আংটি দেখেই মেয়ের মরদেহ চিনলেন বাবা

ভেনেজুয়েলার বন্দরনগরী লা গুয়াইরায় অস্থায়ী মর্গে কফিনের পাশে মাটিতে সারিবদ্ধভাবে রাখা মরদেহ শনাক্তের কাজ করছেন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা। ২৯ জুন ২০২৬ছবি: এএফপি

ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত বন্দরনগরী লা গুয়াইরার একটি অস্থায়ী মর্গে নীল রঙের গাউন ও ক্যাপ পরা ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা তপ্ত রোদের মধ্যে সারিবদ্ধভাবে রাখা মরদেহগুলো পরীক্ষা করে দেখছিলেন। মরদেহগুলো ছিল কালো ব্যাগে মোড়ানো।

কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে আঘাত হানা ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসের কাছে অবস্থিত উপকূলীয় এ অঙ্গরাজ্যকে কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে। একেকটি আবাসিক এলাকা মাটির সঙ্গে মিশে গেছে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা ১ হাজার ৭০০ ছাড়িয়ে যাওয়ার পর হাসপাতালের মর্গে জায়গা না থাকায় বন্দর এলাকাটিকে অস্থায়ী মর্গে রূপান্তর করা হয়েছে। সেখানে চারদিকে ছড়িয়ে আছে মরদেহের ব্যাগ ও কফিন। কিছু মরদেহের পচনপ্রক্রিয়া ধীর করতে চুন ছিটিয়ে দেওয়া হয়েছে।

কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে আঘাত হানা ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসের কাছে অবস্থিত উপকূলীয় এই অঙ্গরাজ্যকে কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে। একেকটি আবাসিক এলাকা মাটিতে মিশে গেছে।

একটি সাদা তাঁবুর পাশে সারি করে রাখা হয়েছে প্রায় ১০০ খালি পাত্র। মরদেহ দাহ করার পর সেখানে মৃত ব্যক্তিদের অস্থি সংরক্ষণ করা হবে।

২৫ বছর বয়সী উইলকার মোল্লালা স্বজনদের মরদেহ শনাক্ত করার জন্য ডাক পাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। তিনি এএফপিকে বলেন, ‘আমার পরিবারের সদস্যরা ভেতরে আছে। আমাকে বলা হয়েছে, আমার বোন ও তাঁর সন্তানেরা সেখানে আছে। আমার ভাইয়ের সন্তানেরাও আছে।’ তাঁর ১১ সদস্যের পরিবারের মধ্যে এখন শুধু তিনি এবং তাঁর ভাই বেঁচে আছেন।

ভূমিকম্পের সময় দুজনই কর্মস্থলে ছিলেন। তখন বহুতল অনেক ভবন, শপিং সেন্টার ও স্কুল মুহূর্তের মধ্যে ধসে পড়ে।

হাতে ফুলের তোড়া নিয়ে কেউ স্বজনের মরদেহ শনাক্ত করতে, আবার কেউ শেষকৃত্যের জন্য মরদেহ গ্রহণ করতে মর্গে আসছেন।

হাতে ফুলের তোড়া নিয়ে কেউ স্বজনের মরদেহ শনাক্ত করতে, আবার কেউ শেষকৃত্যের জন্য মরদেহ গ্রহণ করতে মর্গে আসছেন।

এদিকে অনেকেই দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের ভূমিকার কড়া সমালোচনা করছেন। ক্ষতিগ্রস্ত অনেক এলাকায় মানুষ এখনো খালি হাতে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আটকে পড়া স্বজনদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন।

‘আংটি দেখেই চিনেছি’

বন্দর এলাকায় চিকিৎসক ও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা চারটি খুঁটির ওপর টাঙানো ত্রিপলের নিচে মরদেহ পরীক্ষা করছেন। এরপর দেওয়া হচ্ছে মৃত্যুসনদ ও মরদেহ দাহ করার অনুমতিপত্র।

আরও পড়ুন

‘স্পেশাল হসপিটাল ওয়েস্ট ইউনিট’ লেখা একটি ট্রাক ময়নাতদন্তের বর্জ্য সংগ্রহ করতে সেখানে আসে।

৪১ বছর বয়সী অ্যান্থনি মারকানো বলেন, ‘গতকাল এসেছিলাম। চারদিকে ঘুরেও মেয়েকে খুঁজে পাইনি।’ তিনি বলেন, ‘আজ আবার এলাম। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, আমি ওকে পেয়েছি। আমি ওকে শনাক্ত করতে পেরেছি।’

কত মানুষ এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছেন, সে বিষয়ে সরকারি কোনো হিসাব দেওয়া হয়নি। তবে জাতিসংঘের ধারণা, এখনো প্রায় ৫০ হাজার মানুষের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংস্থাটি ১০ হাজার মরদেহের ব্যাগ পাঠাচ্ছে।

মারকানো বলেন, ‘আমি ওকে একটা আংটি উপহার দিয়েছিলাম, সেটা দেখেই তাকে চিনেছি।’

মারকানো তাঁর মেয়ের মরদেহ উদ্ধারের কাজেও অংশ নেন। পোশাক আর হাতে থাকা আংটি ছাড়া মরদেহটি চেনার আর কোনো উপায় ছিল না।

কত মানুষ এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে, সে বিষয়ে সরকারি কোনো হিসাব দেওয়া হয়নি। তবে জাতিসংঘের ধারণা, এখনো প্রায় ৫০ হাজার মানুষের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংস্থাটি ১০ হাজার মরদেহের ব্যাগ পাঠাচ্ছে।

আরও পড়ুন

মর্যাদাপূর্ণ বিদায়

ভেনেজুয়েলাজুড়ে সংহতির বহিঃপ্রকাশ হিসেবে অনেক বেসরকারি শেষকৃত্য প্রতিষ্ঠান বিনা মূল্যে মরদেহ বহনের গাড়ি সরবরাহ ও দাহ করার ব্যবস্থা করছে।

৩৭ বছর বয়সী ডারউইন সিলভা মায়ের মরদেহ নিতে এসেছিলেন। তাঁর মা সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজের সময় নির্মিত সামাজিক আবাসন প্রকল্পে বসবাস করতেন।

সিলভা বলেন, ‘তাঁকে শনাক্ত করা হয়েছে। তাঁরা আমাকে মৃত্যুসনদও দিয়েছেন।’ গভীর রাতে মায়ের মরদেহ একটি ভেঙে পড়া বিমের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয়।

নিজের শোক সামলানোর চেষ্টা করে অন্য পরিবারগুলোকেও পরামর্শ দেন অ্যান্থনি মারকানো। বলেন, ‘ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করুন, যেন অন্তত আপনার প্রিয়জনকে মর্যাদার সঙ্গে শেষবিদায় দিতে পারেন।’

আরও পড়ুন