এপস্টেইন ফাইলসের ডজনখানেক স্পষ্ট নগ্ন ছবি প্রকাশ করেছিল ট্রাম্প প্রশাসন
মার্কিন বিচার বিভাগ কোনো সম্পাদনা ছাড়াই তাদের ওয়েবসাইটে ডজনখানেক তরুণীর নগ্ন ছবি প্রকাশ করেছে, যাতে তাঁদের মুখমণ্ডল স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। এসব তরুণীর ছবি মার্কিন ধনকুবের যৌন নিপীড়ক ও নারী পাচারকারী জেফরি এপস্টেইন–সংক্রান্ত নথিপত্রের অংশ হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়েছিল।
এপস্টেইন ফাইলস প্রকাশের বাধ্যবাধকতার অংশ হিসেবে এসব তরুণীর স্পষ্ট মুখমণ্ডলের ছবি সম্পাদনা করে অস্পষ্ট করে দেওয়া বা মুছে দেওয়া ফেডারেল সরকারের দায়িত্ব ছিল। কারণ, ছবি এমন স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা হয়েছে, যাতে ভুক্তভোগীদের পরিচয় শনাক্ত করা যায়।
গত শুক্রবার বিচার বিভাগের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা ৩০ লাখের বেশি পৃষ্ঠা পর্যালোচনা করতে গিয়ে নিউইয়র্ক টাইমস প্রায় ৪০টি স্পষ্ট ছবি খুঁজে পায়। ছবিগুলো একটি ব্যক্তিগত ফটো সংগ্রহের অংশ বলে মনে হয়, যেখানে নগ্ন দেহ এবং ছবিতে থাকা ব্যক্তিদের মুখও দেখা যাচ্ছিল।
ছবির ব্যক্তিরা দেখতে তরুণ মনে হলেও তাঁরা অপ্রাপ্তবয়স্ক কি না, তা স্পষ্ট নয়। কিছু ছবিতে সমুদ্রসৈকতসহ এপস্টেইনের ব্যক্তিগত দ্বীপের দৃশ্য দেখা যায়। অন্য কিছু ছবি তোলা হয়েছে শোবার ঘর ও ব্যক্তিগত স্থানে।
মার্কিন সরকারের আইনজীবীরা কয়েক সপ্তাহ ধরে এপস্টেইন ফাইলস ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্টের শর্ত পূরণ করতে তাড়াহুড়া করে কাজ করছিলেন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এসব নথি প্রকাশের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
নিউইয়র্ক টাইমস গত শনিবার বিচার বিভাগকে জানায়, সাংবাদিকেরা নগ্ন ছবি দেখতে পাচ্ছেন। গতকাল রোববার আরও নগ্ন ছবি চিহ্নিত করে বিষয়টি তাদের জানানো হয়।
বিচার বিভাগের এক মুখপাত্র বলেন, ‘ভুক্তভোগীদের উদ্বেগ, ব্যক্তিগতভাবে শনাক্তযোগ্য তথ্য বিশেষ করে যৌন প্রকৃতির ছবি ঠিক করতে দিনরাত কাজ করছে বিভাগ।’
মুখপাত্র বলেন, যথাযথভাবে সম্পাদনা শেষ হলে সংশ্লিষ্ট নথিগুলো আবার অনলাইনে প্রকাশ করা হবে।
টাইমস যেসব ছবি চিহ্নিত করে জানিয়েছিল, বিচার বিভাগের কর্মকর্তারা সেগুলোর বেশির ভাগই সরিয়ে ফেলেছেন বা যাতে কাউকে শনাক্ত করা না যায়, সেভাবে সম্পাদনা করেছেন। ছবিগুলোতে অন্তত সাতজন আলাদা ব্যক্তিকে দেখা যায় বলে মনে হয়েছে। অবশ্য টাইমস তাঁদের পরিচয় জানার চেষ্টা করেনি।
এপস্টেইন ও তাঁর সহযোগী গিলেন ম্যাক্সওয়েল কিশোরী বয়সে তাঁকে কীভাবে প্রলোভন দেখিয়ে নির্যাতন করেছিলেন, আদালতে সেই সাক্ষ্য দিয়েছিলেন অ্যানি ফার্মার নামের এক নারী। তিনি বলেছেন, এ ধরনের ছবি স্পষ্টভাবে প্রকাশের খবর ‘ভীষণ উদ্বেগজনক’। এতে তাঁর মনে হয়েছে, ভুক্তভোগীদের সুরক্ষায় সরকার আইন মেনে চলবে—এমন বিশ্বাস করা তাঁর সরলতা ছিল।
অ্যানি ফার্মার বলেন, ‘ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা না দেওয়ার এমন ভয়াবহ বিষয় কল্পনা করাও কঠিন। তাঁদের পূর্ণ নগ্ন ছবি সারা বিশ্বে ডাউনলোডের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছিল।’
অন্য ভুক্তভোগীরাও তাঁদের নাম ও পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য ফাইলসে পাওয়ার বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এমন এক নারীর আইনজীবী ব্রিটানি হেন্ডারসন এভাবে ছবি প্রকাশকে ‘ঘৃণ্য’ কাজ বলে উল্লেখ করেছেন।
ওই আইনজীবীর মক্কেলের নাম আগে কখনো প্রকাশ্যে এপস্টেইনের সঙ্গে যুক্ত ছিল না। তবে ফাইলসে তাঁর নাম এসেছে।
হেন্ডারসন বলেন, ‘এই নারীদের প্রতি বিচার বিভাগ যে মাত্রার অবহেলা দেখিয়েছে, তাতে আমরা সত্যিই বিস্মিত।’
১৯ ডিসেম্বরের মধ্যে বিচার বিভাগের এপস্টেইনের সব ফাইল প্রকাশ করার কথা ছিল। তবে তারা সময় অনুযায়ী কাজটি শেষ করতে পারেনি। শুক্রবার লাখ লাখ নথির পাশাপাশি ২ হাজার ভিডিও এবং ১ লাখ ৮০ হাজার ছবি প্রকাশ করা হয়।
বিচার বিভাগ জানায়, এসব নথি প্রকাশের কাজে ৫০০–এর বেশি আইনজীবী ও পর্যালোচক কাজ করেছেন।
সম্পাদনা অনেক ক্ষেত্রে এলোমেলো ও পরস্পরবিরোধী মনে হয়েছে। কোথাও একটি নথিতে কারও নাম গোপন রাখা হয়েছে, কিন্তু একই নথির অনুলিপিতে সেই নাম প্রকাশ করা হয়েছে। একটি ই–মেইলে ‘এপস্টেইনের ভুক্তভোগী তালিকা’–এর কথা বলা হয়েছে। আবার পরের অংশে কেবল একটি নাম বাদে বহু নাম উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।
কিছু ভুক্তভোগী তাঁদের তথ্য প্রকাশ করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। অথচ ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের নাম আড়াল করা হয়েছে।
এক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ট্রাম্পের সাবেক উপদেষ্টা স্টিফেন কে ব্যানন ও এপস্টেইনের মধ্যে একটি টেক্সট বার্তা আদান–প্রদান হয়েছে। এতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে নিয়ে একটি সংবাদ প্রতিবেদনের উল্লেখ ছিল। সংশ্লিষ্ট একটি ছবিতে ট্রাম্পের মুখ পুরোপুরি ঢেকে দেওয়া ছিল।
গত বছর ট্রাম্প প্রশাসন তদন্তসংক্রান্ত নথি প্রকাশের ইঙ্গিত দিলেও পরে সরে আসে। এরপর ডেমোক্র্যাট ও কয়েকজন রিপাবলিকান সদস্য মিলে আইন পাসের উদ্যোগ নেন, যাতে ফাইলগুলো প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা হয়।