বাসচালক থেকে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট

নিকোলা মাদুরোফাইল ছবি: রয়টার্স

কয়েক মাস ধরে ভেনেজুয়েলার নাম বৈশ্বিক গণমাধ্যমের শিরোনামে উঠে আসছে প্রায় প্রতিদিন। ক্যারিবীয় সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল নৌ মহড়া, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কড়া হুঁশিয়ারি, নিকোলা মাদুরোর ‘যুদ্ধপ্রস্তুতি’—সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে, দেশটা যেন একটা ‘টাইমবোমা’র ওপর বসে আছে।

একজন বাসচালক থেকে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন নিকোলা মাদুরো। কর্মজীবনের শুরুতে যখন বাসচালক ছিলেন, সে সময়ই শ্রমিক রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ধীরে ধীরে তিনি শ্রমিকদের নেতৃত্বে আসেন। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে শ্রমিক রাজনীতি করেছেন।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত

নিকোলা মাদুরো শ্রমিক রাজনীতি থেকে ক্রমে জড়িয়ে পড়েন জাতীয় রাজনীতিতে। মাদুরো ২০১৩ সালের এপ্রিলে খুবই কম ভোটের ব্যবধানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, পরে তিনি দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন বিতর্কিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। ২০১৮ সালের ২০ মে সেই নির্বাচনে তিনি প্রায় ৬৮ শতাংশ ভোট পেয়েছেন বলে দাবি করা হয়। ক্ষমতা নেওয়ার পরই তাঁর বিরুদ্ধে গণতন্ত্র নস্যাৎ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ আসে।

নিকোলা মাদুরো বিরোধী মত সহ্য করেন না এবং তাঁর কারণে সমাজে বিভক্তি সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে মাদুরোর শাসনে ভেনেজুয়েলার অর্থনীতিতে চরম মন্দা দেখা দেয়। মুদ্রাস্ফীতি, খাদ্যসংকট—সবকিছু মিলিয়ে দেশটির সাধারণ মানুষ চরম সংকটে পড়েছে।

ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতি এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে দেশটির হাজার হাজার নাগরিক পাশের দেশগুলোয় গিয়ে আশ্রয় নেন। লাতিন আমেরিকার ইতিহাসে এত মানুষের নিজের দেশ ছেড়ে যাওয়ার ঘটনা এর আগে কখনো ঘটেনি। মাদুরো ২০১৭ সালের আগস্টে একটি জাতীয় সাংবিধানিক পরিষদ গঠন করে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এ নিয়েও ব্যাপক বিতর্ক হয়।

মাদুরো একটা পর্যায়ে সবার ঐক্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠার কর্মসূচি নেওয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু সেটা তাঁর শক্তি বাড়ানোর কৌশল ছিল বলে বিরোধীরা মনে করেন।

হুগো চাভেজের উত্তরসূরি হলেন যেভাবে

ভেনেজুয়েলায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের নেতা হুগো চাভেজের খুবই ঘনিষ্ঠ হয়েছিলেন মাদুরো। চাভেজের সরকারে ঘটনা পরম্পরায় নিকোলা মাদুরো পররাষ্ট্রমন্ত্রী হন ২০০৬ সালে। সেই থেকে তিনি হুগো চাভেজের মৃত্যুপর্যন্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। চাভেজের মৃত্যুর পর মাদুরো ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসেন এবং অন্তর্বর্তী সময়ের জন্য প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন। এরপর ২০১৩ সালে নির্বাচন করে অল্প ভোটের ব্যবধানে প্রথম মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন।

মাদুরো ১৯৯৮ সালে ভেনেজুয়েলার জাতীয় পরিষদের ডেপুটি স্পিকার হন। সেই থেকে তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শুরু হয়। হুগো চাভেজের বড় ধরনের প্রভাব ছিল তাঁর ওপর। মাদুরোর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসও হুগো চাভেজের প্রতিরক্ষা দলের সঙ্গে ছিলেন। তবে মাদুরোর শাসনামলে তেলের দামে পতন, দুর্নীতি ও নীতিগত দুর্বলতার কারণে দেশটি গভীর অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে। এর প্রভাব হিসেবে দেখা দেয় তীব্র মূল্যস্ফীতি। এর পাশাপাশি রাজনৈতিক অস্থিরতা; বিতর্কিত নির্বাচন ও বিরোধী দমনের অভিযোগে মাদুরো সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞাও বাড়ে, যা চাভেজ–যুগের তুলনায় শাসনকালকে আরও সংকটপূর্ণ ও বিতর্কিত করে তোলে।

আঞ্চলিক প্রভাব ও উদ্বাস্তু সংকট

ভেনেজুয়েলার অস্থিরতা ইতিমধ্যে কলম্বিয়া, ব্রাজিল ও পেরুকে বড় ধরনের চাপের মুখে ফেলে। যুক্তরাষ্ট্র ও বিরোধী দল মাদুরোকে বিশ্বাস করত না। আর মাদুরোও বিশ্বাস করতেন না যে ক্ষমতা ছাড়লে তিনি ও তাঁর সহযোগীরা নিরাপদ থাকবেন। এদিকে চাপ জোরদার করতে থাকে যুক্তরাষ্ট্র। বারবার ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হামলা হয়। হুমকি আসতে থাকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছ থেকেও। মাদুরো, তাঁর স্ত্রী ও ঘনিষ্ঠজনদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। অবশেষে শনিবার মাদুরোকে তাঁর নিজ দেশের রাজধানী কারাকাস থেকে যুক্তরাষ্ট্র তুলে নিয়ে যায়।