বাবা দিবসের উৎপত্তি ও প্রাসঙ্গিকতা

যিনি রিকশায় না চড়ে পায়ে হেঁটে অফিস গিয়ে সে অর্থে সন্তানের স্কুলে যাওয়ার রিকশা ভাড়া জোগান, তিনিই বাবা। যিনি পুরোনো কাপড়ে মসজিদে যান, আর সন্তানের জন্য ঈদের নতুন কাপড় কিনে আনেন, তিনিই বাবা। যিনি সন্তানকে উচ্চশিক্ষিত করতে কিংবা বিয়ের খরচ জমা করতে গিয়ে মমতাময়ী স্ত্রীকে নিয়ে দারুচিনি দ্বীপ দেখার যুগ পুরোনো স্বপ্নটাকে বারবার মাটি চাপা দেন, তিনিই বাবা। যিনি সন্তানকে অসুস্থতা থেকে সারিয়ে তুলতে গিয়ে নিজের ভিটে-মাটি বন্ধক রাখেন, তিনিই বাবা। যিনি বয়োপ্রাপ্ত সন্তানের পাশে বসে কার্ড খেলার গভীর আনন্দে বাচ্চাদের মতো লাফিয়ে ওঠেন, তিনিই বাবা। ভাঙা চশমায় বছর পার করে যিনি সন্তানের জন্য বাড়ি ফেরার পথে হাতে করে দামি লিচু কিনে আনেন, তিনিই বাবা। যিনি বছর পাঁচেক পুরোনো তলা ক্ষয়ে যাওয়া স্যান্ডেল পায়ে প্রত্যহ হাসিমুখে অফিস যান, তিনিই বাবা। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে ব্যক্তিগত শিক্ষক রাখার অক্ষমতায় যিনি বিশ্রাম ছেড়ে সন্তানকে পড়াতে বসেন, তিনিই আমাদের বাবা।

বাবারা হন ভিন্ন রকমের। তাঁরা মায়ের মতো মমতার বহিঃপ্রকাশ করতে জানেন না। তাঁরা ওপরে কঠোর, ভেতরে ঠিক শিশুর মতো। ভালোবাসেন অনেক, কিন্তু প্রকাশ করতে জানেন না। শুধু অগাধ স্নেহে নীরবে প্রমাণ করে যান, তিনিই বাবা; তিনিই আমাদের সবার যত্নে নিজের স্বাচ্ছন্দ্য বলি দেওয়া মানুষটি।

বাবাদের প্রতি ভালোবাসা, সম্মান, কৃতজ্ঞতা ও আবেগের বহিঃপ্রকাশে বিশ্বের প্রায় ৮৭টি দেশে জুনের তৃতীয় রোববারটি পালন করা হয় ‘ফাদার্স ডে’ বা ‘বাবা দিবস’ হিসাবে। কিন্তু এই দিনটির উৎপত্তি ঠিক কবে থেকে, কীভাবে বা এর নেপথ্যে কে রয়েছেন, সেই ইতিহাস আমাদের জানা দরকার।

মা দিবসের পরিপূরক হিসেবে বিশ শতকের গোড়ার দিকে যুক্তরাষ্ট্রে পিতৃত্ব উদ্‌যাপনে ফাদার্স ডে উদ্বোধন করা হয়েছিল। এর নেপথ্যে রয়েছে সোনোরা স্মার্ট ডোড নামের এক মহিলার গল্প। আরকানসাসে জন্মগ্রহণকারী সোনোরা ১৯১০ সালে ওয়াইএমসিএ-তে ওয়াশিংটনের স্পোকানে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ফাদার্স ডে। এই দিনটির প্রথম উদ্‌যাপন হয় ১৯১০ সালের জুন মাসের ১৯ তারিখে। সোনোরা খুব অল্প বয়সে মাকে হারান। তাঁর বিপত্নীক বাবা গৃহযুদ্ধের অভিজ্ঞ সৈনিক উইলিয়াম জ্যাকসন স্মার্ট, তাঁর ছয় সন্তানকে একাই বড় করেছেন।

১৯০৯ সালে সেন্ট্রাল মেথোডিস্ট এপিসকোপাল চার্চে আন্না জার্ভিসের ‘মা দিবস’ সম্পর্কে একটি ধর্মীয় ভাষণ শোনার পর সোনোরা উৎসাহিত হন এবং তাঁর যাজকের কাছে যান। যাজকদের কাছে তিনি আবেদন করেন, পিতাদের প্রতি সম্মান জানাতে একই রকম একটা ছুটি থাকা উচিত। যদিও সোনোরা ৫ জুন তাঁর বাবার জন্মদিনের দিনটিকে ফাদার্স ডে হিসেবে পালন করার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন, কিন্তু এ সম্পর্কিত ধর্মীয় ভাষণ প্রস্তুত করার পর্যাপ্ত সময় ছিল না বলে যাজকেরা উদ্‌যাপনটি জুনের তৃতীয় রোববারে পিছিয়ে দেন।

সোনোরা ও তাঁর সঙ্গীরা ফাদার্স ডে-র সরকারি স্বীকৃতির জন্য দশকের পর দশক প্রচার চালিয়ে গেছেন। ১৯২০-এর দশকে সোনোরা শিকাগোর আর্ট ইনস্টিটিউটে পড়াশোনা করার কারণে ফাদার্স ডে উদ্‌যাপনের এই প্রচারটি বন্ধ করে দিয়েছিলেন বলে স্পোকানে প্রাথমিকভাবে এর তেমন সাফল্য আসেনি। ১৯৩০-এর দশকে সোনোরা স্পোকানে ফিরে আসেন এবং জাতীয় পর্যায়ে সচেতনতা বাড়াতে আবারও প্রচার শুরু করেন।

১৯৩৪ সালে নিউইয়র্ক অ্যাসোসিয়েটেড মেনস অ্যাওয়্যার রিটেইলারদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ফাদার্স ডে কাউন্সিলের সহায়তা পান সোনোরা। ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে ফাদার্স কাউন্সিলে লেখা হয়, ‘ফাদার্স ডে সব পুরুষের জন্য উপহার-ভিত্তিক দ্বিতীয় ক্রিসমাসে পরিণত হয়েছে।’

১৯১৩ সালে কংগ্রেসে ফাদার্স ডেকে জাতীয় স্বীকৃতি দেওয়ার একটি বিল প্রবর্তিত হয়। ১৯১৬ সালে রাষ্ট্রপতি উড্রো উইলসন ফাদার্স ডে উদ্‌যাপনে স্পোকানে গিয়ে একে অফিশিয়াল করতে চেয়েও ব্যর্থ হন। ১৯২৪ সালে তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রপতি ক্যালভিন কুলিজ জাতীয় পর্যায়ে ফাদার্স ডে পালনের পরামর্শ দেন। ১৯৫৭ সালে মেইন অঙ্গরাজ্যের সিনেটর মার্গারেট চেজ স্মিথ তাঁর লিখিত প্রস্তাবে, কংগ্রেসের প্রতি মায়েদের সম্মান করতে গিয়ে ৪০ বছর ধরে বাবাদের অবজ্ঞা করার অভিযোগ আনেন। ১৯৬৬ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট লিন্ডন ডি জনসন জুনের তৃতীয় রোববারকে ফাদার্স ডের ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করেন। এরও ছয় বছর পরে ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতি রিচার্ড নিক্সনের আইনি স্বাক্ষরে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে পিতৃদিবস উদ্‌যাপন শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্র।