সত্য খুঁজি, মিথ্যা বেচি, মিথ্যাই পুঁজি

বিজ্ঞাপন
default-image

আমরা সবাই সত্য খোঁজার চেষ্টা করি। অন্তত মুখে তা–ই বলি। সন্তানদের উপদেশ দিই মিথ্যা না বলতে। কিন্তু সত্য কোনটা? মিথ্যাই বা কোনটা? সত্যরূপী মিথ্যা কি আমরা চিহ্নিত করতে পারি? বৈশ্বিক প্রবণতা ও নানা বিজ্ঞানসম্মত গবেষণা কিন্তু বলছে, আমাদের সত্য-মিথ্যা মাপার থার্মোমিটারে গলদ আছে। আমরা প্রকাশ্যে খুঁজি সত্য, গোপনে বেচি মিথ্যা। তাই হারিয়ে যাই সেই মিথ্যার রাজত্বেই।

আবেগ ও যুক্তি—এই দুটি বিষয় কখনো সমান্তরালে চলে না। যুক্তির আদালতে কখনো আবেগ টিকে থাকতে পারে না। কিন্তু মানুষ প্রকৃতিগতভাবে বেশ আবেগপ্রবণ প্রাণী। ফলে তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াও আবেগ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। ২০০১ সালে সাইকোলজিক্যাল রিভিউয়ে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির মনোরোগ বিশেষজ্ঞ জোনাথন হাইড সেখানে বলেছিলেন, মানুষ যখন নৈতিক কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, তখন আবেগ দ্বারা বেশি প্রভাবিত হয়। হয়তো সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর একজন ব্যক্তি তার পেছনে অসংখ্য যুক্তি দেখাতে পারে। কিন্তু আদতে ওই সব যুক্তির ভিত্তিতে সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয় না। সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয় চোখের পলকে, আর তাতে মূল ভূমিকা রাখে ব্যক্তিগত আবেগ বা চেতনা।

জোনাথন হাইডের এই গবেষণা এখন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। কারণ বর্তমানে এমন এক দুনিয়া সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে রাজনীতিবিদেরা মিথ্যায় পটু হয়ে উঠেছেন। মিথ্যা বলার সেই চিত্র বুঝতে হলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের মতো নেতাদের দেখতে হবে। একনায়ক শাসকেরা সব সময়ই মিথ্যা বলে এসেছেন। উত্তর কোরিয়ার কিম জং–উন বা রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিনের ‘সত্যরূপী মিথ্যা’ তাই আর বিস্ময় জাগায় না। কিন্তু গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর নেতাদের অবলীলায় একের পর এক মিথ্যা বলা এবং তা সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রাণান্ত চেষ্টা চোখ কপালে তোলে বৈকি। এই বৈশ্বিক প্রবণতাই পরে সংক্রমিত হয় আঞ্চলিক রাজনীতিতে এবং একসময় তা ঢুকে পড়ে নিজেদের ব্যক্তিগত জীবনেও।

default-image

জর্জ বার্নার্ড শ বলেছিলেন, ‘মিথ্যাবাদীর শাস্তি মোটেই এটা নয় যে তাঁকে কেউ বিশ্বাস করে না, বরং এটা যে সে অন্য কাউকেই বিশ্বাস করতে পারে না।’ কিন্তু আজকের পৃথিবীতে জর্জ বার্নার্ড শর এই আপ্তবাক্য মিথ্যায় পরিণত হচ্ছে। মিথ্যাবাদী আদৌ শাস্তি পায় কি না, তা নিয়েই সন্দেহ উঠে যাচ্ছে। কারণ ট্রাম্প-জনসন-মোদিরা তো বহাল তবিয়তেই আছেন। নিজেদের নীতির খারাপ প্রভাব তাঁরা চেপে যাচ্ছেন, সত্যকে দুমড়ে-মুচড়ে সেই জায়গায় মিথ্যাকে বসিয়ে দিচ্ছেন। ভোটাররা সেসব জানতেও পারছেন। কিন্তু তাতে ওই সব নেতার কোনো সমস্যা হচ্ছে না। কারণ ব্যালট বাক্সে টান পড়ছে না। উল্টো জনসমর্থনের জোয়ারে ভেসে যাচ্ছে সত্যভাষণ।

default-image

ট্রাম্প-জনসন-মোদিদের মিথ্যার রূপ একটু দেখে নেওয়া যাক। ব্রিটিশ সাময়িকী ‘দ্য ইকোনমিস্ট’–এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন সংবাদমাধ্যমে চাকরি করতে গিয়ে বরখাস্ত হয়েছিলেন। তাঁর অপরাধ ছিল, একটি উক্তি নিজে বানিয়ে দিয়েছিলেন তিনি! আদতে ওই উক্তি কেউ করেনি। গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দাবি করে আসছেন, পাকিস্তানের একটি এফ-১৬ যুদ্ধবিমান নাকি ভারতীয় বিমানবাহিনী ভূপাতিত করেছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের তদন্তে দেখা গেছে, পাকিস্তানের সব এফ-১৬ যুদ্ধবিমান অক্ষতই আছে। অবশ্য মোদি ওই দাবি থেকে সরে আসেননি। বরং গেল লোকসভা নির্বাচনে এই ‘বীরত্বের খবর’ বেশ ভালো ভোট টেনেছে। ওদিকে ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’–এর হিসাব বলছে, মার্কিন মুলুকে মিথ্যার নহর বইয়ে দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। হোয়াইট হাউসে আসার পর থেকে গত ৯ অক্টোবর পর্যন্ত মোট ১৩ হাজার ৪৩৫টি মিথ্যা বিবৃতি দিয়েছেন ট্রাম্প। এত মিথ্যার তোড়েই হয়তো সম্প্রতি রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনের প্রচার বন্ধ করে দিয়েছে টুইটার কর্তৃপক্ষ। ফেসবুক অবশ্য এখনো সেই রাস্তায় হাঁটেনি। মিথ্যার প্রচারেও যে কড়ি আসে!

এত এত মিথ্যা বলেও মিথ্যুকদের কিছু আসছে–যাচ্ছে না। জরিপকারী প্রতিষ্ঠান ইউগভ বলছে, আগামী ডিসেম্বরে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে বরিস জনসনের দল কনজারভেটিভ পার্টি জনসমর্থনে বিরোধীদের তুলনায় এগিয়ে আছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সমর্থনে আছেন ৪৩ শতাংশ মার্কিন। হোয়াইট হাউসে ঢোকার সময়কার জনসমর্থন থেকে কমেছে মোটে ১ শতাংশ।

default-image

কিন্তু এত মিথ্যার কোনো বাজে প্রভাব কেন পড়ছে না? বিশ্লেষকদের মতে, একটি কারণ হতে পারে যে এত মিথ্যার তোড়ে সবার বুদ্ধি-বিবেচনা ভেসে গেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে উচ্চমাত্রায় মিথ্যা বলেন, তা অনেকে হয়তো ভাবতেই পারেননি। স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে অত্যধিক হারে মিথ্যা বলার কারণে অনেকে হয়তো ভাবতেই পারছেন না, কেউ কি এত মিথ্যা বলতে পারে?

ব্রিগহাম ইয়ং ইউনিভার্সিটির দুই গবেষক মাইকেল বারবার ও জেরেমি পোপ সম্প্রতি কিছু গবেষণা চালিয়েছেন। তাতে দেখা গেছে, ভোটাররা এখন আর দলীয় মতাদর্শ দেখে ভোট দিচ্ছেন না। বরং বেশির ভাগ ভোটারই একজন নেতার ব্যক্তিত্বকে সমর্থন করেই ব্যালটে সিল মারছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কেউ আর রিপাবলিকান হিসেবে ভোট দিচ্ছেন না। ট্রাম্পকে ভোট দিচ্ছেন তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রতি সমর্থন জানিয়ে। ফলে দলীয় মতাদর্শ ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠছে ব্যক্তির প্রতি আনুগত্য।

আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও কিন্তু মিথ্যার প্রভাব অনেক। বিশ্লেষকেরা বলছেন, সিংহভাগ মানুষ আসলে মিথ্যা ধরতেই পারে না। বার্মিংহামের ইউনিভার্সিটি অব আলাবামার গবেষক টিম লেভিন এই বিষয়ে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে গবেষণা করেছেন। মোট ৩০০টি পরীক্ষা চালিয়ে তিনি দেখেছেন, প্রায় অর্ধেক সময়ই মানুষ মিথ্যা ধরতেই পারেনি। খুব অল্পসংখ্যক মানুষ মিথ্যা চিহ্নিত করতে পারে। এমনকি পুলিশ বা গোয়েন্দা কর্মকর্তারাও আমজনতার চেয়ে ভিন্ন কিছু নয়। মিথ্যা ধরতে তারাও খুব একটা পটু নন।

default-image

এ ক্ষেত্রে প্রাণী হিসেবে মানুষের বিবর্তনেরও ভূমিকা আছে। কথায় আছে, ‘বিশ্বাসে মিলায় কৃষ্ণ, তর্কে বহুদূর।’ বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাণী হিসেবে মানুষ বরাবরই অন্যকে বিশ্বাস করতে চায়। মানুষে মানুষে যত যোগাযোগ হয়, তার বেশির ভাগই সত্যের ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত। ফলে অন্যের সততা নিয়ে পূর্বানুমান ও বদ্ধমূল ধারণা থাকাটাই স্বাভাবিক। মানুষে মানুষে যোগাযোগব্যবস্থা কার্যকর রাখতেই এমন ধারণা প্রয়োজন। যদি পারস্পরিক আস্থাই শেষ হয়ে যায়, তবে আর মানুষে মানুষে যোগাযোগ টিকে থাকবে কী করে? টিম লেভিন বলছেন, ঠিক এই কারণেই মানুষ প্রতারিতও হয়। আবার অনেক সময় ঊর্ধ্বতনের নির্দেশ মানতে গিয়ে মানুষ সত্যাসত্য যাচাইয়ের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। ওই সময় সে হয়তো সত্য-মিথ্যা বুঝতে পারে, কিন্তু নির্দেশ মানার বাধ্যবাধকতায় আর প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে না।

আর এভাবেই ফেক নিউজ ও গুজব ছড়িয়ে পড়ে বাতাসের বেগে। মানুষ তার সহজাত সরলতার কারণেই এসব মিথ্যায় আস্থা রাখে। গত বছর বিজ্ঞানবিষয়ক জার্নাল ‘সায়েন্স’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, সত্যের চেয়ে ফেক নিউজ ও গুজব দ্রুত ছড়ায় এবং সাধারণের ওপর এর প্রভাবও সত্যের চেয়ে বেশি হয়।

অবশ্য রাজনীতিতে মিথ্যার প্রভাব এতটুকুই নয়। মিথ্যা বলা রাজনীতিকদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল। যুক্তরাষ্ট্রে যত মানুষ ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বিশ্বাস করেন, তার চেয়ে বেশি মানুষ তাঁকে ভোট দেন। অর্থাৎ বিশ্বাস না করলেও অনেক ভোটারই ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেখতে চান। এই বিষয়টাই গোলমেলে।

এই বিষয়টির ব্যাখ্যার জন্য লেখার শুরুতে যেতে হবে। মানুষ আবেগের বশে সিদ্ধান্ত নেয়, সেখানে যুক্তির পরশ আসে অনেক পরে। ২০০৪ সালে এমোরি ইউনিভার্সিটির গবেষক ড্রিউ ওয়েস্টিন যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান সমর্থকদের নিয়ে একটি এমআরআই টেস্ট চালিয়েছিলেন। তাতে দেখা গিয়েছিল, বিপক্ষের মিথ্যাচার শুনলে একজন ব্যক্তির মস্তিষ্কের পুরস্কার পাওয়ার ভাবনাসংক্রান্ত অংশ উদ্দীপিত হয়। আর নিজ পক্ষের মিথ্যাচার শুনলে মস্তিষ্কের নেতিবাচক অংশ উদ্দীপিত হয়। কিন্তু কোনো ক্ষেত্রেই মস্তিষ্কের যুক্তিপ্রবণ অংশ উদ্দীপিত হয় না। অর্থাৎ মিথ্যাচারের কোনো কিছুতেই মানুষ যুক্তির ধারই ধারে না।

default-image

ইয়েল ল’ স্কুলের গবেষক ড্যান কাহান বলছেন, মানুষ সেভাবেই তথ্য প্রক্রিয়াজাত করে, যেভাবে সে চায়। অর্থাৎ, একজন ব্যক্তি নিজের যে ভাবমূর্তি নিজের ও অন্যদের কাছে গড়ে তোলে, সেটিকে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় ভাবনাই সে ভাবে। এর গণ্ডির বাইরে গিয়ে মানুষ কিছু ভাবতে চায় না। আর এভাবেই একটি অন্ধ পক্ষপাত তৈরি হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যখন এমন একটি পক্ষপাত মানুষের মধ্যে তৈরি হয়, তখন সে এর বিপরীত কিছু আর বিশ্বাস করতে চায় না। বরং তার পক্ষের খবরগুলোতেই আস্থা রাখতে চায়। এভাবেই বাতাসের চেয়ে দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ে ফেক নিউজ ও গুজব। এ ক্ষেত্রে যুক্তি নিয়ে ভাবে না মানুষ। এর চেয়ে নিজের পূর্বানুমান ও ধারণা নিয়েই মেতে থাকে।

অনেকে হয়তো ভাবতে পারেন, এগুলো বোকা মানুষের কাজ। বুদ্ধিমানেরা নিশ্চয়ই এসব করেন না। মজার বিষয় হলো, বুদ্ধিমানেরা আরও ভয়ানক। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বুদ্ধিমানেরাও যুক্তি ও তথ্যপ্রমাণে আস্থা রাখে না এবং নিজের মত প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সাধারণের তুলনায় তাঁরা আরও বেশি কট্টর।

অনেক আলোচনা হলো। এখন বরং মস্তিষ্ককে একটু অবসর দেওয়া যাক। তাতে যদি যুক্তির পালে কিছুটা হাওয়া মেলে, তবে ক্ষতি কী!

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন