এপস্টিনের সেই আলোচিত লিটল সেন্ট জেমস দ্বীপে কী আছে

এপস্টিনের দ্বীপ ছিল না সবার জন্য উন্মুক্তছবি: মার্কিন কংগ্রেসের হাউস ওভারসাইট কমিটির সৌজন্যে

যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসি থেকে প্রায় তিন হাজার কিলোমিটার দূরে ইউএস ভার্জিন আইল্যান্ড। এই দ্বীপের দক্ষিণ–পূর্বে রয়েছে সবুজে ঘেরা ছোট আরেকটি দ্বীপ। নাম লিটল সেন্ট জেমস।

৭২ একর আয়তনের দ্বীপটি ওপর থেকে দেখতে তারকা আকৃতির। সাদা বালু আর নারকেলগাছে ঘেরা সৈকতগুলো ছুঁয়ে দিয়ে যায় ক্যারিবীয় সাগরের নীল জলরাশি। দ্বীপে রয়েছে একটি পাহাড়। সেখান থেকে দেখা যায় আশপাশের নয়নাভিরাম দৃশ্য।

ওপর থেকে ধারণ করা ছবিতে চোখ বোলালে দেখা যায়, লিটল সেন্ট জেমসের উত্তরে রয়েছে নীল ছাদ দেওয়া কয়েকটি ভবন। দ্বীপজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে অবকাঠামো। এর মধ্যে চোখে পড়ে পশ্চিম দিকে আয়তাকার একটি সুইমিংপুল। আর পূর্বে একটি হেলিকপ্টার ওঠানামার স্থান।

দ্বীপের চারটি ভিলা
ছবি: মার্কিন কংগ্রেসের হাউস ওভারসাইট কমিটির সৌজন্যে

দৃশ্য দেখে আর এর প্রকৃতির বর্ণনা শুনলে বেশ স্বর্গীয় মনে হয়। তবে এই দ্বীপের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কুখ্যাত যৌন নিপীড়ক জেফরি এপস্টিনের নাম। লিটল সেন্ট জেমসের সঙ্গে নাম জড়িয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তিরও। সেখানে তাঁরা নারী ও অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের যৌন নিপীড়ন করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এই মেয়েদের কেউ কেউ ছিল ১২ বছরের শিশু।

নিউইয়র্ক টাইমসের খবরে বলা হয়েছে, দ্বীপটিতে সফর করা এক ব্যক্তি ২০১৪ সালে এপস্টিনকে পাঠানো ই–মেইলে লিখেছিলেন—‘আমোদের একটি রাতের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ...আপনার একেবারে ছোট মেয়েটি একটু দুষ্টু ছিল।’

আর বিবিসির খবর অনুযায়ী, যৌন নিপীড়ন থেকে বাঁচতে দুই মাইল সাঁতার কেটে সেন্ট টমাস দ্বীপে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরী।

এপস্টিনের দ্বীপের আয়তাকার সুইমিংপুল
ছবি: মার্কিন কংগ্রেসের হাউস ওভারসাইট কমিটির সৌজন্যে

এপস্টিনের দ্বীপ

এপস্টিন দ্বীপটি কিনেছিলেন ১৯৯৮ সালে—৮০ লাখ ডলারে। তখনো দ্বীপটি ছিল বেশ অভিজাত। সেখানে মূল একটি বাড়ি ছিল। ছিল অতিথিদের জন্য তিনটি কটেজ, একটি হেলিপ্যাড ও নৌযানের একটি ঘাট। এ ছাড়া ছিল দ্বীপের কর্মচারীদের জন্য থাকার জায়গা এবং লবণাক্ত পানি পানযোগ্য করার ব্যবস্থা।

২০১০ সাল নাগাদ লিটল সেন্ট জেমসকে নতুন করে সাজান এপস্টিন। প্রধান বাড়ি মেরামত করা হয়। নির্মাণ করা হয় এমন আরও তিনটি বাড়ি। একটি নতুন সুইমিংপুল আর পাথরের ঘর। তৈরি করা হয় বাক্সের আকৃতির একটি রহস্যময় ভবনও। সাদার ওপর নীল ডোরাকাটা ওই ভবনটি ৩ হাজার ৫০০ বর্গফুট এলাকাজুড়ে।

মার্কিন সম্প্রচারমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বর্গাকার ভবনটির তথ্যের নথি হাতে পেয়েছে তারা। তাদের কাছে এটি সংগীতকেন্দ্র বলে মনে হয়েছে। তবে নথিতে যেসব ভবনের তথ্য রয়েছে, সেগুলোর সঙ্গে বর্গাকার ওই ভবনের মিল নেই। ভবনটির কোনো জানালা নেই। এর নাম দেওয়া হয়েছিল ‘টেম্পল’ বা মন্দির।

২০২০ সালে ধারণ করা ছবি এবং গত ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের ওভারসাইট কমিটির ধারণ করা ছবিতে দেখা গেছে, দ্বীপটিতে ছিল আসবাবে সাজানো বড় বড় শোবার ঘর, বসার ঘর আর বাথরুম। ছিল দাঁতের চিকিৎসার জন্য হলুদ একটি চেয়ার। তবে এটি কী কাজে ব্যবহার করা হতো, তা নিয়ে ব্যাপক গুঞ্জন রয়েছে।

দ্বীপের বর্গাকার সেই রহস্যময় ভবন
ছবি: মার্কিন কংগ্রেসের হাউস ওভারসাইট কমিটির সৌজন্যে

কারা গিয়েছিলেন দ্বীপটিতে

এপস্টিনকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের প্রকাশিত নথিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের মতো বিশ্বনেতাসহ অনেক হোমরাচোমরার নাম রয়েছে। তাঁদের অনেকের নাম আবার নানা কুর্কীতির সঙ্গে জড়িয়েছে। যেমন যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রিন্স অ্যান্ড্রুকে মেঝেতে শোয়া এক নারীর সঙ্গে দেখা গেছে।

নথিতে আরও রয়েছে ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গ, ধনকুবের ইলন মাস্ক, অভিনেতা উডি অ্যালেন, ক্যাভিন স্পেসি, হলিউড চলচ্চিত্র প্রযোজক হার্ভে উইনস্টেইনের নাম। এর মধ্যে উইনস্টেইনের বিরুদ্ধে শতাধিক নারীকে ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন খ্যাতনামা অভিনেত্রীরাও।

এটা ঠিক যে নথিতে নাম থাকা মানেই অপরাধী হওয়া নয়। নথিতে যাঁদের নাম এসেছে, তাঁদের অনেকেই এপস্টিনের সঙ্গে বা তাঁর দ্বীপে কোনো ধরনের অপরাধে সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছেন। আবার এটাও ঠিক যে লিটল সেন্ট জেমস দ্বীপে এপস্টিন এবং তাঁর বান্ধবী গিলেন ম্যাক্সওয়েলই একমাত্র যৌন নিপীড়নকারী ছিলেন না।

দ্বীপের ভবনগুলোর একটি শোবার ঘর
ছবি: মার্কিন কংগ্রেসের হাউস ওভারসাইট কমিটির সৌজন্যে

এপস্টিনের অনেক ভুক্তভোগীর মধ্যে একজন ভার্জিনিয়া জিউফ্রে। তিনি গত বছরের এপ্রিলে আত্মহত্যা করেছিলেন। মৃত্যুর পর তাঁর স্মৃতিকথা প্রকাশ করা হয়েছিল। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, একজন পরিচিত প্রধানমন্ত্রীর (অন্য জায়গায় সাবেক মন্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে) হাতে তিনি ধর্ষণ শিকার হয়েছিলেন।

অন্যদের বর্ণনায়ও এমন তথ্য পাওয়া যায়। যেমন সারাহ র‍্যানসম। তাঁকে নাকি ছুটিতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে লিটল সেন্ট জেমস দ্বীপে নেওয়া হয়েছিল। নিজের লেখা বই ‘সাইলেন্সড নো মোর: সারভাইভিং মাই জার্নি টু হেল অ্যান্ড ব্যাক’ বইয়ে এমন অভিযোগই করেছেন র‍্যানসম। তিনি বলেন, নিপীড়নের কথা প্রকাশ করলে হত্যার হুমকি দিয়েছিলেন এপস্টিন।

আলোচিত সেই চেয়ার
ছবি: মার্কিন কংগ্রেসের হাউস ওভারসাইট কমিটির সৌজন্যে

লিটল সেন্ট জেমসের কী হবে

সংবাদমাধ্যম এনপিআরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের মে মাসে লিটল সেন্ট জেমস এবং এর উত্তরে গ্রেট সেন্ট জেমস—দুই দ্বীপই স্টিফেন ডেকঅফ নামক এক মার্কিন অর্থলগ্নিকারীর কাছে বিক্রি করা হয়েছে। তিনি এই দুটি দ্বীপ ৬ কোটি ডলারে কিনে নিয়েছিলেন।

জেফরি এপস্টিনের দ্বীপ লিটল সেন্ট জেমস
ছবি: মার্কিন কংগ্রেসের হাউস ওভারসাইট কমিটির সৌজন্যে

আপাতত পরিকল্পনা হলো—এই দ্বীপগুলোকে একসঙ্গে নিয়ে একটি ক্যারিবীয় প্রমোদকেন্দ্র বানানো। ইউএস ভার্জিন আইল্যান্ডসের বাসিন্দা ডেকঅফ বলেন, এই প্রমোদকেন্দ্র নির্মাণের মাধ্যমে দ্বীপটির কলঙ্কিত ইতিহাস বদলে যাবে। এটি একটি বিশ্বমানের পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে নতুন করে জন্ম নেবে।