যেভাবে তুলে নেওয়া হয় মাদুরোকে
যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় শনিবার ভোর ৪টা ২১ মিনিটে নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ প্ল্যাটফর্মে এক বার্তায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে ধরতে ‘এক দুঃসাহসিক’ অভিযান চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
এই পদক্ষেপ আকস্মিক মনে হলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক মাস ধরে এই অভিযানের পরিকল্পনা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। এর মহড়াও করেছিল তারা।
সেনাবাহিনীর ডেল্টা ফোর্সসহ মার্কিন এলিট সেনারা মাদুরোর ‘সেফ হাউস’ বা নিরাপদ বাসস্থলের একটি হুবহু প্রতিকৃতি তৈরি করেছিলেন। অত্যন্ত সুরক্ষিত সেই বাসভবনে তাঁরা কীভাবে প্রবেশ করবেন, তার অনুশীলন করেছিলেন সেনারা।
একটি সূত্রের তথ্যমতে, ট্রাম্পের জ্যেষ্ঠ সহযোগী স্টিফেন মিলার, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফ এই বিষয়টি নিয়ে কাজ করার জন্য একটি ‘কোর টিম’ গঠন করেছিলেন। তাঁরা কয়েক মাস ধরে নিয়মিত, কখনো কখনো প্রতিদিন বৈঠক ও ফোনে আলাপ করেছেন। এ বিষয় নিয়ে তাঁরা প্রায়ই প্রেসিডেন্টের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করতেন।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একটি সূত্রের দেওয়া তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা-সিআইএর একটি ছোট দল গত আগস্ট মাস থেকেই সেখানে অবস্থান করছিল। তারা মাদুরোর জীবনযাত্রার ধরন সম্পর্কে এমন গভীর ধারণা দিতে সক্ষম হয়েছিল, যা তাঁকে ধরার কাজটি সহজ করে দেয়।
অন্য দুটি সূত্র রয়টার্সকে জানায়, গোয়েন্দা সংস্থাটির একজন তথ্যদাতা ছিলেন, যিনি মাদুরোর খুবই ঘনিষ্ঠ। ওই ব্যক্তি মাদুরোর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতেন এবং অভিযান চলাকালে তাঁর একবারে সঠিক অবস্থানের তথ্য দেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন।
সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার পর চার দিন আগে ট্রাম্প এই অভিযানের অনুমোদন দেন। তবে সামরিক ও গোয়েন্দা পরিকল্পনাকারীরা তাঁকে অপেক্ষাকৃত ভালো আবহাওয়া ও পরিষ্কার আকাশের জন্য অপেক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন সাংবাদিকদের বলেন, গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সময় রাত ১০টা ৪৬ মিনিটে ট্রাম্প ‘অপারেশন অ্যাবসলিউট রিজলভ’ নামের এই অভিযানের চূড়ান্ত সবুজ সংকেত দেন।
ট্রাম্প ফ্লোরিডার পাম বিচে অবস্থিত তাঁর মার-আ-লাগো ক্লাবে উপদেষ্টাদের নিয়ে এ অভিযানের সরাসরি সম্প্রচার দেখেন।
কয়েক ঘণ্টা ধরে চলা অভিযানটি কীভাবে পরিচালিত হয়েছিল, তা এই ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চারটি সূত্রের দেওয়া সাক্ষাৎকার ও ট্রাম্পের নিজের প্রকাশ করা তথ্যের ভিত্তিতে জানা গেছে। অভিযান শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি বেশ কিছু ভালো অভিযান সম্পন্ন করেছি, কিন্তু এমন কিছু আমি আগে কখনো দেখিনি।’
‘ব্যাপক’ অভিযান
ক্যারিবীয় অঞ্চলে বিশাল সামরিক শক্তি মোতায়েন তদারকির কাজ করেছে পেন্টাগন। ওই অঞ্চলে ১টি বিমানবাহী রণতরি, ১১টি যুদ্ধজাহাজ এবং এক ডজনেরও বেশি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান পাঠানো হয়। সব মিলিয়ে ১৫ হাজারের বেশি সেনাকে ওই অঞ্চলে জড়ো করা হয়। এই পদক্ষেপকে মার্কিন কর্মকর্তারা দীর্ঘ সময় ধরে ‘মাদকবিরোধী অভিযান’ হিসেবে বর্ণনা করে আসছিলেন।
একটি সূত্রের তথ্যমতে, ট্রাম্পের জ্যেষ্ঠ সহযোগী স্টিফেন মিলার, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ও সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফ এই বিষয়টি নিয়ে কাজ করার জন্য একটি ‘কোর টিম’ গঠন করেছিলেন। তাঁরা কয়েক মাস ধরে নিয়মিত, কখনো কখনো প্রতিদিন বৈঠক ও ফোনে আলাপ করেছেন। এ বিষয় নিয়ে তাঁরা প্রায়ই প্রেসিডেন্টের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করতেন।
একজন মার্কিন সামরিক কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, গত শুক্রবার গভীর রাত থেকে গতকাল শনিবার ভোর পর্যন্ত ট্রাম্প ও তাঁর উপদেষ্টারা রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। ওই সময় বেশ কিছু মার্কিন যুদ্ধবিমান উড্ডয়ন করে এবং কারাকাস ও এর আশপাশের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাসহ বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়।
জেনারেল কেইন জানান, এই অভিযানে পশ্চিম গোলার্ধে থাকা ২০টি ঘাঁটি থেকে এফ-৩৫, এফ-২২ জেট, বি-১ বোম্বারসহ ১৫০টিরও বেশি বিমান অংশ নিয়েছে।
ফক্স নিউজ চ্যানেলের ‘ফক্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’ অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন, ‘প্রতিটি সম্ভাব্য পরিস্থিতির জন্য আমাদের একটি করে যুদ্ধবিমান প্রস্তুত ছিল।’
রয়টার্সকে সূত্রগুলো জানিয়েছে, পেন্টাগন অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে এই অঞ্চলে উড়ন্ত যুদ্ধবিমানে জ্বালানি সরবরাহকারী এয়ার ট্যাংকার, ড্রোন ও ইলেকট্রনিক জ্যামিংয়ে সক্ষম উড়োজাহাজ মোতায়েন করেছিল।
মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, বিমান হামলাগুলো সামরিক লক্ষ্যবস্তুতেই চালানো হয়েছে। কারাকাসের লা কার্লোতা বিমানঘাঁটিতে রয়টার্সের তোলা ছবিতে ভেনেজুয়েলার একটি বিমানবিধ্বংসী ইউনিটের পুড়ে যাওয়া সামরিক যান দেখা গেছে।
শোবার ঘর থেকে আটক
বিমান হামলার মধ্যেই ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত মার্কিন স্পেশাল ফোর্সের সদস্যরা কারাকাসে প্রবেশ করেন। মাদুরোর অবস্থানস্থলে ইস্পাতের দরজা কেটে ভেতরে ঢোকার প্রয়োজন হতে পারে—এমন প্রস্তুতি হিসেবে তাঁদের সঙ্গে ছিল ব্লোটর্চ (ইস্পাতজাতীয় জিনিস কাটার উপযোগী তাপ উৎপন্নকারী যন্ত্র)।
জেনারেল কেইন জানান, শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সময় রাত আনুমানিক একটার দিকে মার্কিন সেনারা কারাকাস শহরের কেন্দ্রে মাদুরোর কম্পাউন্ডে পৌঁছান। সেখানে তাঁরা গুলির মুখে পড়েন। তাঁদের একটি উড়োজাহাজে গুলি লাগলেও সেটি উড়তে সক্ষম ছিল।
বাসিন্দাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা ভিডিওতে দেখা গেছে, উড়োজাহাজের একটি বহর শহরের ওপর দিয়ে কম উচ্চতায় উড়ে যাচ্ছে।
মাদুরোর ‘সেফ হাউসে’ পৌঁছানোর পর মার্কিন সেনারা এফবিআই এজেন্টদের সঙ্গে নিয়ে বাসভবনের ভেতরে প্রবেশ করেন। ট্রাম্প এই স্থানটিকে ‘অত্যন্ত সুরক্ষিত... দুর্গ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ট্রাম্প বলেন, ‘তাঁরা ভেতরে ঢুকে পড়েন; তাঁরা এমন সব জায়গায় ঢুকেছেন, যেখানে আসলে ঢোকা সম্ভব ছিল না। আপনারা জানেন, ঠিক এই কারণেই সেখানে ইস্পাতের দরজা লাগানো হয়েছিল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সেগুলো সরিয়ে ফেলা হয়।’
অভিযান সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্রের বরাত দিয়ে সিএনএন জানিয়েছে, অভিযানের সময় মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে তাঁদের শোবার ঘর থেকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যায় মার্কিন বাহিনী। এভাবেই তাঁদের আটক করা হয়। সূত্র জানিয়েছে, মধ্যরাতে ঘুমন্ত অবস্থায় এই দম্পতিকে আটক করা হয়।
বন্দী মাদুরো
জেনারেল কেইন জানান, মার্কিন সেনারা ‘সেফ হাউসের’ ভেতরে প্রবেশের পর মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী আত্মসমর্পণ করেন। ট্রাম্প বলেন, ভেনেজুয়েলার এই নেতা একটি ‘সেফ রুমে’ (নিরাপদ কক্ষ) পৌঁছানোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু দরজা বন্ধ করতে পারেননি। ট্রাম্প বলেন, ‘এত দ্রুত তাঁর ওপর হামলে পড়া হয়েছিল যে তিনি সেই কক্ষে ঢুকতে পারেননি।’
ট্রাম্প বলেন, অভিযানে কয়েকজন মার্কিন সেনা আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছেন। তবে কেউ নিহত হননি।
অভিযান চলাকালে মার্কো রুবিও আইনপ্রণেতাদের বিষয়টি জানাতে শুরু করেন। কর্মকর্তারা রয়টার্সকে বলেন, অভিযান শুরু হওয়ার পরই কেবল তাঁদের জানানো হয়েছিল, আগে নয়। সাধারণত গুরুত্বপূর্ণ আইনপ্রণেতাদের তদারকি কাজে দায়িত্ব থাকায় তাঁদের বিষয়টি জানানো হয়।
জেনারেল কেইন জানান, ভেনেজুয়েলার সীমানা ত্যাগ করার সময় মার্কিন সেনারা ‘একাধিক আত্মরক্ষামূলক লড়াইয়ে’ জড়ান। যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সময় ভোর ৩টা ২০ মিনিটে উড়োজাহাজগুলো মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে জলসীমার ওপর পৌঁছায়।
ট্রুথ সোশ্যালে অভিযানের ঘোষণা দেওয়ার ঠিক সাত ঘণ্টা পর ট্রাম্প আরেকটি পোস্ট করেন। সেটি ছিল বন্দী ভেনেজুয়েলার নেতার একটি ছবি, যেখানে তাঁর চোখ বাঁধা, হাতে হাতকড়া এবং পরনে ছিল ধূসর রঙের নরম কাপড়ের তৈরি ট্রাউজার।
হামলা চালানোর উপযোগী উভচর যুদ্ধজাহাজের কথা উল্লেখ করে ট্রাম্প লেখেন, ‘ইউএসএস আইও জিমাতে নিকোলা মাদুরো।’