আসন্ন নির্বাচনে জাপানে তাকাইচি ও হাঙ্গেরিতে কট্টর ডানপন্থী অরবানকে ট্রাম্পের সমর্থন

জাপান সফরের সময় ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটনে মার্কিন সেনাদের উদ্দেশে বক্তৃতার সময় মঞ্চে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি। ২৮ অক্টোবর ২০২৫, ইউকোসুকাছবি: রয়টার্স

জাপানের আগাম সাধারণ নির্বাচনের আগে দেশটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুধু জাপান নয়, হাঙ্গেরির সংসদীয় নির্বাচনে কট্টর ডানপন্থী নেতা ভিক্টর অরবানের প্রতিও সমর্থন ব্যক্ত করেছেন তিনি।

গতকাল বৃহস্পতিবার নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প লিখেছেন, তাকাইচি ইতিমধ্যে নিজেকে একজন ‘শক্তিশালী, ক্ষমতাধর এবং বুদ্ধিমান নেতা হিসেবে প্রমাণ করেছেন... যিনি সত্যিকার অর্থেই নিজের দেশকে ভালোবাসেন।’

ট্রাম্প আরও যোগ করেন, ‘তিনি (তাকাইচি) জাপানের জনগণকে হতাশ করবেন না।’

সাধারণত মার্কিন প্রেসিডেন্টরা অন্য দেশের নির্বাচনে কোনো প্রার্থীর পক্ষে প্রকাশ্যে কথা বলেন না। তবে ট্রাম্প এর আগেও এমনটা করেছেন। সম্প্রতি তিনি আর্জেন্টিনার হাভিয়ের মিলেই এবং হন্ডুরাসের নির্বাচনে নাসরি আসফুরাকে সমর্থন জানিয়েছিলেন। তাঁর প্রকাশ্য সমর্থন আসফুরার জয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হয়।

ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের পরিপ্রেক্ষিতে টোকিও যখন ওয়াশিংটনের সঙ্গে আরও স্থিতিশীল সম্পর্ক খুঁজছে, তখন তাকাইচি মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর চেষ্টা করেছেন। ট্রাম্প শুরুতে ২৫ শতাংশ শুল্কের হুমকি দিলেও গত জুলাইয়ে জাপান যুক্তরাষ্ট্রে ৫৫ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগের একটি চুক্তি করে। বিনিময়ে ওয়াশিংটন আমদানি শুল্ক কমিয়ে ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনে।

৬৪ বছর বয়সী তাকাইচি গত অক্টোবরে নিজের দলের নেতৃত্ব এবং পার্লামেন্টে প্রয়োজনীয় সমর্থন পেয়ে প্রধানমন্ত্রী হন। তবে জনগণের সরাসরি সমর্থন পেতে গত মাসে তিনি আগাম নির্বাচনের ডাক দেন।

দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র এক সপ্তাহ পরই তাকাইচি ট্রাম্পের জন্য রাজকীয় অভ্যর্থনার আয়োজন করেছিলেন। টোকিওর আকাসাকা প্রাসাদে ট্রাম্পকে সামরিক ‘গার্ড অব অনার’ দিয়ে স্বাগত জানানো হয়।

এটি ছিল তাকাইচির কূটনৈতিক অভিযাত্রা, যেখানে দৃশ্যপট ছিল বেশ আকর্ষণীয়। বিমানবাহী রণতরি ‘ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন’-এর ওপর দাঁড়িয়ে হাজার হাজার মার্কিন সেনার সামনে ট্রাম্প যখন তাঁর প্রশংসা করছিলেন, তখন তাকাইচিকে হাত নেড়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে দেখা যায়। এই দৃশ্য বিশ্বজুড়ে প্রচারিত হয়েছিল।

তাকাইচি নিজেকে এমন একজন নেতা হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছেন, যাঁর সঙ্গে ট্রাম্প স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যবসা করতে পারেন। ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্কও চমৎকার।

প্রতিরক্ষা ইস্যুতেও এই দুই নেতার মতাদর্শ এক। ট্রাম্প চান জাপান নিজের নিরাপত্তার জন্য আরও বেশি খরচ করুক, আর তাকাইচিও জাপানের প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ার পক্ষে।

জাপান সফরের সময় একে অপরের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং বিরল খনিজ নিয়ে একটি চুক্তি সই করেন। তাঁরা যুক্তরাষ্ট্র-জাপান সম্পর্কের একটি নতুন ‘স্বর্ণযুগ’ শুরুর ঘোষণাও দেন। তাকাইচি ট্রাম্পকে এই নতুন স্বর্ণযুগের অংশীদার বলে উল্লেখ করেন।

ট্রাম্প তাঁর পোস্টে লিখেছেন, ‘জাপান সফরে আমি এবং আমার প্রতিনিধিরা তাঁর (তাকাইচি) আতিথেয়তায় অত্যন্ত মুগ্ধ হয়েছিলাম।’ তিনি আরও লেখেন, আগামী ১৯ মার্চ তিনি তাকাইচিকে হোয়াইট হাউসে স্বাগত জানাবেন।

বার্তাটি কার জন্য

ট্রাম্পের এই সমর্থন কেবল জাপানি ভোটারদের জন্যই নয়; বরং এই অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য এবং বিশেষ করে চীনের জন্য বিশেষ এক বার্তা। বর্তমানে বেইজিং ও টোকিওর মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েন চলছে, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে।

গত নভেম্বরে তাকাইচি বলেছিলেন, চীন তাইওয়ানে হামলা করলে জাপান নিজের প্রতিরক্ষা বাহিনী দিয়ে সেটার জবাব দিতে পারে। এই মন্তব্যের পর চীন তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখালেও তাকাইচি তাঁর অবস্থান থেকে সরে আসেননি।

জরিপ অনুযায়ী, নির্বাচনে তাকাইচি বড় ব্যবধানে জয়ী হতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে জয়ী হওয়ার পর তাঁকে স্থবির অর্থনীতি সামলানো এবং যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখার মতো কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে।

হাঙ্গেরিতে প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবানকে সমর্থন

আল-জাজিরার খবরে বলা হয়, হাঙ্গেরির আগামী এপ্রিলে অনুষ্ঠেয় সংসদ নির্বাচনের আগে দেশটির কট্টর ডানপন্থী নেতা ভিক্টর অরবানের প্রতি নিজের সমর্থন ব্যক্ত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অভিবাসনবিরোধী কঠোর অবস্থান এবং জাতীয়তাবাদী নীতির জন্য ট্রাম্প হাঙ্গেরির এই নেতার প্রশংসা করেন।

গতকাল ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প অরবানকে একজন ‘শক্তিশালী ও ক্ষমতাধর নেতা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে হাঙ্গেরির কট্টর ডানপন্থী প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান। ৭ নভেম্বর ২০২৫, ওয়াশিংটন ডিসি
ছবি: রয়টার্স

ট্রাম্প লিখেছেন, ‘তিনি (অরবান) তাঁর মহান দেশ এবং মানুষের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন। তিনি তাঁদের ভালোবাসেন, ঠিক যেমনটা আমি করি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য।’

নিজের সঙ্গে অরবানের মিল খুঁজে পেয়ে ট্রাম্প ব্যাখ্যা করেন, তাঁরা দুজনেই ‘অবৈধ অভিবাসন বন্ধ’এবং ‘আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করার’ প্রচেষ্টায় বিশ্বাসী।

ট্রাম্পের মতে, তাঁর প্রশাসনের অধীন হাঙ্গেরি ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক পারস্পরিক সহযোগিতা ও সাফল্যের এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। এর কৃতিত্ব অনেকটা প্রধানমন্ত্রী অরবানের।

ট্রাম্প মনে করিয়ে দেন, তিনি ২০২২ সালের নির্বাচনেও অরবানকে সমর্থন দিয়েছিলেন। এবারও তা করতে পেরে তিনি সম্মানিত বোধ করছেন।

কেন এই সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ

ভিক্টর অরবান হাঙ্গেরির ইতিহাসে দীর্ঘতম সময়ে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন (১৯৯৮-২০০২ এবং ২০১০ থেকে বর্তমান)। তবে আগামী ১২ এপ্রিলের নির্বাচনে তাঁর দল ‘ফিদেজ’ বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দেখা গেছে, মধ্য-ডানপন্থী ‘তিসা’ পার্টি অরবানের দলের চেয়ে ৭ পয়েন্টে এগিয়ে আছে।

মানবাধিকার সংস্থাগুলো অরবানের সরকারের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের অবনমন এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের দমনের অভিযোগ তুলে প্রায়ই সমালোচনা করে থাকে। তবে ট্রাম্প বরাবরই অরবানের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং তাঁর নীতিকে সমর্থন করেছেন।