মার্কিন সেনাদের মোবাইলের ভিডিও দেখে হামলার ছক কষে ইরান, জব্দ হতে পারে তাঁদের ফোন

সাক্ষ্য দিচ্ছেন মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে ক্যাপিটল হিলে ১৪ মে সিনেট আর্মড সার্ভিসেস কমিটির শুনানিতে, ১৪ মে ২০২৬ছবি: রয়টার্স

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সামরিক কমান্ডার ওই অঞ্চলে মোতায়েন সেনাদের সতর্ক করে বলেছেন, মোবাইল ফোনে ধারণ করা ভিডিও অনলাইনে ছড়িয়ে পড়লে তা ইরানকে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার নিশানা নির্ধারণে সহায়তা করতে পারে। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত সূত্রগুলো রয়টার্সকে জানিয়েছে, ওই অঞ্চলে মোতায়েন কিছু সেনাকে শিগগিরই তাঁদের মোবাইল ফোন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হতে পারে।

মোবাইল ফোন ব্যবহারে এমন কড়াকড়ি আরোপ করা হলে তা ওই অঞ্চলে অবস্থানরত হাজার হাজার মার্কিন সেনার জন্য এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করবে। তাঁদের অনেকে ফোনে নিয়মিতভাবে স্বজনদের বার্তা পাঠিয়ে নিজেদের অবস্থার কথা জানান।

এক চিঠিতে মার্কিন সেনাবাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার বলেছেন, সংবাদ প্রতিবেদন কিংবা সাংবাদিকদের অনলাইন পোস্টে সেনাসদস্যদের মোবাইল ফোনে ধারণ করা ‘প্রতিক্রিয়া, ছবি ও ভিডিও’ দেখে ইরান প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে (রিয়েল–টাইমে) নিজেদের হামলা কতটা সফল বা ব্যর্থ হয়েছে, তা বুঝতে পারছে।

২৮ জুলাই লেখা কুপারের চিঠিটি এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তবে এর একটি অনুলিপি বার্তা সংস্থা রয়টার্সের হাতে এসেছে।

কুপার চিঠিতে লিখেছেন, ‘ওপেন-সোর্স তথ্য প্রকাশের কারণে মার্কিন সেনা ও হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়া উপসাগরীয় দেশগুলোর বেসামরিক মানুষের জীবন ঝুঁকিতে পড়তে পারে।’

চিঠিতে কুপার সেনাদের প্রতি ‘অপারেশনাল নিরাপত্তার বিষয়ে আরও বেশি মনোযোগী’ হওয়ার আহ্বান জানান। তবে এ জন্য সুনির্দিষ্ট কী কী পদক্ষেপ নিতে হবে, তা তিনি জানাননি।

কুপারের এই সতর্কবার্তা যুদ্ধের সংবাদ পরিবেশন নিয়ে নতুন এক টানাপোড়েনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। স্যাটেলাইট চিত্র, প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা ও অনলাইনে প্রকাশিত তথ্য ইরানের কাজে লাগতে পারে—এমন আশঙ্কায় এসব তথ্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইছে মার্কিন সামরিক বাহিনী।

এক সেনাসদস্যের মেটা স্মার্ট গ্লাসে ধারণ করা ভিডিও ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করা হয়। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার সময় তিনি কোথায় ও কীভাবে একটি বাংকারে আশ্রয় নিয়েছিলেন, সেখানে (ভিডিওতে) তা দেখা যায়।
অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার, সেন্টকমপ্রধান

বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, জর্ডানে থাকা কিছু মার্কিন সেনাকে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে মোবাইল ফোন জমা দিতে বলা হয়েছে। যেসব দেশ ঘন ঘন ইরানের হামলার শিকার, জর্ডান সেগুলোর একটি।

তৃতীয় আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, অপারেশনাল নিরাপত্তার কারণে পুরো অঞ্চলে (জর্ডানের মতো) একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে মোবাইল ফোন জব্দের সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সেন্টকমের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিমোথি হকিন্স বলেন, ‘বার্তাটি আমাদের সেনাসদস্যদের অপারেশনাল নিরাপত্তা বজায় রাখার গুরুত্ব সম্পর্কে জানাতে দেওয়া হয়েছে। অপারেশনাল অগ্রাধিকার তুলে ধরতে অ্যাডমিরাল কুপার বিভিন্ন সময় এ ধরনের বার্তা দিয়েছেন।’

ইরানের হামলার সময় আশ্রয়ে যাওয়ার ভিডিও

চলতি মাসে অনলাইনে প্রকাশিত এক ভিডিওতে দেখা যায়, ১৭ জুলাই জর্ডানের মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে ইরানের প্রাণঘাতী হামলার সময় মার্কিন সেনারা আশ্রয়ের জন্য দৌড়ে যাচ্ছেন। এক মার্কিন সেনাসদস্য ভিডিওটি ধারণ করেছেন।

অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার তাঁর চিঠিতে ওই ভিডিওর প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, এটি মেটার (ফেসবুকের মূল কোম্পানি) ক্যামেরাযুক্ত স্মার্ট চশমা দিয়ে ধারণ করা হয়েছিল।

কুপার লেখেন, ‘এক সেনাসদস্যের মেটা স্মার্ট গ্লাসে ধারণ করা ভিডিও ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করা হয়। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার সময় তিনি কোথায় ও কীভাবে একটি বাংকারে আশ্রয় নিয়েছিলেন, সেখানে (ভিডিওতে) তা দেখা যায়।’

কুপার বলেন, এ ধরনের তথ্য প্রকাশ না হলে নিজেদের হামলা কতটা সফল বা ব্যর্থ হয়েছে, তা নির্ধারণ করা ইরানের জন্য সাধারণভাবে কঠিন হতো। কারণ, যুদ্ধক্ষেত্রে মার্কিন বাহিনী ইলেকট্রনিক জ্যামিংসহ (শত্রুর যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত করা) বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করে থাকে।

* জর্ডানে মোতায়েন কিছু মার্কিন সেনাকে কয়েক দিনের মধ্যে মোবাইল ফোন জমা দিতে বলা হয়েছে।
* সেন্টকমপ্রধানের দাবি, সেনাদের মোবাইলের ভিডিওই ইরানকে হামলার সাফল্য–ব্যর্থতা বুঝতে সাহায্য করছে।
* যুদ্ধে এ পর্যন্ত ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত ও ৬০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।

কুপার আরও লেখেন, ‘ইরান জানে, তারা অস্ত্র ছুড়েছে। কিন্তু সেগুলো লক্ষ্যবস্তু থেকে ৫০ মিটার দূরে পড়েছে, নাকি খালি রানওয়েতে আঘাত করেছে বা জনাকীর্ণ কোনো স্থাপনায় লেগেছে—তা তারা জানে না।’

কুপারের ভাষায়, কোন কোন স্থাপনায় আঘাত লেগেছে, তার বিস্তারিত তালিকা, বর্ণনা ও বিশ্লেষণ যখন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়, তখন মূলত ইরানের হয়ে বিনা মূল্যে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়নের কাজ করে দেওয়া হয়।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একযোগে ইরানে আগ্রাসন শুরু করে। এতে এ পর্যন্ত ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত ও ৬০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। এত বেশি হতাহতের ঘটনায় মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। বর্তমানে প্রতি তিনজন মার্কিন নাগরিকের মধ্যে মাত্র একজন এই যুদ্ধকে সমর্থন করছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধী ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা যুদ্ধ–সম্পর্কিত আরও তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন। তাঁরা রাডার টাওয়ার, ব্যারাক, বিমান হ্যাঙ্গারসহ বিভিন্ন মার্কিন সামরিক ঘাঁটির অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত তথ্য জানতে চেয়েছেন।

যুদ্ধের প্রথম দিন ইরানে মেয়েশিশুদের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মার্কিন হামলা নিয়ে দেশটির সামরিক বাহিনীর তদন্ত করেছে। তা–ও প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা।

সম্প্রতি সিএনএনের এক তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের হরমোজগান প্রদেশের মিনাবের শাজারেহ তাইয়্যেবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন সামরিক বাহিনীর টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছিল। এতে ১২০ জন শিক্ষার্থী, ২৬ জন শিক্ষকসহ মোট ১৫৬ জন নিহত হন।

মোবাইল ফোন জব্দ হতে পারে—এমন খবরে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সেনাদের পরিবারের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে।

মোবাইল ফোন কি জব্দ করা হচ্ছে

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বিদেশে মোতায়েন মার্কিন সেনাদের মোবাইল ফোন ব্যবহারের নিয়ম বাহিনী ভেদে ভিন্ন হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের ফোন নির্দিষ্ট স্থানে জমা রেখে তালাবদ্ধ রাখতে হবে। আবার বিশেষ অভিযান পরিচালনাকারী বাহিনীর সংবেদনশীল মিশনে মোবাইল ফোন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধও থাকতে পারে।

দুটি সূত্র জানিয়েছে, মোবাইল ফোন জব্দ করা হতে পারে, এমন সম্ভাবনার খবর কিছু সেনাসদস্যের পরিবারের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। কয়েক মাস ধরে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটিতে প্রাণঘাতী হামলার দাবি করে আসছে ইরান। এ কারণে এমনিতে তাঁদের স্বজনেরা উৎকণ্ঠায় রয়েছেন।

মার্কিন কর্মকর্তারা অনেক বছর ধরে সতর্ক করে আসছেন, ফিটনেস অ্যাপসহ মোবাইল ফোনের কিছু অ্যাপ্লিকেশন অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করে। তাই প্রতিপক্ষের কাজে লাগতে পারে। গত মে মাসে রয়টার্স জানিয়েছিল, স্মার্টফোন বা অন্যান্য যন্ত্র থেকে সংগ্রহ করা বাণিজ্যিকভাবে পাওয়া অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য ব্যবহার করে মার্কিন সেনাদের লক্ষ্যবস্তু বানানো বা তাঁদের ওপর নজরদারি চালানো হয়েছে।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অপারেশনাল নিরাপত্তার কথা উল্লেখ করে যুদ্ধসংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ সতর্কতার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করছে পেন্টাগন। এ কারণে ইরানের হামলার অনেক দাবির বিষয়ে তারা মন্তব্য করা থেকে বিরত থেকেছে। পাশাপাশি যেসব ঘটনায় মার্কিন সেনারা আহত হয়েছেন, সেসব ঘটনার বিস্তারিত তথ্যও প্রকাশ করেনি।

কুপার বলেন, কোনো হামলার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হলে তা ইরানকে পরবর্তী হামলা চালাতে সহায়তা করতে পারে।

সেন্টকমপ্রধানের ভাষায়, ‘হামলার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে এলে, তা ইরানি বাহিনীর জন্য তাৎক্ষণিকভাবে আরও ভয়াবহ দ্বিতীয় দফার হামলা চালানোর সবুজ সংকেত হয়ে উঠতে পারে।’