পিছিয়ে থেকেও কীভাবে ব্রাজিলের নির্বাচনের মোড় ঘুরিয়ে দিলেন লুলা, তাঁর ‘আর্মি’ কতটা ভূমিকা রেখেছে

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের চূড়ান্ত পর্বে বিজয়ের পর সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তব্য দিচ্ছেন লুইস ইনাসিও লুলা দা সিলভা। পৌলিস্তা অ্যাভিনিউ, সাও পাওলো, ব্রাজিল, ২৬ অক্টোবরছবি: রয়টার্স

লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার পুনর্নির্বাচনী প্রচারে সমর্থন জোগাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হোয়াটসঅ্যাপে একটি চ্যানেল খোলা হয়েছিল। ব্রাজিলের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে এই অভাবনীয় প্রত্যাবর্তনের পেছনে চ্যানেলটির বড় অবদান রয়েছে বলে মনে করছেন তাঁর মিত্ররা।

ব্রাজিলের বামপন্থী এই প্রেসিডেন্ট ডানপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারোর চেয়ে পিছিয়ে ছিলেন। কিন্তু মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যেই তিনি নির্বাচনের হিসাবনিকাশ পাল্টে দিতে সক্ষম হন।

‘লুলার আর্মি’র উত্থান

লুলা এই ফলাফল বদলাতে পারবেন কি না, তা নিয়ে যখন অনেকেই সন্দেহ করছিলেন, ঠিক তখনই ‘লুলার আর্মি’ নামের একটি হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল সামনে আসে। খুব দ্রুতই এর অনুসারীর সংখ্যা ১ কোটি ৮ লাখে পৌঁছায়।

কংগ্রেস সদস্য আন্দ্রে জানোনেস এই কার্যক্রমের নেতৃত্ব দেন। তিনি সমর্থকদের ভিডিও শেয়ার করতে, হ্যাশট্যাগ প্রচার করতে এবং নতুন ভোটার সংগ্রহ করতে উৎসাহিত করেন।

নির্বাচনের দুই দফার ভোটের মাঝখানে চ্যানেলটির এমন নাটকীয় বৃদ্ধি বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। কারণ, এটি ব্রাজিলের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের একটি ভারসাম্যহীনতাকে উল্টে দিয়েছিল বলে মনে করা হয়।

জনমত জরিপের পূর্বাভাস উপেক্ষা করে রাজপথে নেমে আসেন লুলার বিপুলসংখ্যক সমর্থক । ব্রাজিল
ছবি: রয়টার্স

বছরের পর বছর ধরে সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর সমর্থক রক্ষণশীলরাই অনলাইনে রাজনৈতিক প্রচারে আধিপত্য বিস্তার করে আসছিলেন। বিশেষ করে হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোতে তাদের দাপট ছিল।

‘লুলার আর্মি’র আত্মপ্রকাশ অনেক সমর্থককে বিশ্বাস করতে বাধ্য করেছে, ব্রাজিলের বামপন্থীরা অবশেষে ডিজিটাল ময়দানে লড়াই করার একটি উপায় খুঁজে পেয়েছে। এই পরিবর্তনটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, ২০১৮ সালে জইর বলসোনারোর নির্বাচনী বিজয়ের পর থেকে ব্রাজিলের রাজনীতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে আসছে। ওই সময় হোয়াটসঅ্যাপ নেটওয়ার্ক রাজনৈতিক প্রচারের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল।

লুলার আর্মির মেসেজগুলোতে প্রায়ই আগে থেকে তৈরি করা (রেডিমেড) কিছু নমুনা বা টেমপ্লেট দেওয়া থাকত, যা অনুসারীরা তাদের বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে শেয়ার করতে পারতেন। এর প্রতিটিতে সমর্থকদের জন্য নির্দিষ্ট কাজের কথা বলা থাকত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লুলার প্রচার বাড়ানোর লক্ষ্যেই এসব কাজ দেওয়া হতো।

জানোনেস প্রায়ই তাঁর ‘সৈন্যদের’ নির্দেশ দিতেন প্রচারের নতুন ভিডিওটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিতে অথবা নতুন কোনো হ্যাশট্যাগ ট্রেন্ডিংয়ে তুলতে সাহায্য করতে।

এসব নির্দেশের মধ্যে ছিল-‘বন্ধুরা, এটি জরুরি!’, ‘এখনই ঘুমাতে যেয়ো না’, ‘মিশন শেষ করার আগে কোনো খাবার নয়।’ এবং ‘ছুটিতে যাওয়ার আগে তোমাদের জন্য আরও একটি কাজ আছে’।

নির্বাচনের আগের দিন এই কংগ্রেস সদস্য ২৪ ঘণ্টার একটি লাইভ অনুষ্ঠানও করেন। এর নাম দেওয়া হয়েছিল ‘টার্নঅ্যারাউন্ড লাইভস্ট্রিম (মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার লাইভ)’। যদিও ওই সময় পর্যন্ত নির্বাচনী জরিপগুলোতে বলসোনারোর জয়ের সম্ভাবনার কথাই বলা হচ্ছিল।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ের পর বক্তব্য দেওয়ার সময় লুইস ইনাসিও লুলা দা সিলভাকে জড়িয়ে ধরেন ব্রাজিলের আইনপ্রণেতা আন্দ্রে জানোনেস। সাও পাওলো, ব্রাজিল, ২৫ অক্টোবর
।ছবি: রয়টার্স

এই কৌশলটি কাজে লেগেছিল। তবে ওয়ার্কার্স পার্টির কিছু সদস্য চিন্তিত ছিলেন। কারণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানোনেসের আক্রমণাত্মক ধরন লুলার ভাবমূর্তিকে নষ্ট করতে পারে বলে তারা ভয় পাচ্ছিলেন। তারা মূলত লুলার একটি নমনীয় বা শান্ত স্বভাবের ভাবমূর্তি তুলে ধরতে চেয়েছিলেন।

নিজের বিজয়ী ভাষণে লুলা জানোনেসকে ‘আমাদের সেনাপতি’ বলে উল্লেখ করেন। ‘প্রতিদিন আমাদের সৈন্যদের মনোবল বাড়ানোর’ জন্য তিনি তাঁকে ধন্যবাদও জানান।

প্রত্যাবর্তনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা

তবে অনলাইনে চালানো প্রচারের কারণে নির্বাচনে ঠিক কতটা প্রভাব পড়েছে, তার বিচার করা বেশ কঠিন একটা কাজ।

লুলার মিত্ররা এই ঘুরে দাঁড়ানোর পেছনে লুলার ‘আর্মিকে’ কৃতিত্ব দিলেও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, হোয়াটসঅ্যাপের এই কার্যক্রম সরাসরি কতগুলো ভোট টানতে পেরেছে, তা নিশ্চিত করে বলা অসম্ভব।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ডেনিল্ডে হোলজহ্যাকার মনে করেন, নির্বাচনী প্রচাররে কৌশল বদলানোই ছিল লুলার এই প্রত্যাবর্তনের মূল চাবিকাঠি।

হোলজহ্যাকার বলেন, ওয়ার্কার্স পার্টির এই প্রার্থী শুধু অনলাইনের ওপর নির্ভর করে থাকেননি। তিনি মাঠপর্যায়ে প্রচারের সঙ্গে ডিজিটাল প্রচারকে যুক্ত করতে সফল হয়েছিলেন।

হোলজহ্যাকারের মতে, প্রচারে স্থানীয় পর্যায়ের কাজগুলোকে আরও জোরদার করা হয়েছিল এবং বার্তার ধরনও পাল্টানো হয়েছিল। বলসোনারো জিতলে সামাজিক কর্মসূচিগুলো বদলে যেতে পারে এবং মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন হতে পারে—এই আশঙ্কার কথা প্রচারের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল।

এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বলেন, ‘লুলা নিজের দুর্বলতা বুঝতে পেরেছিলেন এবং নিজের কাজের ধরনে পুরোপুরি পরিবর্তন এনেছিলেন। এটাই তাঁর বড় সাফল্য। আর জানোনেস এমন কিছু করে দেখিয়েছেন, যা ব্রাজিলের বামপন্থীদের কাছে একসময় অকল্পনীয় ছিল—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আধিপত্য বিস্তার করা।’

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফল দেখে উল্লাস প্রকাশ করছেন লুইস ইনাসিও লুলা দা সিলভার এক সমর্থক। সাও পাওলো, ব্রাজিল, ২৫ অক্টোবর
ছবি: রয়টার্স

অন্যদিকে হোলজহ্যাকার মনে করেন, ফ্লাভিও বলসোনারো দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। ফলে তিনি তাঁর সমর্থকদের কাছে নিজের বার্তাগুলো কার্যকরভাবে পৌঁছে দিতে ব্যর্থ হন।

রিও ডি জেনিরো ফেডারেল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞানী ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মায়রা গোলার্টও শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে লুলার প্রত্যাবর্তনের কৃতিত্ব দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করেছেন।

মায়রা বলেন, ‘এটি ছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং মাঠপর্যায়ের প্রচারের এক দারুণ সমন্বয়। মাঠপর্যায়ের প্রচারের কারণে ভোট না দেওয়া মানুষের সংখ্যা কমেছে এবং সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগা ভোটারদের মন জয় করা সম্ভব হয়েছে।’

মায়রার মতে, লুলার সমর্থকেরা অনলাইনের এই উৎসাহ-উদ্দীপনাকে বাস্তবের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে রূপ দিতে সফল হয়েছিলেন।

মায়রা বলেন, ‘লুলার জয়ের ব্যাপারে যারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন, তারা মানুষকে এক করতে এবং তাদের ভোট দিতে রাজি করাতে কাজ করেছেন।’

মায়রা মনে করেন, এই চেষ্টা শুধু ভোটের উপস্থিতি বাড়াতেই সাহায্য করেনি, বরং লুলার পরবর্তী সরকারের জন্যও এটি অনেক কাজে আসতে পারে।

এই অধ্যাপক আরও বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, এই সম্মিলিত প্রচেষ্টাটি ছিল শেখার গুরুত্বপূর্ণ এক অভিজ্ঞতা। যে সরকারকে সামনে আরও অনেক লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে হবে, তাদের জন্য এটি দারুণ কাজে আসবে। এটি শুধু ভোট বর্জনের হার কমায়নি, বরং উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সিদ্ধান্তহীন ভোটারকেও পক্ষে টানতে সাহায্য করেছে।’

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের চূড়ান্ত পর্বে জয় উদ্‌যাপনে জড়ো হয়েছেন লুইস ইনাসিও লুলা দা সিলভার সমর্থকেরা। সাও পাওলো, ব্রাজিল, ২৫ অক্টোবর
ছবি: রয়টার্স

লুলা নিজেও ইঙ্গিত দিয়েছেন, তাঁর প্রত্যাবর্তনের পেছনে যে রাজনৈতিক ঐক্য কাজ করেছে, তা আগামী বছরগুলোতে তাঁর দেশ চালানোর পদ্ধতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।

বিজয়ী ভাষণে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট বলেন, এই নির্বাচন তাঁকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। তিনি ব্রাজিলের শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন আনারও প্রতিশ্রুতি দেন।

লুলা বলেন, ‘আমরা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের মতামতকে বেশি গুরুত্ব দেব। আর আমার সরকারে ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থা আরও বড় ভূমিকা পালন করবে।’