নেপালেরও পেছনে বাংলাদেশ

বাংলাদেশ বছরে আমেরিকা থেকে ৪৫ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে। ভারত আয় করে ১ হাজার ৬৫ কোটি ৭০ লাখ ডলার। অন্যদিকে নেপাল আয় করে ৩১ কোটি ৪০ লাখ ডলার। নেপালের জনসংখ্যা ২ কোটি ৯০ লাখ, আর বাংলাদেশের ১৬ কোটির বেশি। জনসংখ্যার হিসেবে নেপালের আয় করার কথা ৮ কোটি ৮০ লাখ ডলার। আমেরিকা থেকে বাংলাদেশের চেয়ে কিছুটা কম হলেও জনসংখ্যার তুলনা করলে তারা বাংলাদেশের চেয়ে বেশিই বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে।
বাংলাদেশ আর নেপালের জনসংখ্যা হিসাব করলে জনসংখ্যা অনুযায়ী ভারতের ৭৭০ কোটি ডলারের বেশি আয় হওয়ার কথা। কিন্তু তারা আয় করে অনেক বেশি। সেই তুলনায় পিছিয়ে আছে বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের পরিমাণ। বিশ্বব্যাংকের শ্রমবাজার বৈদেশিক মুদ্রা ও অভিবাসন পর্যালোচনা প্রতিবেদন থেকে বাংলাদেশ, নেপাল ও ভারতের রেমিট্যান্সের তুলনামূলক এই চিত্র পাওয়া গেছে।
আমেরিকার অভিবাসন স্রোত পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলেও বিশ্বব্যাংকের এই রেমিট্যান্স প্রতিবেদনের সত্যতা পাওয়া যায়। ২০১৬ সালে সারা বিশ্ব থেকে মোট ১১ লাখ ৮৩ হাজার ৫০৫ জন আমেরিকায় গ্রিন কার্ড পেয়েছেন। সেখানে দক্ষিণ এশিয়ার পাঁচ দেশের মধ্যে শুধু ভারতের ৫৪ হাজার ৬৪৭ জন, পাকিস্তানের ১৯ হাজার ৩১৩ জন ও বাংলাদেশ থেকে ১৮ হাজার ৭২৩ জন গ্রিন কার্ড পেয়েছেন। বাংলাদেশের এই ১৮ হাজারের মধ্যে আবার ৯ হাজার ৮৯৯ জন এসেছেন পারিবারিক অভিবাসন সূত্রে।

বাংলাদেশ থেকে দক্ষ বা স্কিলড অভিবাসনের সুযোগ পেয়েছেন মাত্র ৬৫৩ জন। ভারতের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা ২০ হাজার ৭৭৪ জন, আর নেপালে থেকে এসেছেন ১ হাজার ৩৮৬ জন। পাকিস্তান থেকে এসেছেন ১ হাজার ৯৯২ জন। নেপাল ও পাকিস্তান—উভয় দেশের জনসংখ্যাই বাংলাদেশের চেয়ে অনেক কম। ২০১৫ সালেও চিত্র ছিল একই। ওই বছর ১৩ হাজার ৫৭৩ জনের মধ্যে ১২ হাজারের বেশি এসেছেন পারিবারিক সূত্রে গ্রিন কার্ড নিয়ে। অথচ দক্ষ অভিবাসন ক্যাটাগরিতে এসেছে মাত্র ৬৫৩ জন।
সম্প্রতি প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার সঙ্গে আলাপকালে অভিবাসন আইনজীবী নেপালি বংশোদ্ভূত অ্যাটর্নি দিল্লি রাজ ভট্ট বলছিলেন, ‘কিছুদিন আগে আমি বাংলাদেশে গিয়েছিলাম। আমি অর্থনৈতিক উন্নয়ন দেখে রীতিমতো চমকে গেছি। সেখানকার মানুষ নেপালের চেয়ে অন্তত শতভাগ এগিয়ে। কিন্তু আমেরিকায় তাদের অভিবাসন যোগ্যতার চিত্র একেবারে নাজুক। অথচ বাংলাদেশের মানুষ অনেক বেশি দক্ষ ও বৈশ্বিক।
আমেরিকার অভিবাসন ব্যবস্থা সংস্কারে অভ্যন্তরীণভাবে কাজ চলছে, যেখানে পারিবারিক অভিবাসন কমিয়ে দেওয়াসহ বেশ কিছু বিষয় সামনে আনা হয়েছে। ডিভি লটারি ও পারিবারিক অভিবাসন কমিয়ে পয়েন্টভিত্তিক কর্মসংস্থান ভিসার প্রাধান্য দিতেই প্রস্তাব তুলে ধরেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেখানে এরই মধ্যে কর্মসংস্থানভিত্তিক ভিসা ক্যাটাগরিতে তলানির দিকে আছে বাংলাদেশ। পারিবারিক অভিবাসন স্রোত কমে গেলে দেশে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানো অব্যাহত রাখতে কর্মসংস্থানভিত্তিক অভিবাসন ভিসায় বাংলাদেশের প্রাধান্য বাড়াতেই জোর দিতে পরামর্শ দিচ্ছেন অভিবাসন আইনজীবীরা।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন সংক্রান্ত কাগজপত্র আর ইউএসসিআইএস থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যাচ্ছে, মূলত ইবি ক্যাটাগরিতেই কর্মভিত্তিক ভিসার সুযোগ নিচ্ছে বিশ্বের অনেক দেশ। দক্ষিণ এশিয়ার পাঁচ দেশ বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার মধ্যে এই কর্মভিত্তিক গ্রিন কার্ড প্রাপ্তির তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান নিচের দিক থেকে দ্বিতীয়।
২০১৭ সালে বিশ্বের মোট ৪১ হাজার ৮২৭ জনকে ইবি-১ ক্যাটাগরির গ্রিন কার্ড দেওয়া হয়েছে। যার অর্ধেকের বেশি অর্থাৎ ২৫ হাজারের বেশি মানুষ এসেছে এশিয়া থেকে। আবার এশিয়ার মধ্যে শুধু ভারত থেকে এসেছে ১৩ হাজার ৮১ জন। এরপর পাকিস্তান থেকে পাকিস্তান থেকে ২০১ জন, নেপাল থেকে ১৪৮ জন আর বাংলাদেশ থেকে মাত্র ৯১ জন এসেছে। একই চিত্র ইবি-২ ক্যাটাগরির ভিসায়। বিশ্বের ৩৯ হাজার ৯৬১ জনের মধ্যে এশিয়া থেকে ২১ হাজার ৮৭৬ জন। এই ক্যাটাগরিতে কেবল ভারত থেকে ২ হাজার ৮৭৯ জন, নেপাল থেকে ৮৪৯ জন আর বাংলাদেশ থেকে নেপালের অর্ধেক ৪৯৩ জন এসেছে। ইবি-৩ ক্যাটাগরির পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, এশিয়ার ২৫ হাজারের বেশি গ্রিন কার্ড প্রাপ্তির তালিকায় ভারতের ৬ হাজার ৬৪১ জন, নেপালের ৪২০ জন, পাকিস্তানের ৭৮৭ জন আর বাংলাদেশের আছে মাত্র ১৫৪ জন।
২০১৫ সালে এই কর্মসংস্থান ভিসা (ইবি-১ থেকে ইবি ৫) ক্যাটাগরিতে বাংলাদেশ থেকে ৬৬৮ জন গ্রিন কার্ড পেয়েছেন। ২০১৭ সালে কিছু সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৮৪ জন। সেখানে একই বছর অর্থাৎ ২০১৭ সালে ইবির সব ক্যাটাগরি মিলিয়ে নেপাল থেকে গ্রিন কার্ড পেয়েছেন ১ হাজার ৪৩৬ জন। আর ভারত থেকে পেয়েছেন ২৩ হাজার ৪৭২ জন। এই পরিসংখ্যান বলে দিচ্ছে, আমেরিকায় অভিবাসন ভিসার মধ্যে দক্ষ অভিবাসনে অনেক পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। ভারত তো দূরের কথা, নেপাল আর পাকিস্তানের মতো দেশও বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে আছে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জ্ঞানের স্বল্পতা, যোগাযোগের অভাব আর অনীহার কারণেই আমেরিকায় বাংলাদেশ থেকে কর্মভিত্তিক অভিবাসন ভিসার পরিমাণ বেশ কম। আর দেশে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানোর চিত্রে এর প্রভাব বেশ স্পষ্ট।