এআই ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দিতেন। বাছাই করা যোদ্ধাদের ল্যাপটপ ও প্রজেক্টরের সামনে একটি কক্ষে জড়ো করা হতো। সেখানে চ্যাটবটকে কীভাবে প্রশ্ন করতে হয় এবং বিপজ্জনক অনুরোধের উত্তর দেওয়া ঠেকাতে তৈরি নিরাপত্তাব্যবস্থা কীভাবে এড়িয়ে যেতে হয়, তা দেখানো হতো।

সাবেক এক কমান্ডার স্মৃতিচারণা করেন, ‘কিছু শ্বেতাঙ্গ লোক এসে আমাদের শেখাতেন। তাঁরা শীর্ষ পর্যায়ের লোকদের একটি কক্ষে জড়ো করে এটি কীভাবে কাজ করে, তা প্রজেক্টরের মাধ্যমে বড় পর্দায় দেখাতেন।’

গবেষণায় উদ্ধৃত সাবেক যোদ্ধাদের ভাষ্যমতে, প্রশিক্ষকেরা গোপনীয়তা ও এনক্রিপশন সরঞ্জামসহ ল্যাপটপ সরবরাহ করতেন। পাশাপাশি সদস্যদের জন্য একাধিক এআই প্ল্যাটফর্মে অ্যাকাউন্ট খোলা এবং অর্থের বিনিময়ে নেওয়া সাবস্ক্রিপশনের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। সাক্ষাৎকারে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা বারবার বলেছেন, বৃহত্তর আইএসআইএল আন্দোলন থেকেই তাঁরা এআই ব্যবহারের প্রশিক্ষণ পেয়েছেন।

কিছু শ্বেতাঙ্গ লোক এসে আমাদের শেখাতেন। তাঁরা শীর্ষ পর্যায়ের লোকদের একটি কক্ষে জড়ো করে এটি কীভাবে কাজ করে, তা প্রজেক্টরের মাধ্যমে বড় পর্দায় দেখাতেন।

গবেষণায় বলা হয়, এরপর যা ঘটেছে, তা ছিল কোনো কোনো যোদ্ধার ব্যক্তিগতভাবে মাঝেমধ্যে চ্যাটজিপিটি ব্যবহারের চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত। আইএসডব্লিউএপি ও জেএএস, এ দুই গোষ্ঠী বিশেষায়িত কার্যক্রম সম্পর্কে জ্ঞান থাকা ব্যক্তিদের নিয়ে আলাদা এআই ইউনিট গড়ে তুলেছে। এসব ইউনিটে প্রকৌশলী, অস্ত্রবিশেষজ্ঞ ও বোমা তৈরির কারিগরেরাও রয়েছেন।

জেএএসের সাবেক এক কমান্ডার ২৩ সদস্যের একটি বিশেষায়িত ইউনিটের কথা জানিয়েছেন। সৌরবিদ্যুৎ–চালিত একটি কক্ষে বসে ইউনিটের সদস্যরা প্রশ্নের উত্তর দিতেন, তথ্য বিশ্লেষণ করতেন ও ল্যাপটপ ঘিরে জড়ো হওয়া জ্যেষ্ঠ কমান্ডারদের প্রশিক্ষণ দিতেন।

বোকো হারামের সাবেক এক কমান্ডার বলেন, ‘আমি কীভাবে বোমা তৈরি করতে পারি? এমন প্রশ্নের জবাবে এটি (এআই) আপনাকে কীভাবে (বোমা বানাতে হবে, তা) বলে দেবে। এটি মানুষের মতো একটি রোবট। এটি আমরা বিপুল পরিমাণে ব্যবহার করেছি।’

গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রায় সময় বোমা তৈরির কারিগরেরা তাঁদের (বোকো হারামের সদস্যের) পাশে ল্যাপটপ রাখতেন। বিস্ফোরক ডিভাইস তৈরির সময় কোনো সমস্যায় পড়লেই তাঁরা প্রতিবারই চ্যাটবটের কাছে ফিরে যেতেন।

নাইজেরিয়ার অজ্ঞাত একটি স্থানে কথা বলছেন বোকো হারামের নেতা আবুবকর শেকাউ। ২০১৮ সালের ১৫ জানুয়ারি পাওয়া তারিখবিহীন একটি ভিডিও থেকে ছবিটি নেওয়া। ২০২১ সালের মে মাসে প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠী আইএসডব্লিউএপির হামলায় তিনি নিহত হন
ফাইল ছবি: রয়টার্স

এআই দিয়ে বোমা তৈরি

কেমব্রিজের গবেষণার লেখক আন্তোনিয়া জুয়েলিশ আল-জাজিরাকে বলেন, সাক্ষাৎকার দেওয়া ২৭ জনের মধ্যে প্রায় ১০ জন বিস্ফোরক তৈরির ক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের কথা জানিয়েছেন। এর মধ্যে বোমাকে আরও শক্তিশালী করার ও সামরিক সরঞ্জাম থেকে বিস্ফোরক উপাদান সংগ্রহের চেষ্টার কথাও রয়েছে।

যোদ্ধারা এআই থেকে শুধু অস্ত্র–সম্পর্কিত তথ্য পাচ্ছিলেন, এটি জুয়েলিশের কাছে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় ছিল না। কারণ, এসব তথ্যের অনেক কিছু আগে থেকেই বিভিন্ন নির্দেশিকা ও অনলাইনে পাওয়া যায়; বরং এআই তাঁদের নির্দিষ্ট সমস্যার সমাধান দিতে পারছিল-জুয়েলিশের কাছে এটাই সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় বলে মনে হয়েছে।

জুয়েলিশ যোদ্ধাদের এমন কিছু ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন, যেখানে তাঁরা নিজেদের হাতে থাকা সীমিত উপকরণ ব্যবহার করে বিস্ফোরকের কার্যকারিতা কীভাবে বাড়ানো যায়, তা জানতে এআইকে প্রশ্ন করেছিলেন। সাধারণ নির্দেশনা খোঁজার বদলে তাঁরা চ্যাটবটকে তাঁদের কাছে থাকা উপকরণগুলোর কথা জানাতে, প্রশ্ন করতে এবং কোনো সমস্যায় পড়লে পরবর্তী প্রশ্ন নিয়ে আলাপ শুরু করতে পারতেন। এর ফলে তাঁরা এমন এক প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞের (এআই) সহায়তা পাচ্ছিলেন যাকে ২৪ ঘণ্টা পাওয়া যায়, যে তাঁদের হাতে থাকা উপকরণ ও তাঁরা যে বোমা তৈরির চেষ্টা করছেন, সেগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে উত্তর দিচ্ছে।

আইএস-সমর্থকেরা এআইয়ের নিরাপত্তাব্যবস্থা কীভাবে এড়িয়ে যাওয়া যায়, সে বিষয়ে বিভিন্ন পদ্ধতি নিজেদের মধ্যে ছড়িয়ে দিচ্ছেন।

গবেষণায় আরও কিছু চমকপ্রদ ঘটনার কথা উঠে এসেছে। এর মধ্যে অবিস্ফোরিত সামরিক অস্ত্রশস্ত্রের কথাও রয়েছে।

গবেষণা অনুযায়ী, আইএসডব্লিউএপি বিস্ফোরিত না হওয়া বোমা ও অন্যান্য গোলাবারুদ থেকে বিস্ফোরক উপাদান সংগ্রহের চেষ্টা করেছিল। প্রতিবেদনটিতে আগের এমন একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে একটি অবিস্ফোরিত বোমা কীভাবে সামলানো হবে, তা নিয়ে যোদ্ধাদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছিল। তাঁরা কাছে গিয়ে সেটি নাড়াচাড়া করার পর বোমাটি বিস্ফোরিত হয়। এতে ৪০ জন নিহত হন।

বোকো হারামের সাবেক সদস্যরা বলেছেন, এখন বিরোধী পক্ষের নিক্ষেপ করা বা ছোড়া অবিস্ফোরিত সামরিক সরঞ্জাম থেকে বিস্ফোরক কীভাবে উদ্ধার করা যায়, সে বিষয়ে নির্দেশনা পেতে এআইয়ের পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে। এসব বিস্ফোরক পরে গোষ্ঠীটির নিজেদের তৈরি ডিভাইসে ব্যবহার করা হতে পারে।

বাণিজ্যিকভাবে পাওয়া যায় এমন ড্রোনকে পরিবর্তন করে লক্ষ্যবস্তুতে বিস্ফোরক বহন করে নিয়ে গিয়ে ফেলার উপযোগী করতেও এআই ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

মার্কিন এআই কোম্পানি অ্যানথ্রপিকের লোগো
ফাইল ছবি: রয়টার্স

‘শুধু গ্রককে জিজ্ঞাসা করো’

বোমা তৈরির প্রসঙ্গগুলো ছিল পুরো ঘটনার একটি অংশমাত্র। সাবেক যোদ্ধারা জানিয়েছেন, লড়াইয়ের প্রায় প্রতিটি পর্যায়ে এআইয়ের ব্যবহার পৌঁছে গেছে। একবার এক যোদ্ধা বুকে একটি ক্যামেরা বেঁধে লড়াই করতে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে তিনি ক্যাম্পে ছবি পাঠাচ্ছিলেন। এক কমান্ডার সেই ছবি চ্যাটজিপিটিতে আপলোড করে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেন এবং সম্মুখসারির যোদ্ধাদের নতুন নির্দেশনা দেন।

যোদ্ধারা অপরিচিত অস্ত্রের মুখোমুখি হলেও এআইয়ের পরামর্শ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। সদ্য সংগ্রহ করা আগ্নেয়াস্ত্র কীভাবে ব্যবহার করতে হবে, তা জানতে কমান্ডারেরা একবার গোষ্ঠীটির কথিত এক এআই বিশেষজ্ঞের কাছে জানতে চেয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘গ্রককে একবার জিজ্ঞাসা করো।’ তাঁদের মধ্যে এআইয়ের ব্যবহার কতটা নিয়মিত হয়ে উঠেছিল, তা ওই বিশেষজ্ঞের উত্তর থেকে বোঝা যায়। এখানে ইলন মাস্কের এআই কোম্পানির চ্যাটবট গ্রকের কথা বলা হয়েছে।

আরেকটি ঘটনা এমন, মোটরসাইকেলে চড়ে চালানো হামলা ঠেকাতে একবার সরকারি বাহিনী নিজেদের ঘাঁটির চারপাশে পরিখা খনন করেছিল। তখন বোকো হারামের যোদ্ধারা এআইয়ের সাহায্য নেন। গোষ্ঠীটির সাবেক এক কমান্ডার বলেন, তাঁরা সিনেমায় মোটরসাইকেলকে বাধা পেরিয়ে লাফ দিতে দেখেছিলেন এবং একই কৌশল কীভাবে করা যায়, তা জানতে এআইয়ের পরামর্শ নেন। তাঁর দাবি, কৌশলটি রপ্ত করতে অব্যাহতভাবে চেষ্টা করা হয়। এতে ১৮ জন যোদ্ধা নিহত হন। শেষ পর্যন্ত আটজন সফলভাবে আয়ত্ত করেন। পরে এআইয়ের সঙ্গে পরামর্শ করে একটি হামলার সময় তাঁরা পরিখা পার হয়েছিলেন।

পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে, তা নিয়ে আমি শঙ্কিত।
আন্তোনিয়া জুয়েলিশ, গবেষক, কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়

একেকটি লড়াইয়ে কতজন যোদ্ধাকে পাঠানো হবে, তা নতুন করে ভাবতেও এআই ব্যবহার করা হয়েছে। আইএসডব্লিউএপির সাবেক এক যোদ্ধা বলেন, একটি অভিযানে প্রায় ২০০ জনকে পাঠানোর পর ৬০ প্রাণ হারান। এরপর কমান্ডারেরা এআইয়ের কাছে ছোট কিন্তু আরও সমন্বিত দল লড়াইয়ে বেশি কার্যকর হতে পারে কি না, জানতে চান।

লড়াই শেষ হওয়ার পরও এআইয়ের পরামর্শ নেওয়া হতো।

সাবেক সদস্যরা জানিয়েছেন, কোনো অভিযান ব্যর্থ হওয়ার পর তাঁরা ফিরে এসে কী কৌশল ব্যবহার করেছিলেন, তা এআইকে জানাতেন এবং কেন তাঁরা ব্যর্থ হয়েছেন, তা জানতে চাইতেন। যোদ্ধারা পরবর্তী হামলায় কৌশল পরিবর্তনের উপায় খুঁজতে অভিযানের ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণের জন্য এআইতে আপলোড করতেন।

বাণিজ্যিকভাবে পাওয়া যায় এমন ড্রোনকে পরিবর্তন করে লক্ষ্যবস্তুতে বিস্ফোরক বহন করে নিয়ে গিয়ে ফেলার উপযোগী করতেও এআই ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

‘সরিয়ে দেওয়া হয় গতির সীমাবিধি’

আল-জাজিরার হাতে আসা বিশেষ কিছু নথি পর্যালোচনা করে জানা গেছে, এআইকে কাজে লাগানোর চেষ্টা বিশ্বজুড়ে আইএসআইএল সমর্থকদের বৃহত্তর নেটওয়ার্কেও ছড়িয়ে পড়েছে।

টেক এগেইনস্ট টেররিজমের গবেষকেরা আইএসআইএলপন্থী একটি অনলাইন প্রযুক্তিবিষয়ক ফোরামে প্রবেশের সুযোগ পান। সেখানে ব্যবহারকারীরা অস্ত্র-সংক্রান্ত তথ্য কীভাবে পাওয়া যায় এবং এআইয়ের নিরাপত্তাব্যবস্থা কীভাবে এড়িয়ে যাওয়া যায়, তা নিয়ে আলোচনা করছিলেন। এসব নিরাপত্তাব্যবস্থা চ্যাটবটকে বিপজ্জনক তথ্য দেওয়া থেকে বিরত রাখার জন্য তৈরি করা হয়েছিল।

বোকো হারামের এক সমর্থক প্রক্রিয়াটিকে কোনো গাড়ি সুবিধামতো পরিবর্তন করে নেওয়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন। ওই ব্যবহারকারী লেখেন, ‘এটা গাড়ির গতির সীমাবিধি সরিয়ে দেওয়ার মতো। গাড়িটি তখনো কাজ করবে; বরং তা আরও বেশি ভালোভাবে কাজ করবে। নির্মাতা যতটা গতি নির্ধারণ করে দিয়েছেন, তার চেয়ে অনেক বেশি দ্রুত চলতে পারবে।’

টেক এগেইনস্ট টেররিজমের কর্মকর্তা লুকাস ওয়েবার বলেন, তারা লক্ষ্য করেছেন, কীভাবে এআই ব্যবস্থাকে ‘ভাঙা’ বা জেলব্রেক করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। এআইয়ের নিরাপত্তাব্যবস্থা এড়াতে সংশ্লিষ্ট মডেলকে বাধ্য করার চেষ্টাকে সাধারণত জেলব্রেক শব্দগুচ্ছ দিয়ে বোঝানো হয়।

ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান
ফাইল ছবি: রয়টার্স

ওয়েবারের ভাষায়, ‘এটি হিমশৈলের চূড়ামাত্র।’ মানে বিশাল সমস্যার সামান্য অংশ মাত্র। প্রকৃত সমস্যা আসলে আরও বড় ও গভীর।

কেমব্রিজের গবেষণা নিবন্ধের লেখক আন্তোনিয়া জুয়েলিশ মনে করেন, এআই মডেলে একই প্রশ্ন বিভিন্ন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হতে পারে। তাই এআই নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। উদাহরণস্বরূপ, গবেষক ও সাংবাদিকেরা এআইকে সামরিক কৌশল নিয়ে প্রশ্ন করতে পারেন। একই ধরনের প্রশ্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যরা করতে পারেন অন্য উদ্দেশ্যে। কেমব্রিজের এই বিশেষজ্ঞ বলেন, বোমা তৈরির জন্য সহায়তা চেয়ে করা অনুরোধগুলো স্পষ্টভাবেই প্রতিষ্ঠানগুলোর নীতিমালার বাইরে পড়ে এবং তাদের নিরাপত্তাব্যবস্থার মাধ্যমেই এগুলো আটকে দেওয়া উচিত।

এটি হিমশৈলের চূড়ামাত্র।
লুকাস ওয়েবার, কর্মকর্তা, টেক এগেইনস্ট টেররিজম

জুয়েলিশ বলেন, ‘তারা জেলব্রেক করছে, বিধিনিষেধ এড়িয়ে যাচ্ছে।’ এআই যত বেশি শক্তিশালী হচ্ছে, এ শিল্পকে তত বেশি কঠোর নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বড় এআই কোম্পানিগুলো বলছে, এআইয়ের এ ধরনের অপব্যবহার ঠেকাতে তাদের নিরাপত্তাব্যবস্থা রয়েছে। ওপেনএআই সন্ত্রাসবাদ, সহিংসতা ও অস্ত্র তৈরিতে তাদের মডেল ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। অ্যানথ্রপিক ও মেটা বলেছে, বিপজ্জনক অনুরোধ শনাক্ত ও আটকে দিতে তারা শ্রেণিবিন্যাসকারী ও অন্যান্য নিরাপত্তাব্যবস্থা ব্যবহার করে। নিজেদের নিরাপত্তাব্যবস্থা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ইলন মাস্কের এক্সএআই।

আল-জাজিরা কেমব্রিজের গবেষণার ফলাফল নিয়ে মন্তব্য জানতে ওপেনএআই, অ্যানথ্রপিক, গুগল, এক্সএআই, মেটা ও ডিপসিকের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।

নতুন তথ্য-প্রমাণ ও গবেষণাটি এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দারিও আমোদেই এআই কোম্পানিগুলোকে সবচেয়ে উন্নত মডেল তৈরির গতি কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, এতে করে নিরাপত্তা যাচাইয়ের ব্যবস্থাকে এআইয়ের উন্নয়নের সঙ্গে তাল মেলানোর সময় পাওয়া যাবে। একই সঙ্গে তিনি তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে স্বাধীন মূল্যায়ন ও অভিন্ন নিরাপত্তা মানদণ্ড চালু করারও আহ্বান জানিয়েছেন।

গত ফেব্রুয়ারিতে জাতিসংঘ সতর্ক করে বলেছিল, আইএস ও এর সহযোগী গোষ্ঠীগুলো উন্নত এআইয়ের ব্যবহার বাড়িয়েছে।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর প্রশাসন বলছে, ‘জটিল ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ’ ছাড়াই মার্কিন এআই কোম্পানিগুলোকে উদ্ভাবনের স্বাধীনতা দিতে হবে। এ জন্য তারা ‘যতটা সম্ভব কম নিয়ন্ত্রণমূলক’ একটি জাতীয় কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। ফলে নিজেদের সিস্টেমে কোথায় সীমারেখা টানা হবে, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোকেই মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হচ্ছে।

এদিকে, গবেষক ও প্রযুক্তি খাতের অনেকেই ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে ওঠা এআই মডেলগুলোর ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করছেন।

কেমব্রিজের গবেষণায় বোকো হারামের সাবেক সদস্যদের সাক্ষাৎকারে মূলত ২০২৩ ও ২০২৪ সালে এআই ব্যবহারের কথা উঠে এসেছে। জুয়েলিশ মনে করেন, এরপর প্রযুক্তিটি যে দ্রুতগতিতে এগিয়েছে, তা বিবেচনায় নিলে গবেষণার ফলাফল আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠবে।

একই যোদ্ধারা ২০২৬ সালে এসে আরও উন্নত এআই ব্যবস্থা হাতে পেলে, কী করতে পারেন, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন জুয়েলিশ আল-জাজিরাকে বলেন, ‘পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে, তা নিয়ে আমি শঙ্কিত।’

{অনুবাদ: মুহাম্মদ তাসনীম আলম}