বিশ্বকাপে ‘আর্জেন্টিনাবিরোধী প্রচারণায়’ মার্কিন ডেমোক্র্যাটদের অর্থায়নের অভিযোগ প্রেসিডেন্ট মিলেইর

ব্রাজিলের সাও পাওলোতে লিবারেল পার্টির (পিএল) জাতীয় সম্মেলনে বক্তব্য দিচ্ছেন আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই। তাঁর পাশে ব্রাজিলের সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো, যাঁর ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার কথা রয়েছে। ২৫ জুলাই ২০২৬ছবি: রয়টার্স

ফেরান তোরেস অতিরিক্ত সময়ে গোল করে স্পেনকে তাদের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ এনে দেওয়ার পর এক সপ্তাহের বেশি সময় পার হয়ে গেছে। কিন্তু অন্তত আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইর কাছে এই টুর্নামেন্ট এখনো শেষ হয়নি।

হাভিয়ের মিলেই দাবি করেছেন, তাঁদের জাতীয় দলের সমালোচনা, সমর্থকদের বিরুদ্ধে বর্ণবাদের অভিযোগ এবং লিওনেল মেসি দলকে ফিফা গোপনে সুবিধা দিচ্ছে—এমন ষড়যন্ত্র তত্ত্বের পেছনে একটি সুসংগঠিত ‘আর্জেন্টিনাবিরোধী প্রচারণা’ কাজ করেছে।

এখন, কট্টর ডানপন্থী এই প্রেসিডেন্ট পুরো বিষয়টি আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে দাবি করেছেন, কথিত সেই প্রচারণায় অর্থায়ন করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক পার্টি এবং ব্রাজিল ও মেক্সিকোর সরকার।

গত রোববার স্থানীয় একটি রেডিও স্টেশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্বঘোষিত এই উদারপন্থী (লিবার্টারিয়ান) দাবি করেন, ‘এটি সেসব প্রগতিশীল মানসিকতার মানুষদের কাজ, যারা মুক্ত চিন্তাধারাকে সফল হতে দিতে চায় না।’

হাভিয়ের মিলেই আরও দাবি করেন, বামপন্থী প্রেসিডেন্ট লুইস ইনাসিও লুলা দা সিলভার নেতৃত্বাধীন ‘ব্রাজিল সরকার’ নাকি এই অর্থায়নের সবচেয়ে বড় অংশ যুগিয়েছে।

আর্জেন্টিনার বিশ্লেষকেরা বলছেন, নিজের দ্রুত কমতে থাকা জনপ্রিয়তা থেকে মানুষের মনোযোগ ঘোরাতেই মিলেই এই প্রচারণাকে আঁকড়ে ধরেছেন। তবে অন্যদের যুক্তি, আসল ‘আর্জেন্টিনাবিরোধী প্রচারণা’ তো প্রেসিডেন্ট নিজেই চালাচ্ছেন—তাঁর কঠোর কৃচ্ছ্রসাধন নীতির ‘চেইনস’ (যান্ত্রিক করাত) চালিয়ে।

আর্জেন্টিনার ফুটবল দলের জার্সি হাতে হাভিয়ের মিলেই এবং ব্রাজিলের পতাকা হাতে সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো। সাও পাওলো, ব্রাজিল। ২৫ জুলাই ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

তবে এই বয়ানটি বেশ সাড়া জাগাতে পেরেছে। এমনকি এটি পৌঁছে গেছে মিলেইকে সমর্থন করেন না এমন মানুষের কাছেও। বুয়েনস এইরেসের ৫২ বছর বয়সী বইবিক্রেতা পাবলো তোরেস, যিনি ‘কখনোই মিলেইকে ভোট দেননি এবং দেবেনও না’। তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেশের বিরুদ্ধে এমন ‘আক্রমণাত্মক প্রচারণা’ চালানো হয়েছে যা তাঁকে ‘ক্ষুব্ধ’ ও ‘বিরক্ত’ করেছে।

পাবলো বলেন, বর্ণবাদের কিছু অভিযোগ এসেছে ‘সেই সব বড় সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কাছ থেকে, যারা মানুষকে দাস বানিয়ে রেখেছিল, কৃতদাস পাচার করেছিল এবং পুরো জনগোষ্ঠীকে বিলুপ্ত করে দিয়েছিল’। তিনি আরও বলেন, ‘তারা আর্জেন্টিনায় কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের অস্তিত্ব অস্বীকার করেছে এবং আমাদের স্বকীয়তা ও ইতিহাসকে উপেক্ষা করেছে... আমরা সব জাতিকে স্বাগত জানানোর মতো একটি দেশের মানুষ।’

টুর্নামেন্ট চলাকালীন আর্জেন্টিনার কিছু সমর্থকের বর্ণবাদী আচরণের ঘটনা ব্যাপকভাবে সবার নজর কাড়ে। ফাইনালের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে যুক্তরাষ্ট্রের অভিনেতা স্যামুয়েল এল জ্যাকসন ইনস্টাগ্রাম স্টোরিতে পোস্ট করেন: ‘প্রিয় কৃষ্ণাঙ্গ বন্ধুরা, দয়া করে ফিফা বিশ্বকাপ জয়ের জন্য আর্জেন্টিনার জন্য উল্লাস করবেন না বা তাদের হয়ে গলা ফাটাবেন না। ঐতিহাসিকভাবেই আর্জেন্টিনা, সবচেয়ে মারাত্মক না হলেও, পৃথিবীর অন্যতম বর্ণবাদী দেশগুলোর একটি।’

এই পোস্টের পর অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল আর্জেন্টিনার মতো মানবাধিকার সংস্থাগুলোও প্রতিক্রিয়া জানায়। তারা বর্ণবাদ থাকার বিষয়টি স্বীকার করে নিলেও ‘দেশটিকে একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলে বদ্ধমূল ধারণা পোষণের’ সমালোচনা করেছে।

নিজের নির্বাচনী প্রচারণায় একটি ‘চেইনস’ (যান্ত্রিক করাত) হাতে হাভিয়ের মিলেই। বুয়েনস এইরেস, আর্জেন্টিনা। ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৩
ছবি: রয়টার্স

এদিকে মিলেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করে জানান, এই সমালোচনার দায় আর্জেন্টিনার বিরোধী দলের ওপর বর্তায়। কারণ তারা ‘ওক আন্দোলনকে (বৈষম্য, বর্ণবাদ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সামাজিক ও রাজনৈতিক সচেতনতামূলক আন্দোলন) বৈধতা দিয়েছে, যারা এখন আমাদের বিরুদ্ধে বর্ণবাদের অভিযোগ তুলছে’। গত শনিবার তিনি ব্রাজিলকেও দোষারোপ করার মনস্থির করেন, আর সেটিও আবার ব্রাজিলের মাটিতে বসেই।

গত শনিবার আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট ব্রাজিলের কট্টর ডানপন্থী সিনেটর ফ্ল্যাভিও বোলসোনারোর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারণার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নেন। ফ্ল্যাভিও দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বোলসোনারোর ছেলে এবং আগামী অক্টোবরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লুলা দা সিলভার মূল প্রতিদ্বন্দ্বী।

নিজের ভাষণে মিলেই লুলা দা সিলভাকে ‘চোর’ এবং ‘কয়েদি’ বলে উল্লেখ করেন। এর ফলে ব্রাজিল সরকারের পক্ষ থেকে কড়া প্রতিক্রিয়া জানানো হয়। মিলেই বলেন: ‘আপনারা যদি সাম্প্রতিক আর্জেন্টিনাবিরোধী প্রচারণার তথ্য পরীক্ষা করেন, তবে দেখবেন সবচেয়ে বেশি আক্রমণ এসেছে ব্রাজিল থেকে।’

গত রোববার আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট এই দাবিটি আরও জোর দিয়ে বলেন। তবে এবার এর সঙ্গে মেক্সিকো এবং যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাটিক পার্টির নামও যুক্ত করেন।

ডিজিটাল নৃবিজ্ঞানী মার্সিডিজ মাসপেরো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ২০ লাখেরও বেশি পোস্ট বিশ্লেষণ করে লিখেছেন, তিনি সুসংগঠিতভাবে পরিচালনা করার ‘কিছু অনস্বীকার্য ধরণ’ খুঁজে পেয়েছেন। যেমন, বিভিন্ন ভাষায় বারবার ‘জঘন্য মানুষ’ কথাটির নানা রূপ ব্যবহার করা হয়েছে। তবুও তিনি লিখেছেন, এটিকে একটি সুসংগঠিত প্রচারণা হিসেবে আখ্যা দেওয়া ‘বেশ কঠিন’। কারণ ‘এই বয়ানটির ছড়িয়ে পড়ার ব্যাপকতা ছিল অবিশ্বাস্য রকমের’।

ফিফা বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনা হেরে যাওয়ার পর সতীর্থদের সঙ্গে লিওনেল মেসি। নিউ জার্সি, যুক্তরাষ্ট্র। ১৯ জুলাই, ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

আর্জেন্টিনার ন্যাশনাল সায়েন্টিফিক অ্যান্ড টেকনিক্যাল রিসার্চ কাউন্সিলের গবেষক নাতালিয়া আরুগেতে। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক এজেন্ডা নিয়ে কাজ করেন। তিনি বলেন, ‘আর্জেন্টিনাকে ঘিরে একটি বৈরী, ব্যাপক এবং আন্তর্দেশীয় আলোচনা’ থাকার পরও তিনি ‘বড় পরিসরে কোনো সুসংগঠিত প্রচার অভিযানের প্রমাণ পাননি’।

আরুগেতে আরও বলেন, ‘(ওই বার্তাগুলোতে) ব্রাজিলের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি ছিল, বিশেষ করে বর্ণবাদ নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে। কিন্তু... ব্রাজিলের কথিত জড়িত থাকার বিষয়ে মিলেইর অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রকাশ্য প্রমাণ ছিল না।’

কিছু সমালোচক বলেন, সর্বশেষ এ ধরনের প্রচারণার ধারণাটি রাষ্ট্রীয়ভাবে ছড়ানো হয়েছিল ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৩ সালের নির্মম স্বৈরশাসনের সময়, যে সময়কার অপরাধগুলোকে মিলেই বারবার খাটো করে দেখানোর চেষ্টা করেছেন। ১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনায় আয়োজিত বিশ্বকাপের সময় দেশটির সামরিক সরকার (জান্তা) দাবি করেছিল, সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘনের সমালোচনা করাটা একটি ‘আর্জেন্টিনাবিরোধী প্রচারণার’ অংশ।

আরুগেতে বলেন, মিলেই অনলাইনে চলা ‘নানা মতের আলোচনাকে’ একটি রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে পরিণত করেছেন। এটি বামপন্থীদের বিরুদ্ধে তাঁর ‘সংস্কৃতি যুদ্ধের’ ধারণার সঙ্গে বেশ মানানসই। আর তিনি এমন এক সময়ে এটি করছেন যখন তাঁর সরকার ‘অভ্যন্তরীণভাবে অবনতিশীল পরিস্থিতির’ মুখে পড়েছে। যদিও মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আছে বলে মনে হচ্ছে, কিন্তু ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব ও দুর্নীতির কেলেঙ্কারি প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তাকে ক্ষমতায় বসার পর থেকে সবচেয়ে তলানিতে নিয়ে গেছে।

এই গবেষক বলেন, বামপন্থী বিদেশি সরকারগুলোর পরিচালিত কথিত সুসংগঠিত প্রচারণার শিকার সব আর্জেন্টাইন—এমন বয়ান মিলেইকে নিজের সরকারের ব্যর্থতার বিতর্ক থেকে জনগণের মনোযোগ একটি বহিরাগত শত্রুর দিকে সরাতে সাহায্য করে।