ট্রাম্পের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানালেন শান্তিতে নোবেলজয়ী মাচাদো

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভেনেজুয়েলার বিরোধী দলের নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদোছবি: রয়টার্স

ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে তুলে যুক্তরাষ্ট্র নিয়ে আসার জন্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন ভেনেজুয়েলার বিরোধী দলের নেতা শান্তিতে নোবেলজয়ী মারিয়া কোরিনা মাচাদো। ট্রাম্পের শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্য বলে বিশ্বাস করেন, উল্লেখ করেছেন তিনি।

কারাকাসের স্থানীয় সময় সোমবার রাতে যুক্তরাষ্ট্রের টেলিভিশন চ্যানেল ফক্স নিউজের সঞ্চালক শন হ্যানিটিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন মাচাদো।

গত শনিবার ভোররাতে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসসহ বিভিন্ন জায়গায় হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। কারাকাস থেকে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেন্সকে তুলে নিউইয়র্কে নিয়ে আসেন যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা। তাঁদের বিরুদ্ধে মাদক চোরাচালান ও সন্ত্রাসের অভিযোগ এনে বিচার করার উদ্যোগ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র সরকার।

ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা। ৩ জানুয়ারি ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

একটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্রে যুক্তরাষ্ট্রের এই আগ্রাসনের প্রতিবাদে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রতিবাদ–বিক্ষোভ হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরেও বিক্ষোভ হয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতার নীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘ভেনেজুয়েলায় ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা, এর সম্ভাব্য আঞ্চলিক প্রভাব এবং রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি যে নজির স্থাপন করতে পারে, তা নিয়ে আমি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।’

ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে নিউইয়র্কের আদালতে নিয়ে যাচ্ছেন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। এ সময় তাঁর কপালে আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। ৫ জানুয়ারি ২০২৬, ম্যানহাটান
ছবি: রয়টার্স

এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে রাশিয়া বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় যেসব অপরাধ করেছে, সেগুলোর বৈধতা দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আর যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে অবৈধ ও গুন্ডামি আখ্যায়িত করে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে চীন।

এই পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সমর্থক টেলিভিশন চ্যানেল ফক্স নিউজকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন গত বছর শান্তিতে নোবেল পাওয়া মারিয়া কোরিনা মাচাদো। তিনি ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক পদক্ষেপকে ‘মানবতার জন্য বিরাট পদক্ষেপ’ বলেছেন। এর মধ্য দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিশ্বের কাছে তাঁর শান্তিতে নোবেল প্রাপ্য হওয়ার বিষয়টি প্রমাণ করেছেন বলে দাবি করেছেন তিনি।

নরওয়েতে একটি সংবাদ সম্মেলনে কথা বলছেন ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদো। ১১ ডিসেম্বর ২০২৫
ছবি: রয়টার্স

‘তাঁর (ট্রাম্প) পদক্ষেপগুলোর জন্য আমরা কতই কৃতজ্ঞ,’ বলেছেন মাচাদো। এর আগে এক্সে পোস্ট করা এক বিবৃতিতেও ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন তিনি। মাচাদো বলেছিলেন, ‘ভেনেজুয়েলার স্বাধীনতা আসন্ন এবং শিগগিরই আমরা আমাদের ভূমিতে তা উদ্‌যাপন করব।’

ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিকোলা মাদুরো বিরুদ্ধে ভেনেজুয়েলার নির্বাচনী ব্যবস্থা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করার অভিযোগ করেছেন বিরোধী দলের নেতা মাচাদো। এখন যত দ্রুত সম্ভব, ভেনেজুয়েলায় ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন বলে জানিয়েছেন তিনি। কয়েক মাস ধরে আত্মগোপনে আছেন মাচাদো। তিনি বলেছেন, দেশে ফেরা তাঁর জন্য নিরাপদ না হওয়ায় আত্মগোপনে থাকাই ভালো ছিল।

ভেনেজুয়েলায় অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়া দেলসি রদ্রিগেজকে নিয়েও আপত্তি জানিয়েছেন মাচাদো। আজই (সোমবার) ভেনেজুয়েলায় ১৪ জন সাংবাদিককে আটক করার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজের ওপর আস্থা রাখা যায় না। ভেনেজুয়েলার পরবর্তী ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়াকে অবশ্যই এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

ফক্স নিউজের উপস্থাপক শন হ্যানিটির সঙ্গে অল্প সময়েই কথা শেষ করেন মাচাদো।

কে এই মারিয়া কোরিনা মাচাদো

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোর তৃতীয় মেয়াদের শপথ অনুষ্ঠানের আগে কারাকাসে আয়োজিত এক বিক্ষোভে বিরোধী দলের নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদো। ৯ জানুয়ারি, ২০২৫
ছবি: রয়টার্স

ভেনেজুয়েলার বিরোধী দলের নেতা ৫৮ বছর বয়সী মারিয়া কোরিনা মাচাদো দীর্ঘদিন ধরে নিকোলা মাদুরোর সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলে আসছেন। তাঁকে ২০২৪ সালের নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। তবে তিনি তাঁর জায়গায় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা এদমুন্দো গোনসালেসের পক্ষে প্রচারণা চালিয়ে যান। নির্বাচনে মাদুরোকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়, যদিও ভোটকেন্দ্রগুলো থেকে পাওয়া হিসাবে দেখা যায়, এদমুন্দো গোনসালেস বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন।

মাচাদো অনেকবার গ্রেপ্তারের হুমকি দেওয়া হয়েছে। সে কারণে তিন সন্তানের মা মাচাদো গত বছরের বেশির ভাগ সময় আত্মগোপনে কাটান। নিরাপত্তার জন্য তিনি তাঁর প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে–মেয়েদের বিদেশে পাঠিয়ে দেন এবং প্রায় দুই বছর তাঁদের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়নি।

ভেনেজুয়েলায় রাজনৈতিক অবদানের জন্য মাচাদোকে ২০২৫ সালের শান্তিতে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। তখন বলা হয়েছিল, ভেনেজুয়েলায় ‘একটি ন্যায্য ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে স্বৈরতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণ প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের’ জন্য তাঁকে এই পুরস্কার দেওয়া হলো। পুরস্কারটি নিতে তাঁর নরওয়ে যাত্রা ছিল বেশ অভূতপূর্ব। মাচাদো ছদ্মবেশ নিয়ে ১০টি সেনা তল্লাশিচৌকি পার হন এবং উপকূলীয় একটি জেলেগ্রাম থেকে কাঠের ডিঙিনৌকায় যাত্রা করেন।