নির্বাচনী ব্যবস্থাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
নির্বাচনী ব্যবস্থাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পছবি: রয়টার্স

এটা অনেক পুরোনো কথা যে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সি যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কফিনবন্দী করছে। গণতন্ত্রের ফেরিঅলা রাষ্ট্রটির নির্বাচনী ব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে এবার এতে শেষ পেরেক ঠোকার কাজ করা হচ্ছে। সবার চোখ এখন আগামী নভেম্বরে। ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় নির্বাচন নিয়ে নানা শঙ্কা হাওয়ায় ঘুরপাক খেতে শুরু করেছে। শঙ্কা এই নিয়ে নয় যে, আসন্ন নির্বাচন কদর্য রূপ নেবে। বরং তা কতটা কদর্য হবে—সে প্রশ্নই এখন শঙ্কার কেন্দ্রে চলে এসেছে।

যুক্তরাষ্ট্রে চলমান অস্থিরতা, ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রবণতা ও এর কারণে মার্কিন সমাজে সৃষ্ট নানা বিভাজনের কারণে আগামী ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থকেরা পোর্টল্যান্ড, ওরেগন ইত্যাদি ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত। এর মধ্যেই সহিংসতা ছড়িয়ে পড়া অঙ্গরাজ্য উইসকনসিনে প্রেসিডেন্ট উড়ে গেছেন শুধু আগুনে পুড়তে থাকা একটি ভবনের সামনে নিজের ছবি তোলার জন্য, যাতে নির্বাচনী প্রচারে তা কাজে লাগানো যায়। সহিংসতা থামানোর বদলে তা উসকে দিতে যা যা করা প্রয়োজন, তার সবই করছেন তিনি। নিজের নির্বাচনী প্রচারে এই সহিংস পরিস্থিতিকেই পুঁজি করার চেষ্টা করছেন।

বিজ্ঞাপন
  • প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন নির্বাচনী ব্যবস্থাকেই বিতর্কিত করে তুলেছেন

  • পরাজিত প্রার্থী নির্বাচনের ফল মানবেন কিন–তা নিয়ে সংশয় গাঢ় হচ্ছে

  • সহিংসতা উসকে দিয়ে তার সুবিধা নিতে চাইছেন ট্রাম্প

  • নির্বাচনী ফলে ব্যবধান যত কম হবে সংকট তত গভীর হবে

প্রেসিডেন্টের এই অবস্থান বহু মার্কিনকে আসন্ন নির্বাচন নিয়ে শঙ্কায় ফেলে দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, আসছে নভেম্বর এক কদর্য নির্বাচন উপহার দেবে, যা যুক্তরাষ্ট্র আগে কখনো দেখেনি। এমন আশঙ্কার যথেষ্ট কারণও রয়েছে।

মার্কিন নির্বাচনের ইতিহাস বলছে, ১৯৬৮ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রার্থী ববি কেনেডি হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। তারও আগে ১৯১২ সালে আজকের উত্তাল অঙ্গরাজ্য উইসকনসিনে এক সভায় বক্তব্য রাখার সময় গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন সে সময়ের প্রার্থী টেডি রুজভেল্ট। খুব বেশি পেছনে যেতে হবে না, ২০০০ সালের নির্বাচনের দিকেই তাকানো যাক। সে সময় নির্বাচনের ফল পেতে আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়েছিল। কিন্তু সবগুলো ক্ষেত্রেই নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলের বিষয়ে পরাজিত পক্ষের সম্মতি আদায় করা গিয়েছিল। এমনকি গৃহযুদ্ধের সময়ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের নির্বাচনের এ বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রাখতে পেরেছিল। এটাই মার্কিন নির্বাচনের ধারাকে অন্য দেশগুলো থেকে আলাদা করেছে। কিন্তু এবার ঠিক এ জায়গাতেই ব্যত্যয় ঘটার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচনই হচ্ছে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের উপায়। আর এ শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর তখনই সম্ভব হয়, যখন পরাজিত প্রার্থী ও তাঁর সমর্থকগোষ্ঠী তাদের পরাজয় মেনে নেয়। রাজনৈতিক নেতা, দল ও গণতান্ত্রিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে একযোগে এই বিষয়টি নিয়ে কাজ করতে হয়।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচনই হচ্ছে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের উপায়। আর এ শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর তখনই সম্ভব হয়, যখন পরাজিত প্রার্থী ও তাঁর সমর্থকগোষ্ঠী তাদের পরাজয় মেনে নেয়। রাজনৈতিক নেতা, দল ও গণতান্ত্রিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে একযোগে এই বিষয়টি নিয়ে কাজ করতে হয়। সবার সম্মিলিত চেষ্টাতেই এ ধরনের ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, যেখানে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়টি নিয়ে দুর্ভাবনা থাকে না।

কোনো নির্বাচনের ফল নিয়ে সংকট তৈরি হলে তা নিরসনের জন্য সব সময় একটি বিকল্প পন্থা হাজির থাকতে হয়। পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোতে এ ধরনের সংকট কম হলেও একেবারে হয় না—এমন নয়। ২০০৬ সালেই যেমন ইতালির নির্বাচনে খুব কম ব্যবধানে পরাজিত হন সিলভিও বারলুসকোনি। কোনো প্রমাণ ছাড়াই তিনি ব্যাপক ভোট জালিয়াতির অভিযোগ তোলেন। পরে আদালতের মাধ্যমে বিষয়টির সুরাহা হয়। বারলুসকোনি হেরে যান এবং তা মেনেও নেন। ২০০০ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের কথা আগেই বলা হয়েছে। সে সময় সুপ্রিম কোর্টের রায় মেনে নিয়েছিলেন পরাজিত প্রার্থী আল গোর। উভয় ক্ষেত্রেই হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর ফলাফলের জন্য আদালতের দারস্থ গতে হয়েছিল। এর মাধ্যমে সংকট জিইয়ে না রেখে সামনে এগোনোর পথ পেয়েছিল ইতালি ও যুক্তরাষ্ট্র।

বিজ্ঞাপন
default-image

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন নিয়ে এবার শঙ্কার কারণটি ঠিক এ জায়গাতেই। আগের মতো এবার যদি নির্বাচনের ফলাফল খুব কাছাকাছি হয়, তাহলে এক ভয়াবহ সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জো বাইডেনের মধ্যে ব্যবধান যত কমবে, সংকট তত বাড়বে।

অধিকাংশ ডেমোক্র্যাট যৌক্তিক কারণেই ডোনাল্ড ট্রাম্পকে গণতন্ত্রের জন্য হুমকি বলে মনে করেন। তাঁর পুনর্নির্বাচন এদের অনেককেই উন্মত্ত করে তুলতে পারে। অন্যদিকে নিজ দলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রহণযোগ্যতা এখনো ৮৭ শতাংশ। ফলে তিনি পরাজিত হলে রিপাবলিকানদের অধিকাংশই মনে করবেন, তাঁরা প্রতারণার শিকার। ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজে বারবার করে সম্ভাব্য ভোট জালিয়াতির কথা এ কারণেই বলছেন। এতে চলমান অস্থিরতা ও সহিংসতা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হলে অনেক বড় ব্যবধানে জয়ী হওয়ার চাপ সৃষ্টি হচ্ছে জো বাইডেনের ওপর।

default-image

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন পদ্ধতি অন্য দেশগুলো থেকে আলাদা। এখানে স্বাধীন কোনো নির্বাচন কমিশনের বদলে পুরো বিষয়টির তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব অনেকটাই রয়েছে ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান দলের ঘাড়ে। ভোটার তালিকা হালনাগাদ, ব্যালট পেপারের ধরন, ভোটকেন্দ্রের স্থান, আগাম ভোট নেওয়া হবে কিনা, ডাকযোগে কতজনের ভোট নেওয়া হবে ইত্যাদি বিষয়গুলো এ দুই দলই ঠিক করে। অন্য দেশে এ ধরনের বিষয় নির্দলীয় কমিশন ঠিক করে। ব্যবধান কম হলে এই সবই একেবারে তালগোল পাকিয়ে যাবে। নিশ্চিতভাবেই বিষয়টি তখন আদালতে যাবে, যেখানে আবার রয়েছেন সেই বিচারকেরা, যারা আনুগত্য বিবেচনায় হয় ডেমোক্র্যাট, নয় রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট বা গভর্নরের সময়ে নিয়োগ পেয়েছেন।

এবার আসা যাক ডাকযোগে ভোটের বিষয়ে, যাকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অনেক দিন ধরেই সীমিত ও বিতর্কিত করতে উঠেপড়ে লেগেছেন। যদিও তিনি নিজেই বহু বছর ধরে ডাকযোগেই ভোট দিয়ে আসছেন। কোভিড-১৯ মহামারির বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে ডাকযোগে ভোটের বিষয়টি। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই সময়ে এসেই ডাক বিভাগের বরাদ্দ কমানোর পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। কোনো প্রমাণ ছাড়াই ভোট জালিয়াতির কথা বলছেন। এমনকি সম্প্রতি নর্থ ক্যারোলাইনার ভোটারদের নির্বাচনী ব্যবস্থা কাজ করে কিনা তা পরীক্ষার জন্য দুবার করে ভোট দেওয়ার অভাবিত এক আহ্বান পর্যন্ত জানিয়েছেন। তাঁর এ ধরনের নেতিবাচক প্রচার ও পদক্ষেপ বেশ কাজেও দিচ্ছে বলা যায়। এরই মধ্যে ডাকযোগে ভোট নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পরিস্থিতি বলছে, দু দলের নেতা-কর্মী ও সমর্থক কেউ এমন পরিস্থিতিতে পরাজয় মানতে চাইবেন না। কোভিড-১৯, অর্থনৈতিক দুরবস্থা, রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা এবং বর্ণবাদসহ নানা বিভাজনের রাজনীতির জেরে যে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, তাতে দেশজুড়ে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়লেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

মুশকিল আরও আছে। ডাকযোগে আসা ভোট গণনায় সাধারণত তুলনামূলক বেশি সময় লাগে। এবার করোনা পরিস্থিতির কারণে বহু অঙ্গরাজ্যেই ভোটারদের একটি বড় অংশ ডাকযোগে ভোটের আবেদন করে রেখেছেন। এতে ফল প্রকাশে বিলম্ব হবে। এখন ধরা যাক, কোনো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যে ট্রাম্প এগিয়ে রয়েছেন। তখনো হয়তো ডাকযোগে ভোটের ফল ঘোষণা করা হয়নি। ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বভাব বলছে, এ অবস্থায় তিনি নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করে বসতে পারেন, যেমনটা তিনি ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনে ফ্লোরিডার ক্ষেত্রে করেছিলেন। এটি তখন এক গভীর সংকট তৈরি করবে। কারণ, সব ভোট গণনার পর যদি দেখা যায় অঙ্গরাজ্যটিতে জো বাইডেন জয়ী হয়েছেন, তাহলে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর সমর্থকেরা তা মানতে চাইবেন না। আদালতে গিয়ে আবার ট্রাম্প জয়ী হলে বাইডেনের সমর্থকেরাই-বা তা কেন মানবেন? পরিস্থিতি তো ২০০০ সালের মতো নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের পরিস্থিতি বলছে, দু দলের নেতা-কর্মী ও সমর্থক কেউ এমন পরিস্থিতিতে পরাজয় মানতে চাইবেন না। কোভিড-১৯, অর্থনৈতিক দুরবস্থা, রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা এবং বর্ণবাদসহ নানা বিভাজনের রাজনীতির জেরে যে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, তাতে এ ধরনের পরিস্থিতিতে দেশজুড়ে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়লেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

বিজ্ঞাপন
default-image

এর সঙ্গে ২০১৬ সালের নির্বাচনে রুশ হস্তক্ষেপের বিষয়টিকে যুক্ত করলে, আসন্ন নির্বাচন নিয়ে মার্কিন জনমনে বিদ্যমান সংশয়টি খুব ভালোভাবে বোঝা যাবে। ২০১৬ সালের মতো ডোনাল্ড ট্রাম্প শুধু ইলেক্টোরাল কলেজ ভোটে জয়ী হলে, অধিকাংশ ডেমোক্র্যাট তাঁর প্রেসিডেন্সিকে মানবে না। আর ডোনাল্ড ট্রাম্প পরাজিত হলে রিপাবলিকান সমর্থকদের একটি বড় অংশই মনে করবে, বড় ধরনের জালিয়াতি ঘটেছে, যার কথা প্রেসিডেন্ট আগেই বলেছিলেন।

কোভিড-১৯-কে পুঁজি করে আসন্ন নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত নির্বাচন পদ্ধতিকে বিতর্কিত করার যে প্রয়াস ডোনাল্ড ট্রাম্প নিয়েছেন, তার ফল খুব ভয়াবহ হতে পারে। আসছে নভেম্বরে নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর বড় ধরনের সহিংসতা ছড়িয়ে পড়তে পারে, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসেই যা বিরল। গত জুলাইয়ে প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসিসহ ডেমোক্র্যাট নেতৃত্ব চিঠির মাধ্যমে নির্বাচনে বিদেশি হস্তক্ষেপের যে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, তার চেয়েও বড় শঙ্কা এখন সামনে উপস্থিত। কারণ রাশিয়া, চীন বা ইরান নয়, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন ও গণতন্ত্র সবচেয়ে বড় হুমকিতে রয়েছে আদতে এর সুরক্ষার শপথ নেওয়া প্রেসিডেন্টের কাছ থেকেই।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন