মাদুরোর উত্তরসূরি ভেনেজুয়েলার নেত্রী দেলসি কে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তিনি কি নমনীয় হবেন

ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজছবি: রয়টার্স

ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক অভিযানের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে তুলে নেওয়ার পর দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশটির কমান্ড বা শাসনভার এখন নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজের হাতে।

ভেনেজুয়েলার সংবিধানে প্রেসিডেন্টের অনুপস্থিতিতে বিভিন্ন যে পরিস্থিতির কথা বলা হয়েছে, সেই অনুযায়ী ভাইস প্রেসিডেন্ট এখন ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নিচ্ছেন। সংবিধানের ২৩৩ ও ২৩৪ ধারা অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টের অনুপস্থিতি সাময়িক হোক বা পূর্ণাঙ্গ, ভাইস প্রেসিডেন্টই প্রেসিডেন্টের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তা ছাড়া ভেনেজুয়েলার সুপ্রিম কোর্ট ইতিমধ্যে তাঁকে দেশের ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নিতে বলেছেন।

গতকাল শনিবার বিকেলে দেলসি রদ্রিগেজ ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি একই সঙ্গে অর্থ ও তেলমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস বন্দী হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর তিনি জাতীয় প্রতিরক্ষা কাউন্সিলের একটি অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন। অন্যান্য মন্ত্রী ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নিয়ে আয়োজিত সেই সভায় তিনি মাদুরো দম্পতির ‘অবিলম্বে মুক্তি’ দাবি করেন। তিনি তাঁর দেশে মার্কিন সামরিক অভিযানের তীব্র নিন্দা জানান।

ভেনেজুয়েলার জাতীয় পতাকার সামনে দাঁড়িয়ে দেলসি রদ্রিগেজ বলেন, শেষ রাতের এই অভিযান আন্তর্জাতিক আইন এবং ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্বের ওপর নগ্ন এক হস্তক্ষেপ। তিনি আরও বলেন, এই পদক্ষেপ ভেনেজুয়েলার সাধারণ মানুষের প্রত্যাখ্যান করা উচিত এবং লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর সরকারের পক্ষ থেকে এর কঠোর নিন্দা জানানো উচিত।

দেলসি দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ‘চাভিজমো’-র আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে পরিচিত। প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজের প্রতিষ্ঠিত এবং ২০১৩ সালে তাঁর মৃত্যুর পর মাদুরোর নেতৃত্বে এই রাজনৈতিক আন্দোলন পরিচালিত হচ্ছে।

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেল ‘ভিটিভি’-তে সম্প্রচারিত ভাষণে দেলসি বলেন, ‘আমরা এই বিশাল মাতৃভূমির জনগণের প্রতি ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানাই। কারণ, ভেনেজুয়েলার সঙ্গে যা করা হয়েছে, তা অন্য যে কারও সঙ্গে করা হতে পারে। মানুষের ইচ্ছাকে দমিয়ে রাখতে শক্তির এই পাশবিক ব্যবহার যেকোনো দেশের বিরুদ্ধে চালানো হতে পারে।’

মাদুরোর ‘আস্থভাজন’এক কর্মকর্তা

৫৬ বছর বয়সী দেলসি রদ্রিগেজ রাজধানী কারাকাসে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ভেনেজুয়েলার সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিতে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন।
দেলসি দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ‘চাভিজমো’-র আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে পরিচিত। প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজের প্রতিষ্ঠিত এবং ২০১৩ সালে তাঁর মৃত্যুর পর মাদুরোর নেতৃত্বে এই রাজনৈতিক আন্দোলন পরিচালিত হচ্ছে।

দেলসির ভাই হোর্হে রদ্রিগেজ (বর্তমানে ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির প্রেসিডেন্ট) এবং তিনি নিজে চাভেজের আমল থেকেই ক্ষমতার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তিনি ২০১৩ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তথ্য ও যোগাযোগমন্ত্রী এবং পরবর্তী সময় ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

সেই সময় দেলসি প্রেসিডেন্ট মাদুরো সরকারের বিরুদ্ধে আসা আন্তর্জাতিক সমালোচনা, বিশেষ করে মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং গণতন্ত্রের খারাপ পরিস্থিতির নানা অভিযোগের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছিলেন।

যুক্তরাষ্ট্র তুলে নিয়ে যাওয়া ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোর সঙ্গে বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ। ১২ জুলাই ২০১৯, কারাকাস
ছবি: রয়টার্স

পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে দেলসি রদ্রিগেজ জাতিসংঘের মতো ফোরামগুলোয় ভেনেজুয়েলার প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। সেখানে তিনি অন্যান্য দেশের বিরুদ্ধে তাঁর দেশের ক্ষতি করার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনতেন।

২০১৭ সালে দেলসি রদ্রিগেজ ‘কনস্টিটিউয়েন্ট ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি’-এর প্রেসিডেন্ট হন। মূলত ২০১৫ সালের নির্বাচনে বিরোধীদের জয়ের পর সরকারের ক্ষমতা আরও শক্তপোক্ত করতে কনস্টিটিউয়েন্ট ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি করা হয়েছিল। ২০১৮ সালে মাদুরো তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য তাঁকে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিয়োগ দেন।

২০১৭ সালে দেলসি রদ্রিগেজ ‘কনস্টিটিউয়েন্ট ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি’-এর প্রেসিডেন্ট হন। মূলত ২০১৫ সালের নির্বাচনে বিরোধীদের জয়ের পর সরকারের ক্ষমতা আরও শক্তপোক্ত করতে কনস্টিটিউয়েন্ট ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি করা হয়েছিল। ২০১৮ সালে মাদুরো তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য দেলসি রদ্রিগেজকে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিয়োগ দেন।

২০২৪ সালের ২৮ জুলাইয়ের বিতর্কিত নির্বাচনের পর ২০২৫ সালের ১০ জানুয়ারি শুরু হওয়া মাদুরোর তৃতীয় মেয়াদেও দেলসি এই পদে বহাল থাকেন। প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে মার্কিন বাহিনী তুলে নেওয়ার আগমুহূর্ত পর্যন্ত তিনি ভেনেজুয়েলার প্রধান অর্থনৈতিক কর্তৃপক্ষ এবং তেলমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছিলেন।

ভেনেজুয়েলার বিরোধী দলগুলোর দাবি হলো ২০২৪ সালের নির্বাচনে ব্যাপক জালিয়াতি হয়েছে। মাদুরো বৈধভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট নন। বিরোধীরা মনে করেন, প্রকৃত বিজয়ী হলেন সাবেক রাষ্ট্রদূত এডমুন্ডো গঞ্জালেস উরুতিয়া। বিরোধীদের এই অবস্থানকে যুক্তরাষ্ট্রসহ ওই অঞ্চলের বেশ কিছু সরকার সমর্থন করে থাকে।

সাংবিধানিক আইনজীবী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক হোসে ম্যানুয়েল রোমানো সিএনএনকে বলেন, দেলসি রদ্রিগেজ এ পর্যন্ত যেসব পদে দায়িত্ব পালন করেছেন তাতে প্রমাণিত হয়, তিনি ভেনেজুয়েলা সরকারের অন্যতম ‘বিশিষ্ট’ একজন ব্যক্তিত্ব। তিনি এমন একজন ব্যক্তি, যিনি প্রেসিডেন্টের ‘পূর্ণ আস্থা’ উপভোগ করেন।

তিনি (দেলসি) মাদুরোর কোনো নমনীয় বা উদারপন্থী বিকল্প নন। তিনি এই পুরো ব্যবস্থার মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ও কট্টরপন্থী ব্যক্তিদের একজন
ইমদাত ওনার, জ্যাক ডি. গর্ডন ইনস্টিটিউটের পলিসি অ্যানালিস্ট ও ভেনেজুয়েলায় নিয়োজিত তুরস্কের সাবেক কূটনীতিক

রোমানো আরও বলেন, ‘ভাইস প্রেসিডেন্ট অত্যন্ত দক্ষ একজন পরিচালক এবং দল পরিচালনার ক্ষেত্রে তাঁর চমৎকার নেতৃত্ব গুণ রয়েছে। তিনি ফলাফলনির্ভর কাজ করতে পছন্দ করেন। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়সহ পুরো সরকারি ব্যবস্থার ওপর তাঁর ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।’

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কি সমঝোতার পথ তৈরি হচ্ছে

মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্র তুলে নেওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর এবং প্রতিরক্ষা কাউন্সিলে দেলসি রদ্রিগেজের ভাষণের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ভাইস প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলেছেন। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, দেলসি রদ্রিগেজ ভেনেজুয়েলার একটি নতুন অধ্যায় শুরুর জন্য ওয়াশিংটনের সঙ্গে কাজ করতে ইচ্ছুক বলে মনে হয়েছে।

ট্রাম্প বলেন, ‘তাঁর (দেলসি) সঙ্গে মার্কোর কথা হয়েছে। তিনি বলেছেন, “আপনারা যা চান, আমরা তাই করব”। আমি মনে করি, তিনি যথেষ্ট বিনয়ী ছিলেন। আমরা বিষয়টিকে সঠিকভাবে সামলাব।’

যা–ই হোক, ট্রাম্পের এই মন্তব্য অনেক বিশ্লেষককে অবাক করেছে। তাঁরা মনে করেন, দেলসি রদ্রিগেজ যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো ছাড় দেবেন, এমন সম্ভাবনা খুবই কম।

জ্যাক ডি. গর্ডন ইনস্টিটিউটের পলিসি অ্যানালিস্ট ও ভেনেজুয়েলায় নিয়োজিত তুরস্কের সাবেক কূটনীতিক ইমদাত ওনার সিএনএনকে বলেন, ‘তিনি (দেলসি) মাদুরোর কোনো নমনীয় বা উদারপন্থী বিকল্প নন। তিনি এই পুরো ব্যবস্থার মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ও কট্টরপন্থী ব্যক্তিদের একজন।’

এই বিশ্লেষক আরও যোগ করেন, ‘তাঁর (দেলসি) ক্ষমতায় আসাটা সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্র ও কিছু প্রধান পক্ষের মধ্যে কোনো সমঝোতার ফল হতে পারে, যারা মাদুরো-পরবর্তী পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এ অবস্থায় তিনি মূলত একজন তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কাজ করবেন, যতক্ষণ না গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত একজন নেতা ক্ষমতা গ্রহণ করেন।’

ভেনেজুয়েলার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদ্রিনো লোপেজের সঙ্গে কথা বলছেন দেলসি রদ্রিগেজ। ৪ ডিসেম্বর ২০২৬, কারাকাস
ছবি: রয়টার্স

মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্র তুলে নিয়ে যাওয়ার পর তাঁর প্রথম দেওয়া বার্তাগুলোয় দেলসি রদ্রিগেজ পিছিয়ে যাওয়ার কোনো লক্ষণ দেখাননি। ট্রাম্পের বক্তব্যের কোনো উল্লেখ না করেই তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতার যেকোনো সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন।

গতকাল শনিবার সকালে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ভিটিভির সঙ্গে টেলিফোনে এক সাক্ষাৎকারে দেলসি রদ্রিগেজ বলেন, মাদুরো ও ফ্লোরেস বর্তমানে কোথায় আছেন, তা অজানা। তাঁরা যে বেঁচে আছেন, তিনি সেটার প্রমাণ দাবি করেন। (অবশ্য মাদুরোকে ইতিমধ্যে নিউইয়র্কে নেওয়ার ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে)।

বিকেলে প্রতিরক্ষা কাউন্সিলের অধিবেশনে দেলসি তাঁর সুর আরও কঠোর করে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন অভিযানের নিন্দা জানান। তিনি বলেন, পরিস্থিতি যা-ই হোক না কেন, মাদুরোই ভেনেজুয়েলার দায়িত্বে আছেন।

ঘটনার পরিক্রমায় এখন ভেনেজুয়েলা সরকারের প্রধান মুখ হয়ে ওঠা দেলসি রদ্রিগেজ ঘোষণা করেছেন, ‘এ দেশে মাত্র একজনই প্রেসিডেন্ট আছেন, আর তাঁর নাম নিকোলা মাদুরো মোরোস।’