ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে নিহত বেড়ে ১৮৮, আহত দেড় হাজার
দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় এক মিনিটের মধ্যে শক্তিশালী দুটি ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। এতে ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞের আশঙ্কা করা হচ্ছে। দেশটিতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। দেশজুড়ে মোতায়েন করা হয়েছে উদ্ধারকর্মী ও নিরাপত্তা বাহিনী।
ভেনেজুয়েলার সরকার গতকাল বৃহস্পতিবার হালনাগাদ তথ্যে ১৮৮ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে বিপুল মানুষ আটকা পড়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) আশঙ্কা, নিহতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
স্থানীয় সময় গত বুধবার বিকেলে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাস থেকে ১৬০ কিলোমিটার দূরে ইয়ারাকুই রাজ্যের রাজধানী সান ফেলিপের কাছে প্রথম ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। এর তীব্রতা ছিল ৭ দশমিক ২। এর মাত্র ৪০ সেকেন্ড পর একই রাজ্যে ৭ দশমিক ৫ তীব্রতার আরেকটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। এই ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ইয়ারাকুই রাজ্যের ইউমারে শহরের প্রায় ২৩ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে।
ইউএসজিএসের তথ্যমতে, এটি ১৯০০ সালের পর ভেনেজুয়েলায় সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প। পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর রাতভর বেশ কয়েকটি পরাঘাত অনুভূত হয়।
উদ্ধারকর্মীরা ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেছেন। নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে হাসপাতাল, উদ্ধারকেন্দ্র ও ধ্বংসস্তূপের আশপাশে ভিড় করেন অসংখ্য মানুষ। আহত ব্যক্তিদের অনেককে স্ট্রেচারে করে সরিয়ে নিতে দেখা যায়।
তবে বিবিসির খবরে বলা হয়, উদ্ধার তৎপরতা বেশ ধীর। অসংখ্য মানুষ ধসে পড়া ভবনের মধ্যে আটকা পড়ে আছেন। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, তাঁদের উদ্ধারে কেউ আসছেন না।
ভূমিকম্পে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত লা গুইরার বাসিন্দা ৪৯ বছর বয়সী ল্যারি রোজাসের পরিবারের সদস্যরা ধসে পড়া ভবনে আটকা পড়েছেন। সেই ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমাদের কাছে কিছুই নেই। ভেতরে যাওয়ার মতো শক্তি বা সাহসও নেই।’
ভেনেজুয়েলার ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির প্রেসিডেন্ট হোর্হে রদ্রিগেজ গতকাল ক্ষয়ক্ষতির হালনাগাদ তথ্যে জানান, ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা ১৬৪ থেকে বেড়ে ১৮৮ জনে পৌঁছেছে। আহতের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার থেকে বেড়ে ১ হাজার ৫২০ জনে দাঁড়িয়েছে। ২০০ জন বিভিন্ন ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা রয়েছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। ২৫০টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বা পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে।
১০ হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ
ইউএসজিএসের পূর্বাভাসভিত্তিক মডেল বলছে, এই ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা যে কয়েক হাজারে পৌঁছাবে, তা অনেকটা নিশ্চিত করে বলা যায়। এমনকি তা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ারও যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে।
ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেতাদের উদ্যোগে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে একটি ওয়েবসাইট চালু করা হয়েছে। এতে কারাকাস সময় বেলা ১টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত ৩৯ হাজারের বেশি মানুষকে নিখোঁজ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
বুধবার সরকারি ছুটি থাকায় অনেক মানুষ বাসায় ছিলেন। ফলে হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আল–জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্থানীয় সাংবাদিক পল ডবসন বলেন, ভেনেজুয়েলার অনেক দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন এলাকায় এখনো উদ্ধারকারী দল পৌঁছাতে পারেনি। পাহাড়ি অঞ্চল ও নৌপথনির্ভর জনপদে পৌঁছানো কঠিন হওয়ায় হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।...দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও বিনিয়োগের অভাবে অনুসন্ধান ও উদ্ধার সক্ষমতাও দুর্বল হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া চলমান পরাঘাত উদ্ধারকাজকে আরও জটিল করে তুলছে।
আতঙ্কে রাস্তায় মানুষ
ভূমিকম্পের সময়কার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে কারাকাসের বাসিন্দা মারিয়া আলেহান্দ্রা বলেন, ‘নিচে নেমে যা দেখেছি, তা যেন কোনো ভৌতিক চলচ্চিত্রের দৃশ্য। চারদিকে ধ্বংসস্তূপ। আমরা সেগুলো টপকে বের হওয়ার চেষ্টা করেছি। একটি ভবন থেকে শুধু একটি পরিবারকে বের হতে দেখেছি।’
কারাকাসের পূর্বাঞ্চলের বাসিন্দা ৫৬ বছর বয়সী কোরো মার্তিনেজ বলেন, ‘বিকট এক শব্দ শুনতে পাই। ঘরের জিনিসপত্র পড়ে যেতে থাকে। এমন অভিজ্ঞতা আমার জীবনে কখনো হয়নি।’
কারাকাসের পশ্চিমাঞ্চলের ৪১ বছর বয়সী অ্যাস্ট্রিড রামিরেজ বলেন, ‘কম্পন শুরু হতেই চারদিকে মানুষের চিৎকার শুনতে পাই। সবাই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছিল।’
পুলিশ ঘর থেকে বের হতে সহায়তা করেছে উল্লেখ করে কারাকাসের দক্ষিণাঞ্চলের বাসিন্দা ৮০ বছর বয়সী মারিয়া রোমেরো বলেন, ‘এটা ১৯৬৭ সালের ভূমিকম্পের চেয়েও ভয়াবহ।’
রাজধানীর আরেক বাসিন্দা জানান, মুঠোফোনে ভূমিকম্পের সতর্কবার্তা পাওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই কম্পন তীব্র হয়ে ওঠে।
বিমানবন্দর বন্ধ
ভূমিকম্পে রাজধানীর কাছে অবস্থিত মাইকেতিয়া বিমানবন্দরেও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, বিমানবন্দরের একটি ভবনের ছাদ ও গাঁথুনির কিছু অংশ ভেঙে পড়ছে এবং ধুলার মেঘে এলাকা ছেয়ে যাচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ বলেন, বিমানবন্দরটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে অন্যান্য দেশ থেকে উদ্ধারকারী দল ও জরুরি সহায়তা দ্রুত পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
কারাকাসের হাসপাতালগুলোতে আহতদের চাপ সামাল দিতে রাতের শিফটে অতিরিক্ত কর্মী নিয়োগ করা হয়েছে। সপ্তাহের বাকি সময়ের জন্য স্কুল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। শহরের পুঁজিবাজারও বন্ধ রাখা হয়েছে।
সহায়তার প্রস্তাব ট্রাম্পের
ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, বিভিন্ন দেশ থেকে উদ্ধারকারী দল ভেনেজুয়েলায় পৌঁছানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়ায় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ বিভিন্ন বিশ্বনেতাকে ধন্যবাদ জানান।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প বলেন, ভেনেজুয়েলার মহান জনগণের ওপর আঘাত হানা দুটি বড় ভূমিকম্প ব্যাপক প্রাণহানি ঘটিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সাহায্য করতে প্রস্তুত, আগ্রহী ও সক্ষম।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে সামরিক অভিযান চালিয়ে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে তুলে নিউইয়র্কে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে মাদক পাচার ও সংশ্লিষ্ট অভিযোগে নিউইয়র্কের ম্যানহাটানের ফেডারেল আদালতে তাঁদের বিরুদ্ধে বিচার শুরু হয়। প্রথম শুনানিতে তাঁরা নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন।
ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল
ভেনেজুয়েলা এমন একটি ভূতাত্ত্বিক অঞ্চলে অবস্থিত, যেখানে ক্যারিবীয় প্লেট ও দক্ষিণ আমেরিকান প্লেটের সংযোগ ঘটেছে। এ কারণে দেশটি ভূমিকম্পপ্রবণ।
এর আগে ১৯৬৭ সালে ৬ দশমিক ৩ তীব্রতার প্রাণঘাতী ভূমিকম্পে কারাকাস ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। আর ১৮১২ সালের এক ভয়াবহ ভূমিকম্পে মেরিদা ও কারাকাসে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটে। ইউএসজিএসের হিসাব অনুযায়ী, ১৮১২ সালের ভূমিকম্পে প্রায় ৩০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।