বাইডেনের পররাষ্ট্রনীতির সাফল্য-ব্যর্থতা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন
ছবি : রয়টার্স

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্কের খোলনলচে পাল্টে ফেলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এ বছরের ২০ জানুয়ারি ক্ষমতায় বসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন।

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একলা চলার নীতি বদলে সবাইকে নিয়ে পথচলার প্রতিশ্রুতি দেয় এ প্রশাসন। এর পাশাপাশি ‘মধ্যবিত্তের জন্য বৈদেশিক নীতি’ গ্রহণ করে বিদেশে মার্কিন স্বার্থের সঙ্গে দেশে স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির পথ বেছে নেওয়ার কথা বলেন জো বাইডেন।

কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল-জাজিরার খবরে বলা হয়, বাইডেন প্রশাসন যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তার মধ্যে ছিল বৈশ্বিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে পুনরায় সম্পর্ক স্থাপন, মার্কিন নেতৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের অবসান, চীনের ক্রমবর্ধমান আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আরও সক্রিয় প্রতিক্রিয়া, রাশিয়ার সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক স্থাপন, ইরান পারমাণবিক চুক্তি পুনরুদ্ধার, মেক্সিকোর সঙ্গে দক্ষিণ সীমান্তে ওয়াশিংটনের আরও মানবিক নীতি যুক্ত করা।

এদিকে বছর শেষ হতে চলল। এর মধ্যেই বাইডেন প্রশাসন মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করতে এবং বিশ্বব্যাপী সংকট মোকাবিলায় মূল খেলোয়াড় হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরির চেষ্টা করছে। তবে একই সময়ে মানবাধিকার-নেতৃত্বপূর্ণ বৈদেশিক নীতির প্রতিশ্রুতি মেনে চলতে ব্যর্থ হওয়ার জন্য সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছে। এ ছাড়া কেউ কেউ বলেছেন, বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর মধ্যে যখন বৈশ্বিক সহযোগিতা ব্যাপকভাবে প্রয়োজন, তখন বাইডেন প্রশাসন মতাদর্শগত পার্থক্যগুলো ব্যাপকভাবে জোরদার করে তুলেছে।

প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার অধীনে পাবলিক অ্যাফেয়ার্সের সাবেক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পিজে ক্রাউলি আল-জাজিরাকে বলেছেন, ২০২১ সালটি রূপান্তরের বছর।

ট্রাম্পের আবেগপ্রবণতাকে প্রেসিডেন্ট বাইডেন যুক্তি ও বাস্তবতা দিয়ে প্রতিস্থাপন করেছেন। মার্কিন নীতি আসলে কী, তা আরও বেশি বোঝা গেছে। এটাই প্রকৃত অর্জন।

কিন্তু এটাই আবার আগামী বছরের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াতে পারে। মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির সুর পাল্টে দিয়ে বাইডেন কি অর্থপূর্ণ কোনো ফল এনে দিতে পারবেন?

২০২১ সালের মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির পদক্ষেপগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মিত্রদেশ ও সংস্থাগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন। ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই বাইডেন প্রশাসন আগের প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে নতুন পদক্ষেপ নিতে শুরু করে। শুরুতেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে ফেরার মধ্য দিয়ে নতুন পদক্ষেপ শুরু করেন বাইডেন।

এর আগে ২০১৭ সালে প্যারিস জলবায়ু চুক্তি ও ২০২০ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ ছাড়া সামরিক জোট ন্যাটোর মিত্রদের সঙ্গে ট্রাম্প যে মুখোমুখি অবস্থান তৈরি করেছিলেন, সেখান থেকে দ্রুত সরে আসেন বাইডেন। উত্তর আমেরিকার প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক সংশোধন করা, জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের সংযুক্তি বাড়ানো এবং বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই, করোনা মহামারির ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়া ও নাগরিক স্বাধীনতার পিছিয়ে যাওয়া ঠেকাতে নেতৃত্বের ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের অবস্থানকে শক্তিশালী করার মতো পদক্ষেপ নেন তিনি।

গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে বাইডেন নিরলস মার্কিন কূটনীতির একটি যুগের কথা বলেছিলেন, যা ইতিহাসের পরিবর্তন বিন্দুতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে শক্তিশালী করবে।

এ বছরটি বাইডেন শেষ করেছেন ‘গণতন্ত্র সম্মেলন’ বা সামিট অব ডেমোক্রেসি দিয়ে। এর লক্ষ্য ছিল বিশ্বনেতাদের কাছ থেকে সংস্কারের প্রতিশ্রুতির জন্য চাপ দেওয়া। তবে এ সম্মেলনে আমন্ত্রিত অতিথি তালিকা নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নির্বাচনের গোলমাল এই ইস্যুতে তাদের রাজত্ব করার ক্ষমতাকে কমিয়েছে কি না, তা নিয়েও সমালোচনা হয়েছে।

বাইডেনের দীর্ঘদিনের মিত্ররা বিশ্বমঞ্চে তাঁর অনুমানযোগ্য কর্মপদ্ধতিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে তাঁর প্রথম বছরটা একেবারে মসৃণ হচ্ছে না। আফগানিস্তান থেকে বিশৃঙ্খলভাবে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের মতো বিষয় নিয়ে ওয়াশিংটনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে ন্যাটো মিত্ররা প্রশ্ন তুলেছেন। সম্প্রতি ইউক্রেন সীমান্তে রাশিয়ান সেনা মোতায়েন নিয়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বাইডেনের সরাসরি আলোচনা এ ক্ষেত্রে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এ ক্ষেত্রে ন্যাটো সদস্যরাও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। তারা আশঙ্কা করছে, মস্কো হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ক্ষতিকর ছাড় পেয়ে যাবে।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য মিলে অস্ট্রেলিয়ার কাছে পারমাণবিক সাবমেরিন বিক্রির যে চুক্তি করেছে তাতে দীর্ঘদিনের মিত্র ফ্রান্স নাখোশ হয়েছে।


গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর প্রতি নীতির পরিবর্তন

২০১৮ সাল থেকে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে বাণিজ্যযুদ্ধ চলছে। মার্কিন প্রশাসন চীনের প্রভাবের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় এবং এশীয় মিত্রদের একত্র করেছে। চীনের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা চুক্তির পাশাপাশি সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে জোর দিয়েছে ওয়াশিংটন। গত অক্টোবরে তাইওয়ানের বিষয়ে কৌশলগত অস্পষ্ট মার্কিন নীতি থেকে বেরিয়ে এসে বাইডেন বলেন, তাইপের প্রতিরক্ষায় এগিয়ে আসবে ওয়াশিংটন। এর জবাবে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং সতর্ক করে বলেন, বাইডেন আগুন নিয়ে খেলছেন।

আফগানিস্তান থেকে বিশৃঙ্খল সেনা প্রত্যাহার করলেও এখনো দেশটিকে স্বীকৃতি দেয়নি ওয়াশিংটন। কিন্তু দেশটিতে কূটনৈতিক দূত হিসেবে কাজ করার জন্য কাতারকে কাজে লাগাচ্ছে ওয়াশিংটন। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের চোখে কাতার মানবাধিকারের ক্ষেত্রে পিছিয়ে গেছে। ২২ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানের জাতিসংঘ মারফত সাহায্য পাঠানোর অনুমতি দিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষেত্রে বাইডেন ও ট্রাম্প প্রশাসন যতটা ব্যাপকভাবে জোর দিয়েছিলেন, বাইডেন সেখান থেকে সরে এসেছেন। ওই অঞ্চল থেকে সামরিক সরঞ্জাম সরিয়ে এনেছেন তিনি। ৯ ডিসেম্বর ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে ইরাকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন মিশন সমাপ্ত ঘোষণা দেওয়া হয়। তবে সিরিয়ায় এখনো ৯০০ সেনা সরিয়ে নেওয়ার কোনো ঘোষণা আসেনি।

ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে কোনো শক্তিশালী পদক্ষেপ ওয়াশিংটন নেয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

ইরানের সঙ্গে করা পরমাণু চুক্তি থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন ট্রাম্প। ওই চুক্তিতে ফিরতে উদ্যোগ নিয়েছেন বাইডেন। এ চুক্তি দিয়ে ২৭ ডিসেম্বর থেকে অষ্টম দফা আলোচনা শুরু হবে। এর আগের আলোচনায় অর্জন সামান্য।

এর আগে রাশিয়ার সঙ্গে কৌশলগত স্থিতিশীলতা আনার যে লক্ষ্যের কথা বাইডেন বলেছিলেন, বাস্তবে তা হয়নি। ৭ ডিসেম্বর বাইডেন ও পুতিনের মধ্যে ভার্চ্যুয়াল আলোচনার সময় বাইডেন বলেন, মস্কো যদি ইউক্রেনে আক্রমণ চালায়, তবে গুরুতর পরিণতি ভোগ করতে হবে। ক্রেমলিন বলেছে, পুতিন মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে ন্যাটোর সম্প্রসারণ বন্ধ করার নিশ্চয়তা চেয়েছেন।