মানসিক সুস্থতার জন্য আনন্দে থাকুন

আমি তিন সপ্তাহ ধরে (টার্মিনাল বি–এর ওপরের লেভেল) ফুড কোর্টে একজনকে লক্ষ্য করছি। বয়সে ৫০-৬০ বছরের কাছাকাছি। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলে একেবারে পর্যবেক্ষণ। প্রথম দিন দেখলাম গলায় লাগার্ডিয়া এয়ারপোর্ট টিমের ফিতা ঝোলানো। গায়ে কালো পোশাক। একটু নোংরা। তবে বেশি নোংরা লাগছিল তাঁর জাবর কাটা। ঠোঁট ফোলা মত। কেমন যেন একটা প্রদাহ আশপাশে। কালো ইউনিফর্ম সাধারণত পরিচ্ছন্ন-কর্মীদের একটা দল আছে। ধরে নিয়েছি সে দলের। তাকে সামনে দিয়ে ঘোরাফেরা করতে দেখে আমি একটু তফাতে এক টেবিলে বসলাম। তবে এটা খুব স্বাভাবিক। মানে নোংরা ময়লা। যারা বিভিন্ন টেকনিক্যাল কাজ করেন তাদের তো কাপড় নোংরা থাকে। নাকে মুখে কালি নিয়ে অনেক ইঞ্জিনিয়ারও খেতে আসেন। সেদিনের মত আমি আমার খাবার সেরে ভেতরে চলে গেলাম।
পর দিন সেই লোককে দেখলাম, একটা টেবিল টিস্যু পেপার দিয়ে সুন্দর করে মুছছেন। লক্ষ্য করলাম, তার গলায় একটি না, তিনটি ফিতা ঝোলানো। তবে কোনো কার্ড নেই। এত একেবারে মাল্টি টাস্কবার! পরিচ্ছন্নকর্মী জেনিফার বয়স্ক। উনি টেবিল মুছে আমাকে দিলেন। তাঁকে আমি মাঝেমধ্যে খাবার দিই। তাই একটু খাতির আছে। সে যেহেতু কাজে আছে, এই আমার খটকা লাগল। আমি তাকে রীতিমতো ফলো করলাম। সে যে টেবিলে লোক নেই, সে টেবিলই মুছে। দাগ না উঠলে ঘষতে থাকে। যাদের দায়িত্ব তারাও এত সুন্দর করে মুছে না। আমি তখন ইয়াদিরাকে ডেকে বললাম, দেখো লোকটা মানসিক রোগী, কিন্তু সে কাজ করছে খুব মন দিয়ে। ইয়াদিরা বলল, হ্যাঁ লক্ষ্য করেছি। এটা নূতন কোনো ঘটনা নয়। মাঝেমধ্যে দেখা যায়, বাক্সপেট্টা নিয়ে কেউ একজন ঢুকেছে। জীবনের যত সম্পত্তি সব জমিয়ে সঙ্গে রাখা। কীভাবে যে যাত্রী ট্রলি জোগাড় করে। সেটায় থাকে ভাসমান সংসারের সব টুকিটাকি। মানসিক ভারসাম্য না থাকলেও নিজের এ সম্পদ আঁকড়ে ধরে রাখার দায়িত্ব তাঁরা যত্নের সঙ্গে করে। আপনি যদি এসব ফেলে তাঁকে নতুন জীবনে নতুন কাপড়ে মুড়তে চান সে কান্না জুড়ে দেবে।
প্রায় সময় এ রকম কাউকে না কাউকে ফুড কোর্টে দেখি। ‘The American are kind’-কথাটা খুব সত্য। এখানে আমি আজ পর্যন্ত কাউকে দেখিনি, তাঁদের কেউ কিছু বলতে। কর্তব্যরত পুলিশ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে পোর্ট অথোরিটি সিকিউরিটি কেউই তাঁদের কখনো বলে না, এখানে আসবে না বা বের হয়ে যাও। রাস্তা ঘাট, ট্রেনে এ রকম মাথা নষ্ট গৃহহীনদের খুব দেখা যায়। বিভিন্ন সাবওয়েতে বেঞ্চে অনেকের সংসার। এরা কেউ তেমন চিৎকার, চেঁচামেচি কিছুই করে না। যেন জীবনের অসীম কোনো চিন্তায় মগ্ন। হিসাব না মেলা ভারে ভারাক্রান্ত। স্থবির, চুপচাপ বসে। কেউ হয়তো একা একা কথা বলে চলেছে। আমি প্রায় সময়ই ভাবি, একজন মানুষ কেন পাগল হয়ে যায়? তাঁরও নিশ্চয় অনেক কিছু ছিল। গভীরভাবে ভালোবাসার কোনো মানুষ ছিল। কেউ না থাকুক, একটা মা ছিল বা এখনো আছে।
তাঁদের সাবওয়ে পুলিশরাও কখনো কিছু বলে না। পুলিশ অফিসার রাজুব ভৌমিককে তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তাঁদের ওপর কোনো নির্দেশ আছে কিনা? এমন প্রশ্নের উত্তরে বললেন, না।
আমরা আমাদের দেশে পথে–ঘাটে না হোক, কোনো একটা ভালো এলাকায় কেউ ঢুকে পড়লে, তাকে কুকুরের মত তাড়া করতেও দেখি। পাড়ার ছেলেমেয়েরা চিৎকার চেঁচামেচি করে এদের পেছনে ছুটে।
লক্ষ্যে করলাম, তাঁর সঙ্গে একটা বড় লেদারের বাক্স, আরও আগড়–বাগড়। এগুলো একটা ডেস্কের পাশে রাখা। তিনি এখানে পুরো দমে সংসার গেড়ে বসেছেন। আমি একদিন কথা বলতে চাইলে সে স্পষ্ট উচ্চারণে কিছু বলতে পারেনি। এক ডলার দিয়ে চলে এলাম। কখনো কারও কাছে কিছু চাইতে দেখিনি। বুঝলাম, হয়তো মানসিক প্রতিবন্ধকতাও আছে। কিন্তু সে সারাক্ষণ টেবিল মোছার, চেয়ারগুলো ঠিক লাইনে রাখার দায়িত্ব পালন করেই যাচ্ছে। এত সুন্দর করে কর্মীরাও কাজ করে না। সে হয়তো থাকার বিনিময়ে এ কাজটুকু মনেপ্রাণে করে যাচ্ছে। তাঁর নৈতিক দায়িত্ব যেন পালন করছে। তাঁর এহেন আচরণে মনে হলো, লোকটা প্রচণ্ড রকমের নীতিমান ছিল। জীবন হয়তো তাকে চপেটাঘাত করছে। যে কারণে নিজেকে ঠিক রাখতে পারেনি। তাঁর একটা ব্যাগপ্যাক আছে, সেটি নিয়ে মাঝে মাঝে আশপাশে হেঁটে আসেন। খুব অদ্ভুতভাবে লক্ষ্যে করলাম, সে ল্যাপটপে কিছু একটা করছে। তাঁর পাশে জমানো অনেকগুলো হাতে লেখা চিঠির মত কাগজ।
পৃথিবীর আর কোনো শহরে মানসিকভাবে অসুস্থ লোকের সংখ্যা এত বেশি আছে কি না, আমার জানা নেই। এই শহরে ঘর থেকে বের হয়ে এ রকম কাউকে দেখেননি, তা বলতে পারবেন না। সবাই জানে, এই শহরে সম্ভাবনা খুব বেশি। সম্ভবত এই শহরে পাগল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও বেশি। পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয়ের ৮ শতাংশ শিক্ষার্থী আত্মহত্যার চেষ্টা করছে বলে প্রতিবেদন করেছে। এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নিউইয়র্ক সিটির পাবলিক হাই স্কুলের শিক্ষার্থীরা বেশ হতাশায় ভোগ বা আশাহত বোধ করে। প্রাপ্তবয়স্ক নিউইয়র্কারদের প্রায় ৮ শতাংশ প্রতি বছর হতাশার লক্ষণগুলো অনুভব করে। প্রাপ্তবয়স্কদের পাঁচজনের মধ্যে কমপক্ষে একজন নিউইয়র্কার প্রতি বছরে মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়।
আমার এক বান্ধবী সে দিন বলছিল, সিলেটে আগে এত পাগল দেখা যায়নি। এখন প্রায়ই দেখা যায়। কেন একজন মানুষ পাগল হয়? কেউ কী কখনো ভেবেছেন?
জীবনের ঘাত–প্রতিঘাতে একজন সুস্থ মানুষ নিজেকে নিয়ন্ত্রণের চাবিটা হারিয়ে ফেলে। কেন ফেলে? ইচ্ছে করে নিশ্চয় নয়। কারও আঘাতে সে ইচ্ছার অনুকূলে কাজ করে। সাধগুরু বলেন, ‘আমাদের বুদ্ধি যখন আমাদের মনের বিরুদ্ধে কাজ করে, তখন আমরা নিজেরাই নিজের শত্রু হয়ে উঠি। কারা পাগল হয়? খুব সাধারণভাবে কেউ রেগে গেলে আমরা বলি হি অর শি মেড! যেমন রাগ করে একজন মানুষ স্বাভাবিক অবস্থা ‘ক’ থেকে অস্বাভাবিক অবস্থা ‘ঙ’–তে যায়। আবার স্বাভাবিক অবস্থা ‘ক’ তে ফিরে আসে। কিন্তু একটা সময় সে ‘ক’ থেকে ‘ঙ’–তে যাওয়ার পর আর ফিরে আসতে পারে না স্বাভাবিক অবস্থায়। তখনই তার আচরণে তৈরি হয় পাগলামির বৈশিষ্ট্য।
ঠিক তেমনি দুঃখের লেভেল কাজ করে। লেভেল ক্রস করলাম তারপর আর ফিরে আসতে পারলাম না। অনেকে অতি আপনজনের ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করে আমি দুঃখী! দুঃখী! তারপর আর দুঃখ কাটিয়ে ফিরে আসতে পারে না। জীবনের কোনো অঘটন যখন ঘটে দেখা যায়, সারাক্ষণ তাই নিয়ে দুঃখ অনুভব করতে থাকে, যা মানসিক বিপদ ডেকে আনে। মনে রাখতে হবে, আপনি দুঃখী হলে এতে কারও কিছু যায় আসে না তবে আপনার অনেক কিছু যায়। জীবনটা পর্যন্ত চলে যায়। কিন্তু আপনার আনন্দ অবশ্যই মূল্যবান। এটি ধরে রাখুন। এটি অন্যকে দিতে পারলেও মূল্যবান। ছোট বেলা আমরা মা-বাবার অতি শাসন–শোষণের মধ্যে থেকেও কিন্তু নির্মল আনন্দে দিন যাপন করতাম। আনন্দ আর আনন্দ, কিন্তু বড় হয়ে যাওয়ার পর আমরা আর সে আনন্দ উপভোগ করি না। কেন? কারণ আমরা তখন শিখে ফেলি, অন্যকে দোষারোপ করা। ছোট বেলা নিঃশর্ত আনন্দ ভোগ করতে পারলে তো বড় হয়েও পারার কথা। অন্যের আঘাতের পরও নিজেকে আনন্দে রাখা প্রয়োজন। আনন্দে থাকুন, মানসিক ভারসাম্যহীন না হোন।