নারীবাদী অধিকারকর্মী ও সাংবাদিক গ্লোরিয়া স্টেইনেম মারা গেছেন
যুক্তরাষ্ট্রে নারীমুক্তি আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ গ্লোরিয়া স্টেইনেম ৯২ বছর বয়সে মারা গেছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ফাউন্ডেশন সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
ইনস্টাগ্রামে দেওয়া এক পোস্টে ফাউন্ডেশনটি জানিয়েছে, নিউইয়র্ক শহরে নিজ বাড়িতে ‘শান্তিতে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন’ গ্লোরিয়া স্টেইনেম। এ সময় ‘তাঁকে ভালোবাসেন, এমন অনেকেই তাঁর পাশে ছিলেন’।
গ্লোরিয়া স্টেইনেম ছিলেন লেখক ও সাময়িকীর সম্পাদক। লিঙ্গবৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে ৫০ বছরের বেশি সময় আগে তিনি ‘উইমেনস অ্যাকশন অ্যালায়েন্স’ নামের একটি সংগঠন সহপ্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
১৯৭০-এর দশকে নিউইয়র্কে সাংবাদিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন গ্লোরিয়া স্টেইনেম। এরপর তিনি ‘মিস’ নামের একটি সাময়িকী সহপ্রতিষ্ঠা করেন। ঘরকন্না ও রূপচর্চার বাইরে নারীদের অন্যান্য বিষয় নিয়ে কাজ করা প্রথম দিককার প্রকাশনাগুলোর মধ্যে এটি ছিল অন্যতম।
সত্তরের দশকে নারীদের প্রজনন অধিকার নিয়ে যে আন্দোলন হয়েছিল, সেখানেও স্টেইনেম ছিলেন অন্যতম প্রধান কণ্ঠস্বর। পাশাপাশি তিনি আরও অনেক অধিকার নিয়ে কাজ করেছেন।
২২ বছর বয়সে গ্লোরিয়া স্টেইনেম নিজেও লন্ডনে অবৈধভাবে গর্ভপাত করিয়েছিলেন। বছরখানেক পর ১৯৭৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ‘রো বনাম ওয়েড’ মামলায় নারীদের গর্ভপাতের সাংবিধানিক অধিকার দেন। তখন এ রায় উদ্যাপন করেছিলেন গ্লোরিয়া। প্রায় অর্ধশতাব্দী পর তিনি নিজের চোখেই আবার এ রায়ের বাতিল হওয়া দেখে গেছেন।
গ্লোরিয়া স্টেইনেম সমলিঙ্গের বিয়ের বৈধতার পক্ষে কথা বলেছিলেন। একই সঙ্গে নারীদের সমান অধিকার ও সমান বেতনের দাবি জানিয়েছিলেন। পাশাপাশি মৃত্যুদণ্ড এবং নারীদের খৎনার (যৌনাঙ্গচ্ছেদ) বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ করেছিলেন তিনি।
১৯৩৪ সালের ২৫ মার্চ ওহাইও অঙ্গরাজ্যের টলেডো শহরে গ্লোরিয়া স্টেইনেম জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশব বেশ কষ্টে কেটেছে। ১২ বছর বয়সের আগপর্যন্ত তিনি নিয়মিত স্কুলে যেতে পারেননি।
১৯৫০-এর দশকের শেষের দিকে গ্লোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করেন। এরপর একটি গবেষণা বৃত্তি নিয়ে তিনি ভারতে যান এবং সেখানে নানা ধরনের কাজ করে দুবছর কাটান। এর মধ্যে অন্যতম ছিল সরকারি নীতির বিরুদ্ধে অহিংস আন্দোলন গড়ে তুলতে গ্রামের নারীদের সাহায্য করা। এ অভিজ্ঞতাই তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করার প্রতি তাঁর আগ্রহ জাগিয়ে তোলে।
এরপর ১৯৬০-এর দশকের শুরুর দিকে গ্লোরিয়া নিউইয়র্ক শহরে চলে আসেন। সেখানে তিনি ফ্রিল্যান্স (মুক্ত পেশাজীবী) লেখক হিসেবে নিজের কর্মজীবন শুরু করেন।
‘প্লেবয় বানি’ ক্লাবে মেয়েদের কাজের পরিবেশ কেমন, তা নিয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেন গ্লোরিয়া স্টেইনেম। এর মাধ্যমেই তিনি ব্যাপক পরিচিতি পান।
এরপর ১৯৭২ সালে গ্লোরিয়া স্টেইনেম ‘মিস’ ম্যাগাজিন প্রতিষ্ঠার আগে নিউইয়র্ক ম্যাগাজিনের কলামিস্ট হিসেবে কাজ শুরু করেন। তাঁর ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, তিনি একেবারে শেষ দিন পর্যন্ত সমতার জন্য কাজ করে গেছেন।
‘গ্লোরিয়ার সবচেয়ে বড় গুণ ছিল অন্যের কথা মন দিয়ে শোনার ক্ষমতা। তিনি অন্যদের এটা বোঝাতে পারতেন যে তাঁদেরও গুরুত্ব আছে। তাঁর কথা, কাজ ও আদর্শ মানুষকে নিজেদের আসল সত্তা প্রকাশ করার সাহস জুগিয়েছে। গ্লোরিয়া তাঁর স্বাধীনচেতা মনোভাব নিয়ে বেঁচে ছিলেন। তাঁর মধ্যে সব সময় কৌতূহল ও দারুণ রসবোধ ছিল।’
গ্লোরিয়ার ফাউন্ডেশন আরও জানিয়েছে, তিনি জীবনের শেষ বছরগুলো নিজের সমাজ ও লেখালেখির সঙ্গেই কাটিয়েছেন। তিনি তাঁর বাড়িতে ‘টকিং সার্কেল’ (আলোচনার আসর) বসাতেন এবং অতিথিদের স্বাগত জানাতেন। তাঁর এ প্রথা ভবিষ্যতেও চলতে থাকবে।