ট্রাম্প ইরানের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন, কট্টরপন্থী রিপাবলিকানরা কেন এমনটা ভাবছেন

জি৭ শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে ফ্রান্স সফরে রয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেখানে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ ও তাঁর স্ত্রী ব্রিজিত মাখোঁর সঙ্গে ট্রাম্প। ১৫ জুন ২০২৬, এভিয়ানছবি: এএফপি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত ফেব্রুয়ারিতে যখন ইরানে আগ্রাসন শুরু করেছিলেন, তখন তিনি তাঁর নিজের জনসমর্থনের একটি বড় অংশকে অসন্তুষ্ট করার ঝুঁকি নিয়েছিলেন। কারণ, তিনি নির্বাচনী প্রচারে অন্য দেশের বিষয়ে মার্কিন হস্তক্ষেপের বিরোধী অবস্থানে থাকবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এভাবে এক দশক ধরে সমর্থকদের তাঁর পাশে রেখেছেন।

এখন ট্রাম্প যখন এই তীব্র অজনপ্রিয় যুদ্ধ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন, তখন মনে হচ্ছে তিনি উল্টো তাঁর অন্যপক্ষের সমর্থকদের ক্ষুব্ধ করতে যাচ্ছেন। তারা হলো পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক সেই কট্টরপন্থী অংশ, যাদের সঙ্গে তিনি হঠাৎ জোট বেঁধেছিলেন।

ইরানের সঙ্গে করা সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) মূল শর্তগুলো আসলে কী, তা নিয়ে খুব বেশি সুনির্দিষ্ট তথ্য এখনো জানা যায়নি। তবে এই কট্টরপন্থীরা এখন প্রকাশ্যেই উদ্বেগ প্রকাশ করতে শুরু করেছেন, যুদ্ধ শেষ করার নামে ট্রাম্প হয়তো ইরানকে অনেক বেশি ছাড় দিয়ে ফেলেছেন।

কট্টরপন্থীরা তাঁদের এই আশঙ্কা গোপন রাখেননি যে ট্রাম্প হয়তো ২০১৫ সালে ওবামা প্রশাসনের করা সেই পরমাণু চুক্তির মতোই কোনো চুক্তিতে সই করতে যাচ্ছেন, যে চুক্তিটিকে তাঁরা (এবং ট্রাম্প নিজে) এক দশকের বেশি সময় ধরে অত্যন্ত দুর্বল বলে উপহাস করে এসেছেন।

গত এপ্রিলের শুরুতে ট্রাম্প যখন তাড়াহুড়া করে একটি যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছিলেন, তখনো কট্টরপন্থীদের মধ্যে একই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছিল। এরপর মে মাসের শেষের দিকে যখন সম্ভাব্য চুক্তির রূপরেখা তৈরি হতে শুরু করে, তখনো তেমনটাই ঘটেছিল।

এখন প্রাথমিক চুক্তিটি চূড়ান্ত রূপ নিচ্ছে বলে সম্ভাবনা দেখা যাওয়ায় সমালোচনা আরও তীব্র হচ্ছে।

গত রোববার সাউথ ক্যারোলাইনার সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি পোস্ট দিয়ে এই সমালোচনার সূত্রপাত করেন, যা বেশ পরোক্ষ-আক্রমণাত্মক বলে মনে হয়েছে।

ক্যাপিটল হিলে সাপ্তাহিক নীতিনির্ধারণী মধ্যাহ্নভোজের বৈঠক শেষে বের হয়ে যাচ্ছেন কট্টরপন্থী মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম। ১৯ মে ২০২৬, ওয়াশিংটন
ছবি: রয়টার্স

প্রাথমিক একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর প্রচেষ্টার প্রশংসা করলেও ইসরায়েলপন্থী সিনেটর গ্রাহাম বলেন, তিনি ‘খানিকটা চিন্তিত’। কারণ, ইরানের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের বিবরণের মিল নেই।

লিন্ডসে গ্রাহাম এই বিষয়ের ওপরও জোর দেন, এ ধরনের যেকোনো চুক্তিতে অবশ্যই কংগ্রেসের ভোট বা অনুমোদন থাকতে হবে। তিনি একে ‘অপরিহার্য’ বলে উল্লেখ করে লিখেছেন, এই চুক্তির মূল কারিগর ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং তাঁর সহযোগী আলোচকদের অবশ্যই কংগ্রেসের কাছে চূড়ান্ত চুক্তিটি উপস্থাপনের প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে হবে।

জেডি ভ্যান্সের পররাষ্ট্রনীতি লিন্ডসে গ্রাহামের তুলনায় অনেক বেশি নরম বা যুদ্ধবিরোধী। আর ট্রাম্পের যেসব মিত্র তাঁর বর্তমান পদক্ষেপ পছন্দ করছেন না, তাঁরা সাধারণত ট্রাম্পকে ব্যক্তিগতভাবে দোষ না দিয়ে তাঁর আশপাশের মানুষের ওপর দোষ চাপিয়ে থাকেন।

ফক্স নিউজের উপস্থাপক মার্ক লেভিনও এই যুদ্ধের একজন প্রভাবশালী সমর্থক ছিলেন।

শান্তি আলোচনার মধ্যেই লেবাননে হিজবুল্লাহকে লক্ষ্যবস্তু করার জন্য ট্রাম্প যখন ইসরায়েলের সমালোচনা করেন, তখন রোববার উপস্থাপক মার্ক লেভিন তাতে বেশ আপত্তি জানান। এর পর থেকে তিনি বারবার প্রকাশ্যেই প্রশ্ন তুলছেন, ট্রাম্প প্রশাসন কেন এই চুক্তির মূল লিখিত রূপটি প্রকাশ করছে না।

লেভিন রোববার বলেন, ‘আমি বেশ কয়েক দিন ধরে জিজ্ঞাসা করছি, আমরা—দেশের সাধারণ মানুষ কেন এই ছাইপাঁশ এমওইউ দেখতে পাচ্ছি না?’

কট্টরপন্থী এই উপস্থাপক আরও যোগ করেন, ‘সত্যি বলতে, আমি এর আগে কখনো এমন কিছু দেখিনি। যদি এটি শান্তির জন্য সত্যিই খুব ভালো একটি ফল এনে থাকে, তবে এটি প্রকাশ করে দিন।’

গতকাল সোমবারও লেভিন একই কথার পুনরাবৃত্তি করেন, যার কিছুক্ষণ পরই ট্রাম্পের একজন রাজনৈতিক উপদেষ্টার সঙ্গে তাঁর তর্কাতর্কি হয়। ওই উপদেষ্টা উপস্থাপক লেভিনের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্টের অবস্থানকে দুর্বল করার অভিযোগ এনেছিলেন।

রক্ষণশীল ধারার পত্রিকা ‘ন্যাশনাল রিভিউ’-এর সম্পাদকেরাও জানতে চান, কেন সমঝোতা স্মারকের বিস্তারিত তথ্য এখনো সামনে আনা হচ্ছে না।

রক্ষণশীল সমর্থক ফক্স টেলিভিশনের উপস্থাপক মার্ক লেভিন
ফাইল ছবি: এএফপি

ট্রাম্প যখন ইঙ্গিত দেন, ইরানকে এখনো বেসামরিক ব্যবহারের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অনুমতি দেওয়া হবে, তখন এই রক্ষণশীল সম্পাদকেরা একে ‘হতাশাজনক’ বলে অভিহিত করেন। এ ছাড়া চুক্তিটি যে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না, এমন প্রাথমিক ইঙ্গিতেরও তাঁরা সমালোচনা করেন।

সম্পাদকেরা লিখেছেন, সব মিলিয়ে এমন একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, ট্রাম্প হয়তো যুক্তরাষ্ট্রকে ওবামার সেই ব্যর্থ ইরান চুক্তিতেই ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, যা তিনি নিজে প্রথম মেয়াদে ‘ন্যায্যভাবে’ বাতিল করেছিলেন। প্রেসিডেন্টের এত সব বড় বড় কথার পর এটি দেখতে পুরো একটি অপমানের মতো দেখাবে।

শান্তি আলোচনার আরেক সমালোচক ট্রাম্প প্রশাসনের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও গতকাল কিছুটা শান্ত থাকলেও স্পষ্টতই সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন।

মাইক পম্পেও এক্সে লিখেছেন, ‘আমি প্রার্থনা করি, যেকোনো সমাধান যেন আমাদের ত্যাগগুলোকে ধরে রাখে এবং মার্কিন জনগণের স্বার্থ রক্ষা করে।’

অন্যরা আবার সামনে আসা নতুন কিছু তথ্য নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন বলে মনে হচ্ছে।

ভ্যান্স যখন ইঙ্গিত দেন, ইরানি নেতারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তাঁদের ৪৭ বছরের শত্রুতার জন্য অনুশোচনা প্রকাশ করেছেন, তখন রক্ষণশীল ভাষ্যকার এরিক এরিকসন সংক্ষেপে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জবাব দেন, ‘এফএফএস’। এই কথার অর্থ অত্যন্ত বিরক্তি প্রকাশ করা।

ট্রাম্পের কিছু ঘনিষ্ঠ কট্টরপন্থী মিত্র অবশ্য প্রশাসনকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, তারা যেন অন্ধভাবে ইরানের কথাকে বিশ্বাস না করে বা তারা কোনো লিখিত চুক্তির শর্ত মেনে চলবে, এমনটা যেন মনে না করে।

এরিকসন অন্য এক জায়গায় যোগ করেন, ‘ট্রাম্প ইরানের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। যারা মার্কিনদের হত্যা করে, তারা এই চুক্তি পছন্দ করছে।’

একইভাবে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের সাবেক সহযোগী মার্ক থিসেন গতকাল ফক্স নিউজে সতর্ক করে বলেন, ট্রাম্পের তৈরি হাতে থাকা রূপরেখাটি অনেকটাই ওবামার চুক্তির মতো দেখাচ্ছে।

থিসেন বলেন, ‘চুক্তির বিস্তারিত কী এবং কী নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তা দেখতে আমি উদ্‌গ্রীব হয়ে আছি, তবে আমি বেশ চিন্তিত।’

সেমাফোরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প নাকি থিসেনের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে থাকেন।

গতকাল সকালে ভ্যান্স যখন নিশ্চিত করেন, ইরান ৩০ হাজার কোটি ডলারের (যদিও এই বক্তব্য ভুয়া সংবাদ কি না, তা নিয়ে জোর আলোচনা চলছে) একটি পুনর্গঠন তহবিল ব্যবহার করতে পারবে।

ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও
ফাইল ছবি: রয়টার্স

অবশ্য এই অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের তহবিল থেকে দেওয়া হচ্ছে না। থিসেন এই বিশাল অঙ্কের অর্থকে একটি ‘বিপর্যয়’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

থিসেন বিষয়টিকে তুলনা করেছেন ‘নাৎসিরা যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন জার্মানি পুনর্গঠনের জন্য “মার্শাল প্ল্যান” (আমেরিকান অর্থনৈতিক সাহায্য) দেওয়ার’ সঙ্গে।

আর এসব সমালোচনা যখন আসছে, তখনো আলোচকেরা এই সমঝোতা স্মারকের ভেতরে থাকা জটিল বা খুঁটিনাটি বিষয়গুলো পুরোপুরি হাতেই পাননি। আসল সমস্যা সব সময় লুকিয়ে থাকে ভেতরের সূক্ষ্ম শর্তাবলিতে এবং সেখানে সব সময়ই খুঁত ধরার মতো কিছু না কিছু থাকেই।

তবে এটা বেশ কিছুদিন ধরেই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল, ট্রাম্প যেদিকে যাচ্ছিলেন, তা নিয়ে এই কট্টরপন্থীরা চিন্তিত। এটাও পরিষ্কার, ট্রাম্পের আর যুদ্ধে ফিরে যাওয়ার কোনো ইচ্ছা নেই এবং তিনি সত্যিই এই পুরো বিষয় দ্রুত শেষ করতে চেয়েছিলেন। আর ট্রাম্পের এই মনোভাবই ইরানকে আরও শক্ত অবস্থানে থেকে একটি ভালো চুক্তির জন্য অপেক্ষা করার সুযোগ করে দিয়েছে।

কর্মকর্তারা চুক্তির মূল লিখিত পাঠ্য প্রকাশ না করা পর্যন্ত এর ভেতরে ঠিক কী আছে, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে এই মুহূর্তে ট্রাম্পকে নিজের এই পদক্ষেপ নিজের দলের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করানোর জন্য অত্যন্ত কঠিন এক পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হচ্ছে, যা খুব কম মানুষকেই খুশি করতে পারছে।

শেষ পর্যন্ত ডানপন্থীদের মধ্যে যদি এমন ধারণা তৈরি হয় যে তিনি প্রায় এক দশক আগে নিজের বাতিল করা ওবামার পরমাণু চুক্তিটিই আবার জোড়াতালি দিয়ে ফিরিয়ে এনেছেন, তাহলে এই যুদ্ধ ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবে আগের চেয়েও বড় একটি বিপর্যয় হয়ে দাঁড়াতে পারে।