লাতিন আমেরিকায় এত আরব রাজনীতিবিদ কোথা থেকে এলেন
দেশটির অবস্থান আমাদের দেশ বাংলাদেশ ভূখণ্ড থেকে অনেক দূরে। নাম তার হন্ডুরাস। দেশটির নাম আমরা অনেকেই জানি, কিন্তু হালহকিকত, গতিবিধির খবর আমরা কম রাখি।
যে বিষয়টি নিয়ে আলোকপাত করতে যাচ্ছি, তার আগে ফুটবলের জন্য পরিচিত এই দেশ সম্পর্কে কিছু তথ্য দেওয়া যাক, যাতে পাঠকের বুঝতে সুবিধা হয়।
মধ্য আমেরিকার এই দেশ গৌরবময় প্রাচীন ইতিহাস ও জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। রাজধানী তেগুচিগালপা। ১ লাখ ১১ হাজার বর্গকিলোমিটারের দেশটিতে লোক বাস করে এক কোটির মতো। লাতিন ও মধ্য এশিয়ার বেশির ভাগ দেশের মতো এ দেশের মানুষেরও প্রধান ভাষা স্প্যানিশ।
দেশটি প্রধানত পাহাড়, উর্বর বন ও ক্যারিবীয় উপকূল নিয়ে গঠিত। হন্ডুরাসের অর্থনীতি কৃষি ও শিল্পের ওপর নির্ভরশীল, বিশেষ করে কফি, কলা ও বস্ত্র খাত। প্রাচীন মায়া সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ, সুন্দর সৈকত এবং দ্বীপগুলো পর্যটকদের আকর্ষণ করে। জনসংখ্যার প্রায় অধিকাংশই ক্যাথলিক খ্রিষ্টান। দেশটি তার সংগীত, নৃত্য ও উৎসবের জন্য পরিচিত। সব মিলিয়ে হন্ডুরাস প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহ্য এবং বৈচিত্র্যে ভরা একটি দেশ।
হন্ডুরাসে নির্বাচন, বিতর্ক ও ফিলিস্তিন
সম্প্রতি দেশটিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়েছে। এতে বিজয়ী হয়েছেন নাসরি আসফুরা। নামটি শুনে কি স্প্যানিশ মনে হচ্ছে? নির্বাচনে যিনি হেরে গেছেন, তাঁর নাম সালভাদর নাসরাল্লা। সালভাদর নামটিতে অবশ্য লাতিন ঘ্রাণ আছে। কিন্তু নাসরাল্লায়? একদমই নেই।
এটাই এই লেখার বিষয়। তার আগে বলে নিই, ছোট্ট ও দরিদ্র এই দেশে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ব্যাপক। সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার ঘটনায় আমরা দেখেছি, সেখানে ডোনাল্ড ট্রাম্প কী করেছেন। প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে তুলে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে গেছেন।
হন্ডুরাসের ক্ষেত্রেও ট্রাম্প হুমকি দিয়ে রেখেছিলেন, যদি নাসরি আসফুরা না জেতেন, তাহলে মার্কিন সহায়তা বন্ধ করে দেওয়া হবে। সে কারণেই কি না, জানি না; নানাভাবে জলঘোলা করে নির্বাচনের প্রায় এক মাস পর ফলাফল দেওয়া হলো। তাতে ট্রাম্পের প্রার্থীই জয়ী হলেন আর যিনি হেরে গেছেন, যুক্তিসংগতভাবে তিনি ফলাফল মেনে নেননি।
দরিদ্র দেশের গণতন্ত্র শক্তিশালী হওয়া কঠিন। হন্ডুরাসও এর ব্যতিক্রম নয়।
এবার মূল প্রসঙ্গে আসা যাক।
নতুন প্রেসিডেন্ট নাসরি আসফুরার সঙ্গে ফিলিস্তিনের যোগ রয়েছে। নাসরির জন্ম যদিও হন্ডুরাসের রাজধানী তেগুচিগালপায়, কিন্তু পরিবারটি এসেছে ফিলিস্তিন থেকে। আর নির্বাচনে যিনি দ্বিতীয় হয়েছেন, সেই সালভাদর নাসরাল্লার পূর্বপুরুষ এসেছে লেবানন থেকে।
প্রশ্ন হলো, খ্রিষ্টান অধ্যুষিত দেশটিতে মধ্যপ্রাচ্যে নাড়িপোঁতা এত লোক কোথা থেকে এলেন? আর ফিলিস্তিন বা লেবানন তো এঁদের কোনো প্রতিবেশীও নয়। অবশ্য দূরের পথ গমনের জন্য মানুষের কাছে দূরত্ব কখনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।
নাসরি আসফুরার পুরো নাম নাসরি হুয়ান আসফুরা জাবলাহ। টিটো নামে বেশি পরিচিত তিনি। ১৯৫৮ সালে তাঁর জন্ম রাজধানী তেগুচিগালপায়। জাতিতে ফিলিস্তিনি হলেও তিনি মুসলিম নন, খ্রিষ্টান। বিভিন্ন গণমাধ্যম সূত্র বলছে, দেশটিতে ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মানুষের সংখ্যা ২ লাখ ৮০ হাজার, যা চিলির পরে দ্বিতীয় বৃহত্তম আরব কমিউনিটি।
আসফুরা ছাড়াও আরও সেসব ফিলিস্তিনি দেশটিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় রয়েছেন, তাঁদের মধ্যে আছেন ব্যবসায়ী মিগুয়েল ফাকুশে বারজুম, পরিবেশবাদী জ্যানেট কাওয়াস। এমনকি হন্ডুরাসের সাবেক প্রেসিডেন্ট কার্লোস রবার্তো ফ্লোরেস, যিনি ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছেন, তিনিও একজন ফিলিস্তিনি।
আসফুরা ফিলিস্তিনি হলেও তিনি খ্রিষ্টান। ট্রাম্পের অনুসারী হিসেবে তাঁর পদক্ষেপ ফিলিস্তিনের পক্ষে হওয়ার কারণ নেই। এর আগে আসফুরার দল ন্যাশনাল পার্টি অব হন্ডুরাস থেকে প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন হুয়ান অরল্যান্ডো হার্নান্দেজ। তিনি হন্ডুরাসের দূতাবাস তেল আবিব থেকে সরিয়ে জেরুজালেমে নেওয়ার বিতর্কিত কাজটি করেছিলেন। পরে অবশ্য মাদক পাচারের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড হয়। সম্প্রতি ট্রাম্প তাঁকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।
হন্ডুরাসের রাজনীতিতে দুটি ধারা। একটি ধারার পৃষ্ঠপোষক আসফুরা-হার্নান্দেজরা। তাঁরা ইসরায়েলের সমর্থক ও ট্রাম্পপন্থী। আরেকটি ধারার নেতৃত্বে রয়েছেন জিওমারা কাস্ত্রো। ২০২২ সালে হার্নান্দেজকে হারিয়ে তিনি প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন। গাজায় ইসরায়েলের নির্দয় সামরিক অভিযানের তিনি কঠোর সমালোচক। সর্বশেষ নির্বাচনে তিনি অংশ নেননি।
লাতিন আমেরিকায় যত আরব রাজনীতিবিদ
হন্ডুরাসকে রেখে এবার পুরো লাতিন আমেরিকায় আরব বংশোদ্ভূত রাজনীতিকদের খবর নেওয়া যাক। প্রতিবেশী এল সালভাদরের বর্তমান প্রেসিডেন্ট নায়িব বুকেলে, তিনিও একজন ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত। পশ্চিমা দেশে এই বুকেলেকে ট্রাম্পের সঙ্গেই তুলনা করা হয় তাঁর নেতৃত্বের পপুলিস্ট স্টাইলের জন্য।
সমালোচকেরা অবশ্য বুকেলেকে কর্তৃত্বপরায়ণ শাসকও বলেন। তিনি প্রথমবার ২০১৯ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। পরে ২০২৪ সালের নির্বাচনে আবার বিজয়ী হয়েছেন, যার ফলে তিনি এখন দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব পালন করছেন।
শুধু বুকেলে নন, এল সালভাদরের আরেকজন প্রেসিডেন্ট, যিনি ২০০৪ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত শাসন করেছিলেন, সেই আন্তনিও সাকাও ছিলেন ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত। প্রেসিডেন্ট থাকার সময় তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। ২০১৮ সালে তিনি দুর্নীতির দায় স্বীকার করেন এবং কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন, যা এল সালভাদরের রাজনীতিতে বড় আলোড়ন তোলে।
ফিলিস্তিনি হলেও নায়িব বুকেলে এবং আন্তনিও সাকা—দুজনই ক্যাথলিক খ্রিষ্টান।
লাতিন আমেরিকায় অন্য আরব প্রভাবশালী রাজনীতিবিদদের একজন হলেন কার্লোস মেনেম, যিনি ১৯৮৯-১৯৯৯ সাল পর্যন্ত ১০ বছর ম্যারাডোনার দেশ আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন। সিরিয়ার ইয়ারবুদ থেকে আসা বাবা-মায়ের ঘরে মেনেমের জন্ম। মুসলিম হিসেবেই তিনি বেড়ে ওঠেন। পরে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেন। সে দেশে রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের উন্নতির জন্য ধর্ম পরিবর্তন না করে তাঁর উপায় ছিল না।
লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে বড় দেশ ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট ছিলেন মিশেল তেমের (২০১৬-২০১৯)। তাঁর বাবা-মা গত শতকের বিশের দশকে লেবানন থেকে ব্রাজিলে অভিবাসী হন। ইকুয়েডরের প্রেসিডেন্ট জামিল মাহুয়াদ, যিনি ১৯৯৮ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তাঁর শরীরেও আছে লেবাননের রক্ত।
ইকুয়েডরের আরেকজন প্রেসিডেন্ট আবদালা বুকারাম এবং কলম্বিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট হুলিও সিজার টারবে—দুজনই ছিলেন লেবানিজ বংশোদ্ভূত।
ইতিহাস বলছে, উনিশ ও বিশ শতকে মধ্যপ্রাচ্য, বিশেষ করে সিরিয়া, লেবানন ও ফিলিস্তিন থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ অভিবাসী হয়ে লাতিন আমেরিকায় যান। মূলত অর্থনৈতিক কারণেই তাঁরা দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। অন্যান্য কারণও নিশ্চয়ই ছিল।
বর্তমানে লাতিন আমেরিকায় আরব বংশোদ্ভূত মানুষের সংখ্যা ১ কোটি ৭০ লাখ থেকে ২ কোটি। লাতিন সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত তাঁরা। রাজনীতি, ব্যবসা, বিনোদন ও ক্রীড়াক্ষেত্রে অনেকেই শক্ত অবস্থান তৈরি করে নিয়েছেন।
ই–মেইল: [email protected]
সূত্র: বিবিসি, মিডলইস্ট আইসহ একাধিক গণমাধ্যম