সাবেক প্রিন্স অ্যান্ড্রুর দুই মেয়ের সঙ্গেও তাহলে কুখ্যাত এপস্টিনের দেখাসাক্ষাৎ ছিল
কঠিন এক সময় পার করছেন যুক্তরাজ্যের রাজপরিবারের সদস্য অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসর ও তাঁর সাবেক স্ত্রী সারা ফার্গুসন। তাঁদের জন্য বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘বিপর্যয়’ বললেও হয়তো কম বলা হবে। দিন যত যাচ্ছে, ততই মনে হচ্ছে, এই সংকটের প্রভাব থেকে তাঁদের দুই মেয়ে প্রিন্সেস বিয়াট্রিচ ও ইউজিনিরও নিস্তার নেই।
সম্প্রতি প্রকাশ্যে আসা কিছু ই–মেইল থেকে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, যৌন অপরাধের দায়ে দণ্ডিত মার্কিন ধনকুবের জেফরি এপস্টিনের সঙ্গে প্রিন্সেস বিয়াট্রিচ ও ইউজিনির যোগাযোগ ধারণার চেয়েও অনেক বেশি ছিল।
অপ্রাপ্তবয়স্কদের যৌনকর্মে বাধ্য করার অভিযোগে সাজা ভোগের পর মুক্তি পাওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই মায়ামিতে এপস্টিনের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজে অংশ নিয়েছিলেন দুই প্রিন্সেস। অন্য নথিতে দেখা যায়, নিজের পরিচিত ব্যক্তিদের সঙ্গ দেওয়া কিংবা বাকিংহাম প্যালেস ঘুরিয়ে দেখানোর ক্ষেত্রেও তাঁদের কাজে লাগিয়েছেন এপস্টিন।
বিয়াট্রিচের বয়স এখন ৩৭ আর ইউজিনির ৩৫ বছর। নতুন নথিগুলো তাঁদের ভবিষ্যৎকে একধরনের অনিশ্চয়তা ও কঠিন পরীক্ষার মুখে ঠেলে দিতে পারে।
রাজকীয় বিষয়াবলি বিশ্লেষক রিচার্ড পামার বলেন, এপস্টিনের সঙ্গে ওই মধ্যাহ্নভোজে যোগ দেওয়া নিয়ে এখন জনমনে নানা প্রশ্ন জন্মাবে।
তবে রাজপরিবার–বিষয়ক সাংবাদিক ভিক্টোরিয়া মারফি মনে করেন, ই–মেইলগুলো ‘অত্যন্ত অস্বস্তিকর’ হলেও রাজকুমারীদের প্রতি এখনো সাধারণ মানুষের সহানুভূতি আছে।
নিঃসন্দেহে, নিজের বাবার এমন একটি ছবি দেখা—যেখানে তাঁকে এক তরুণীর ওপর হামাগুড়ি দিতে দেখা যাচ্ছে, যেকোনো সন্তানের জন্যই অত্যন্ত বিব্রতকর।
তবে সাবেক প্রিন্স অ্যান্ড্রু সব সময় তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছেন। এ ছাড়া জেফরি এপস্টিন–সংক্রান্ত নথিতে নাম থাকা মানেই যে কেউ কোনো অপরাধে জড়িত ছিলেন, তা–ও নয়।
ইয়র্ক পরিবারের সম্মান যখন এভাবে ধুলায় মিশে যাচ্ছে, তখন রাজপরিবারে এই দুই রাজকুমারীর অবস্থান কোথায়—সে প্রশ্ন এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
কেলেঙ্কারি থেকে নিজেদের দূরে রাখার চ্যালেঞ্জ
জেফরি এপস্টিন–সংক্রান্ত নথির সর্বশেষ সংস্করণে দুই প্রিন্সেসের নাম বারবার উঠে এসেছে।
মায়ামিতে সেই কথিত মধ্যাহ্নভোজের বিষয়ে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে প্রায়ই তাঁদের ‘দ্য গার্লস’ (মেয়েরা) বলে সম্বোধন করা হয়েছে। সে সময় ইউজিনির বয়স ছিল ১৯ এবং বিয়াট্রিসের ২১ বছর।
অ্যান্ড্রুকে নিয়ে লেখা বই ‘এনটাইটেলড’–এর লেখক অ্যান্ড্রু লনি বলেন, যখন তাঁদের এপস্টিনের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তখন তাঁরা পাঁচ বছরের শিশু ছিলেন না; তাঁরা তখন প্রাপ্তবয়স্ক।
লনি আরও বলেন, তাঁরা পরিস্থিতির শিকার, এমন কথা বলে তাঁদের নির্দোষ প্রমাণের ব্যাপক চেষ্টা চলছে। কিন্তু বিষয়টি তেমন নয়, তাঁরা এর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
তবে সাংবাদিক ভিক্টোরিয়া মারফি এ কথার সঙ্গে একমত নন। তাঁর মতে, রাজকুমারীরা ওই মধ্যাহ্নভোজে যাওয়া বা যেতে রাজি হওয়ার পেছনে যথেষ্ট যুক্তিসংগত কারণ ছিল।
মারফি বলেন, ‘এপস্টিনের সব অপরাধ প্রকাশ্যে আসায় খুব সহজেই দুই প্রিন্সেসের সমালোচনা করা হচ্ছে। কিন্তু সেই সময়ে যদি কেউ তাঁদের কোনো সতর্কবার্তা না দিয়ে থাকেন, তবে নিজেদের মায়ের আয়োজিত ওই সফরে তাঁরা কেন গিয়েছিলেন, তা সহজেই বোঝা যায়।’
একই সঙ্গে জেফরি এপস্টিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে কী কী বাড়তি সুবিধা পাওয়া যেত, সেই বিষয়ও এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
এপস্টিন ও তাঁর সহকারীর মধ্যে চালাচালি হওয়া একটি ই–মেইল থেকে জানা যায়, তিনি সম্ভবত ইয়র্ক পরিবারের উড়োজাহাজভাড়ার টাকা পরিশোধ করেছিলেন। যেখানে ‘সব টিকিটের মোট দাম’ দেখানো হয়েছিল ‘১৪ হাজার ৮০ ডলার’।
তবে এই সুবিধা বা লেনদেন যে কেবল একপক্ষীয় ছিল, তা–ও নয়।
বিভিন্ন নথিপত্র থেকে জানা যায়, বেশ কয়েকবার জেফরি এপস্টিন সাবেক প্রিন্স অ্যান্ড্রুর স্ত্রী সারা ফার্গুসনকে অনুরোধ করেছিলেন, যেন তাঁর কন্যারা এপস্টিনের ঘনিষ্ঠ লোকজনের সঙ্গে দেখা করেন। এমনকি একবার জনৈক এক ব্যক্তিকে (নথিতে তাঁর নাম গোপন রাখা হয়েছে) বাকিংহাম প্যালেস ঘুরিয়ে দেখানোর জন্যও তিনি দুই প্রিন্সেসের সাহায্য চেয়েছিলেন।
একবার ফার্গুসন দুঃখ প্রকাশ করে এপস্টিনকে বলেন, তাঁর কন্যারা বাকিংহাম প্যালেসে নেই। তাঁরা কোথায় আছেন, সে ব্যাখ্যাও দেন। অন্য এক ই–মেইলে প্রিন্সেস ইউজিনির ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয়েও ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
কিছু ই–মেইলে এপস্টিনের পরিচিত ব্যক্তিদেরও রাজকুমারীদের নিয়ে কথা বলতে দেখা গেছে। এপস্টিনের এক বন্ধু তাঁকে পাঠানো এক ই–মেইলে লেখেন, ‘এইমাত্র “ডাচেস অব পোর্ক”-এর (সারা ফার্গুসনকে ব্যঙ্গ করে বলা নাম) সঙ্গে কথা হয়েছে। তিনি বিয়াট্রিসের সঙ্গে এক মধ্যাহ্নভোজে আছেন। আমি তাঁকে নিজের পরিচয় দিলাম। জানালাম, আমি তাঁর বাবাকে চিনি। তিনি চমৎকার মানুষ...পরে এ বিষয়ে বিস্তারিত কথা হবে।’
এ বিষয়ে সারা ফার্গুসনের প্রতিনিধিদের কাছে মন্তব্য চাওয়া হয়েছে।
তবে বিশ্লেষক পামারের মতে, ই–মেইলগুলোতে দুই প্রিন্সেসের নাম বারবার আসায় এই কলঙ্কজনক অধ্যায় থেকে তাঁরা নিজেদের দূরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন। তিনি বলেন, ইয়র্ক পরিবার ও এপস্টিনের মধ্যকার এই যোগসূত্র এড়িয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই।
আড়ালে থাকার চেষ্টা
এই দুই বোনের কেউই রাজপরিবারের হয়ে সরাসরি কাজ করেন না। তাঁরা দুজনেই বিবাহিত এবং নিজেদের কর্মজীবন ও সন্তান নিয়ে ব্যস্ত। তবে রাজপরিবারের অন্য সদস্যদের মতো তাঁদেরও বেশ কিছু দাতব্য কার্যক্রম রয়েছে।
ইউজিনি ‘অ্যান্টি–স্ল্যাভারি কালেক্টিভ’ নামে একটি দাতব্য সংস্থার সহপ্রতিষ্ঠাতা, যা মূলত যৌনকর্মের জন্য পাচারের শিকার নারীদের নিয়ে কাজ করে। লেখক অ্যান্ড্রু লনি এটিকে ইউজিনির জন্য একটি ‘অবিশ্বাস্য রকমের অনুপযুক্ত’ কাজ বলে মন্তব্য করেছেন।
সংস্থাটির সর্বশেষ আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, তাদের অনুদান নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। ২০২৪ সালে যা ছিল ১৫ লাখ পাউন্ড, ২০২৫ সাল নাগাদ তা নেমে এসেছে মাত্র ৪৮ হাজার পাউন্ডে। যদিও তাদের তহবিলে এখনো বড় অঙ্কের অর্থ জমা আছে।
তবে ২০২৫ সালে কোনো অনুষ্ঠান বা নিলাম থেকে দাতব্য সংস্থার কোনো আয় হয়নি। খাতসংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি জানান, বর্তমানে কোনো হাই-প্রোফাইল অনুষ্ঠান করা খুবই কঠিন। স্বাভাবিকভাবেই তাঁরা এখন আড়ালে থাকার চেষ্টা করছেন।
এপস্টিন কেলেঙ্কারি নিয়ে বিবিসির পক্ষ থেকে একাধিকবার সংস্থাটির মন্তব্য চাওয়া হলেও তারা কোনো সাড়া দেননি। ইউজিনি যে স্যালভেশন আর্মির সঙ্গে কাজ করেন, তারা বেশ সতর্ক অবস্থান নিয়ে জানিয়েছে, ‘আমরা এই ঘটনাটি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছি।’
পেশাগত জীবন ও বিতর্ক
দাতব্য কাজের বাইরে বিয়াট্রিস ‘বিওয়াই–ইকিউ’ নামের একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। অন্যদিকে ইউজিনি মেফেয়ারের একটি আর্ট গ্যালারিতে পরিচালক হিসেবে কর্মরত। সম্প্রতি ওই গ্যালারি রাশিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লেও ইউজিনির বিরুদ্ধে কোনো ব্যক্তিগত অভিযোগ ওঠেনি।
গত বছর যখন রাজকুমারীদের বাবা রাজকীয় উপাধি হারান, তখন বিয়াট্রিসকে সৌদি আরবে একটি বিনিয়োগ সম্মেলনে দেখা যায়। এ ছাড়া বিয়াট্রিস ও তাঁর স্বামী এডোয়ার্ডো মাপেলি মোজ্জি অ্যান্ড্রুর ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডেও জড়িত ছিলেন।
বিশ্লেষক পামার মনে করেন, রাজকীয় পদমর্যাদা এবং বাবা-মায়ের পরিচিতিকে কাজে লাগিয়েই বিয়াট্রিস তাঁর ক্যারিয়ার ও ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন।
দুই রাজকুমারীর স্বামীরা আর্থিকভাবে সচ্ছল এবং তাঁদের দুজনেরই দুটি করে সন্তান রয়েছে। বিয়াট্রিস ও ইউজিনি রাজকীয় সম্পত্তিতে বসবাসের জন্য ভাড়া দেন বলে জানা গেছে। যদিও সেই ভাড়ার পরিমাণ বাজারমূল্যের সমান কি না, তা স্পষ্ট নয়।
ব্যক্তিগতভাবে দুই বোন তাঁদের বাবা-মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখলেও জনসমক্ষে তাঁদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখছেন। পামার বলেন, নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষা করতে তাঁদের জনসমক্ষে বাবা-মায়ের থেকে আলাদা থাকতেই হবে। না হলে এ পরিস্থিতি তাঁদের জীবনকেও বিষাক্ত করে তুলবে।