যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী এমন এক সময়ে এসেছে, যখন দেশটির রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজন প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। দলীয় ও আঞ্চলিক বিভক্তি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের সবচেয়ে তীব্র অভ্যন্তরীণ সংকটগুলোর সঙ্গে তুলনা করা যায়।
রিপাবলিকান (লাল) ও ডেমোক্র্যাট (নীল)—এ দুই রাজনৈতিক শিবিরের দ্বন্দ্ব এখন শুধু নির্বাচনী রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নেই; তা ছড়িয়ে পড়েছে শিক্ষা, অভিবাসন, নাগরিক অধিকার, সংস্কৃতি, এমনকি স্বাধীনতা দিবসের মতো জাতীয় আয়োজনেও।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনীতি এই বিভাজনকে আরও গভীর করেছে। এমনকি এই ঐতিহাসিক বার্ষিকী উদ্যাপনও দেশটিকে পরিচিত দুই বিরোধী শিবিরে ভাগ করে দিয়েছে।
কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ সংঘাত পরিমাপ করা কঠিন হলেও বিভিন্ন সূচক একই ইঙ্গিত দিচ্ছে। রাজ্যভেদে নীতিগত দূরত্ব বেড়েছে, কংগ্রেসে দ্বিদলীয় সহযোগিতা প্রায় অদৃশ্য, রাজনৈতিক সহিংসতার ঝুঁকি বেড়েছে এবং ট্রাম্প ও ডেমোক্র্যাট নেতৃত্বের সংঘাতও অব্যাহত আছে। যুক্তরাষ্ট্র যে আবারও গভীর রাজনৈতিক মেরুকরণের একটি পর্যায়ে পৌঁছেছে, এসব তারই ইঙ্গিত।
এর আগেও যুক্তরাষ্ট্র তীব্র উত্তেজনার সময় পার করেছে। তবে গৃহযুদ্ধের সময়টি বাদ দিলে দেশটি সব সময়ই তার মতপার্থক্যগুলো সামাল দেওয়ার উপায় খুঁজে পেয়েছে, যদিও সেগুলোর সব কটির স্থায়ী সমাধান করতে পারেনি। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, বিভাজন আরও তীব্র এবং অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে।
তবে ইতিহাস বলছে, এমন বিভাজন দেশটির জন্য নতুন নয়। এর আগেও যুক্তরাষ্ট্র তীব্র উত্তেজনাকর সময় পার করেছে। তবে গৃহযুদ্ধের সময়টি বাদ দিলে দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব সব সময়ই তাঁদের মতপার্থক্য সামাল দেওয়ার উপায় খুঁজে পেয়েছেন। অবশ্য সেসবের স্থায়ী সমাধান করতে পারেনি। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, বিভাজন আরও তীব্র ও অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে।
এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভূমিকা। পূর্বসূরিদের তুলনায় সম্ভবত ট্রাম্পই এমন একজন প্রেসিডেন্ট, যিনি দেশের বিদ্যমান মতপার্থক্যকে আরও উসকে দেওয়াকেই নিজের রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে বিবেচনা করেছেন।
ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ড স্কুল অব পাবলিক পলিসির সাবেক ডিন ডোনাল্ড কেটল বলেছেন, ‘এবারের পরিস্থিতির ভিন্নতা হলো, শুধু যে মৌলিক বিভাজন রয়েছে তা-ই নয়, বরং সেই বিভাজনগুলো দেশের সর্বোচ্চ নেতা ইচ্ছাকৃতভাবে আরও বাড়িয়ে তুলছেন।’
ইতিহাসজুড়ে মতপার্থক্য
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে দীর্ঘস্থায়ী কোনো রাজনৈতিক ‘স্বর্ণযুগ’ ছিল না। স্বাধীনতার পর থেকেই দেশটি আঞ্চলিক, অর্থনৈতিক ও বর্ণগত টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। তবে কিছু সময় সেই মতপার্থক্য জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ গৃহযুদ্ধ।
এবারের পরিস্থিতির ভিন্নতা হলো, শুধু যে মৌলিক বিভাজন রয়েছে তা-ই নয়, বরং সেই বিভাজনগুলো দেশের সর্বোচ্চ নেতাই ইচ্ছাকৃতভাবে আরও বাড়িয়ে তুলছেন।ডোনাল্ড কেটল, সাবেক ডিন, ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ড স্কুল অব পাবলিক পলিসি
১৮৪০ ও ১৮৫০-এর দশকে দাসপ্রথাকে কেন্দ্র করে উত্তর ও দক্ষিণের বিরোধ এতটাই তীব্র হয়ে উঠেছিল যে শেষ পর্যন্ত গৃহযুদ্ধ অনিবার্য হয়ে দেখা দিয়েছিল। সেই সংঘাত শুধু রাজনীতিকেই নয়, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক দলগুলোকেও বিভক্ত করে দেয়। গৃহযুদ্ধের পরও উত্তেজনা থামেনি। পুনর্গঠন (রিকনস্ট্রাকশন) পর্ব শেষ হলে দক্ষিণের রাজ্যগুলোয় জিম ক্রো বর্ণবৈষম্যমূলক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার আবারও ব্যাপকভাবে সংকুচিত হয়।
জিম ক্রো হলো ১৮৭৭ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোয় চালু থাকা বর্ণবাদী আইন ও সামাজিক ব্যবস্থা। শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে কঠোর জাতিগত বিচ্ছিন্নতা বজায় রাখতে এসব আইন তৈরি করা হয়েছিল।
ইউনিভার্সিটি অব কানেটিকাটের ইতিহাসবিদ ও ‘দ্য রাইজ অ্যান্ড ফল অব দ্য সেকেন্ড আমেরিকান রিপাবলিক’ বইয়ের লেখক মনীষা সিনহার মতে, ১৮৭৬ সালের স্বাধীনতার শতবর্ষেও প্রকৃত অর্থে জাতীয় পুনর্মিলনের উৎসব ছিল না। তাঁর ভাষায়, সেই উদ্যাপন হয়েছিল এমন এক সময়ে, যখন দক্ষিণে কৃষ্ণাঙ্গদের নাগরিক অধিকার ধারাবাহিকভাবে খর্ব করা হচ্ছিল।
রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরই শুরু দলীয় সংঘাত
অনেক ইতিহাসবিদের মতে, বর্তমান সময়ের আগে আরও দুবার যুক্তরাষ্ট্র বড় ধরনের অভ্যন্তরীণ সংকটের মুখে পড়েছিল। দেশটির প্রথম বড় রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয় ১৮০০ সালের আশপাশে।
বর্তমান সময়ের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি তুলনা চলে ১৯৬০-এর দশকের। সে সময় নাগরিক অধিকার আন্দোলন, ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী গণ–আন্দোলন, সাংস্কৃতিক পরিবর্তন, বর্ণগত দাঙ্গা, উগ্র ডান ও বামপন্থী সহিংসতা এবং জন এফ কেনেডি, রবার্ট কেনেডি ও মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের হত্যাকাণ্ড—সব মিলিয়ে দেশটি দীর্ঘ সময় অস্থিরতার মধ্যে ছিল।
দেশের প্রতিষ্ঠাতা ব্যক্তিরা রাজনৈতিক দলের উত্থান কল্পনা না করলেও জর্জ ওয়াশিংটনের দুই মেয়াদ শেষ হওয়ার পর দ্রুত দুটি শিবির গড়ে ওঠে। একদিকে জন অ্যাডামস ও আলেকজান্ডার হ্যামিলটনের নেতৃত্বাধীন ফেডারেলিস্ট পার্টি, অন্যদিকে টমাস জেফারসন ও জেমস ম্যাডিসনের নেতৃত্বাধীন ডেমোক্র্যাটিক-রিপাবলিকান পার্টি। দলটি ফ্রান্সের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল।
পররাষ্ট্রনীতি, শুল্ক ও কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা নিয়ে বিরোধ দ্রুতই ব্যক্তিগত শত্রুতায় রূপ নেয়। জেফারসন পরে লিখেছিলেন, একসময় যাঁরা ঘনিষ্ঠ ছিলেন, তাঁরাও একে অপরকে এড়িয়ে চলতেন।
১৭৯৮ সালে অ্যাডামস প্রশাসনের এলিয়েন অ্যান্ড সেডিশন অ্যাক্টস রাজনৈতিক উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছিলে। সরকারবিরোধী মত প্রকাশের অভিযোগে সংবাদপত্র সম্পাদক ও একজন কংগ্রেস সদস্য পর্যন্ত বিচারের মুখোমুখি হন। অনেক গবেষকের মতে, এটি ছিল রাজনৈতিক বিরোধীদের রাষ্ট্রের জন্য হুমকি হিসেবে উপস্থাপনের প্রথম বড় নজির।
ব্রাউন ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক কোরে ব্রেটস্নাইডার তাঁর ‘দ্য প্রেসিডেন্টস অ্যান্ড দ্য পিপল’ বইয়ে লিখেছেন, ‘এসব আইন মিলিতভাবে নাগরিকদের দুই ভাগে বিভক্ত করেছিল। একদিকে প্রেসিডেন্টের প্রতি অনুগত ও শ্রদ্ধাশীল নাগরিক, অন্যদিকে অবিশ্বস্ত বিরোধী শিবির।’
ট্রাম্পের রাজনীতিতে অতীতের কয়েকজন বিতর্কিত প্রেসিডেন্টের বৈশিষ্ট্য একসঙ্গে দেখা যায়। জন অ্যাডামসের মতো তিনি বিরোধীদের অ-আমেরিকান হিসেবে উপস্থাপন করেন, উড্রো উইলসনের মতো অভিবাসীবিরোধী ও বর্ণগত ক্ষোভকে উসকে দেন এবং রিচার্ড নিক্সনের মতো প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার চেষ্টা করেন।কোরে ব্রেটস্নাইডার, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, ব্রাউন ইউনিভার্সিটি
তবে ১৮০০ সালে জেফারসন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর ওই সব আইনের মেয়াদ শেষ হলে উত্তেজনা কমে আসে। কিন্তু ১৮১২ সালের যুদ্ধের সময় ফেডারেলিস্ট ও ডেমোক্র্যাটিক-রিপাবলিকানদের দ্বন্দ্ব আবারও বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছেছিল। ফেডারেলিস্টরা ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে যুদ্ধের এতটাই বিরোধিতা করেছিল, দলের তিনজন উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় গভর্নর সেনা পাঠাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। এমনকি ১৮১৪ সালের এক সম্মেলনে দলটির কর্মীরা বিচ্ছিন্ন হওয়ার ইঙ্গিতও দিয়েছিলেন, যা দলটির দ্রুত পতন ডেকে আনে।
ষাটের দশকের অস্থিরতা
বর্তমান সময়ের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি তুলনা করা যায় ১৯৬০-এর দশকের। সে সময় নাগরিক অধিকার আন্দোলন, ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী গণ–আন্দোলন, সাংস্কৃতিক পরিবর্তন, বর্ণগত দাঙ্গা, উগ্র ডান ও বামপন্থী সহিংসতা এবং জন এফ কেনেডি, রবার্ট কেনেডি ও মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের হত্যাকাণ্ড—সব মিলিয়ে দেশটি দীর্ঘ অস্থিরতার মধ্য দিয়ে গিয়েছিল।
দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প নিজেকে পুরো জাতির প্রেসিডেন্টের চেয়ে নিজের রাজনৈতিক জোটের নেতা হিসেবেই বেশি উপস্থাপন করেছেন এবং তাঁর বিপক্ষে ভোট দেওয়া রাজ্য ও শহরগুলোর বিরুদ্ধে তিনি নজিরবিহীন উপায়ে ফেডারেল ক্ষমতা ব্যবহার করার চেষ্টা করেছেন বলে সমালোচকেরা অভিযোগ করেন।
সেই সংকট ১৯৭০-এর দশকেও গড়ায়। প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনকে ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির ঘটনা ফাঁস হলে পদত্যাগ করতে হয়েছিল। তবে ১৯৭৬ সালের দ্বিশতবার্ষিকী উদ্যাপনে অন্তত জাতীয় পুনর্মিলনের আহ্বান ছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে তেমন কোনো ঐকমত্য বা পুনর্মিলনের বার্তা প্রায় নেই বললেই চলে।
বর্তমান সংকট কেন আলাদা
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভেদ আছে।
রক্ষণশীল গবেষণাপ্রতিষ্ঠান আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের সোশ্যাল, কালচারাল অ্যান্ড কনস্টিটিউশনাল স্টাডিজের পরিচালক ইউভাল লেভিন বলেন, ‘আমার মতে, আজ আমরা অ্যাডামস/জেফারসনের সময়, এমনকি ১৯৬০–এর দশকের শেষ দিকের মতো মোটেই এতটা বিভক্ত নই। আমরা এত দীর্ঘ সময় ধরে ৫০/৫০–এর রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাস করছি। কোনো দলই নির্বাচনে জিতলেও দীর্ঘ মেয়াদে একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারছে না।’
২০২৬ ও ২০২৮ সালের নির্বাচন অনেকটাই নির্ধারণ করবে ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার কী হবে। ভোটাররা যদি তাঁর রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করেন, তাহলে ইতিহাস তাঁকে হয়তো একটি প্রভাবশালী কিন্তু ক্ষণস্থায়ী অধ্যায় হিসেবে দেখবে। আর যদি তাঁর রাজনৈতিক পদ্ধতিই নতুন স্বাভাবিক হয়ে ওঠে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব আরও দীর্ঘস্থায়ী হবে।ডগলাস ব্রিংকলে, ইতিহাসবিদ
অন্যরা মনে করেন, বর্তমান বিভাজনের মূল পার্থক্য আদর্শগত। অভিবাসন, এলজিবিটিকিউ অধিকার, গর্ভপাত, শিক্ষা, বৈচিত্র্যনীতি, বই নিষিদ্ধ করা কিংবা নাগরিক পরিচয়ের মতো প্রশ্নে দুই রাজনৈতিক শিবিরের অবস্থান এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি বিপরীতমুখী। অর্থনৈতিক নীতিতেও স্বাস্থ্যসেবা, পরিবেশ, করব্যবস্থা এবং ফেডারেল সরকারের ভূমিকা নিয়ে তাদের মধ্যে বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে।
এর প্রভাব জাতীয় রাজনীতির গণ্ডি ছাড়িয়ে অঙ্গরাজ্যগুলোর নীতিতেও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। লাল ও নীল রাজ্যের মধ্যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক নীতির ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে।
ট্রাম্পের ভূমিকা
অনেক বিশ্লেষকের মতে, বর্তমান পরিস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভূমিকা।
ডোনাল্ড কেটলের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে ট্রাম্প মার্কিন রাজনীতির কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে ওঠার আগেই এই দুই রাজনৈতিক জোটের মধ্যে দূরত্ব বাড়ছিল। তবে ট্রাম্প তাদের আরও বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার শক্তিকে অনেক বেশি তীব্র করে তুলেছেন।
বিশেষ করে দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প নিজেকে পুরো জাতির প্রেসিডেন্টের চেয়ে নিজের রাজনৈতিক জোটের নেতা হিসেবেই বেশি উপস্থাপন করেছেন এবং তাঁর বিপক্ষে ভোট দেওয়া রাজ্য ও শহরগুলোর বিরুদ্ধে তিনি নজিরবিহীন উপায়ে ফেডারেল ক্ষমতা ব্যবহার করার চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ সমালোচকদের।
ট্রাম্প ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত রাজ্য ও শহরগুলোর কোথাও ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন, কোথাও স্থানীয় কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত, আবার কোথাও অর্থায়ন বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছেন। এসব পদক্ষেপ আদালতের বাধার মুখে পড়লেও রাজনৈতিক উত্তেজনা বরং বাড়িয়েছে।
একই সঙ্গে ট্রাম্প, স্টিফেন মিলারসহ তাঁর সহযোগীরা ডেমোক্র্যাট নেতাদের বিরুদ্ধে প্রায়ই ‘দেশদ্রোহ’, ‘বিদ্রোহ’ ও ‘মৃত্যুদণ্ডযোগ্য রাষ্ট্রদ্রোহমূলক আচরণে’ জড়িত থাকার অভিযোগ তুলে থাকেন।
ইতিহাসবিদ ডগলাস ব্রিংকলে বলেন, ট্রাম্পের বিপক্ষে ভোট দেওয়া অঞ্চলগুলোর বিরুদ্ধে নেওয়া এসব পদক্ষেপই প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর গণতান্ত্রিক নীতির প্রতি সবচেয়ে ‘জঘন্য’ হুমকি। একজন প্রেসিডেন্ট শুধু তাঁকে ভোট দেয়নি বলে রাজ্যগুলোকে শাস্তি দিচ্ছেন—এ ধারণা ভয়াবহ। এটি কর্তৃত্ববাদের সংজ্ঞার সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী কোরে ব্রেটস্নাইডার এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ট্রাম্পের রাজনীতিতে অতীতের কয়েকজন বিতর্কিত প্রেসিডেন্টের বৈশিষ্ট্য একসঙ্গে দেখা যায়। জন অ্যাডামসের মতো তিনি বিরোধীদের অ-মার্কিন হিসেবে উপস্থাপন করেন, উড্রো উইলসনের মতো অভিবাসীবিরোধী ও বর্ণগত ক্ষোভকে উসকে দেন এবং রিচার্ড নিক্সনের মতো প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার চেষ্টা করেন।
একইভাবে ইতিহাসবিদ মনীষা সিনহা মনে করেন, যখন কোনো সরকার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বা নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর নাগরিকত্ব ও বৈধতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করতে শুরু করে, তখন সেটি অনির্বাচিত ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের একটি বড় লক্ষণ।
সামনে কী অপেক্ষা করছে
যুক্তরাষ্ট্র যখন ২৫০ বছরের যাত্রা শুরু করেছে, তখন সামনে যে বড় প্রশ্নটি এসেছে, তা হলো—ট্রাম্পের সংঘাতনির্ভর রাজনীতি কি ভবিষ্যতের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিণত হবে?
২০২৮ সালের সম্ভাব্য ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন (এমএজিএ) আন্দোলনের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছেন। অন্যদিকে রিপাবলিকান রাজনীতিতেও ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভাষা ও কৌশল বজায় রাখার চাপ থাকবে বলে ধারণা করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
ইতিহাসবিদ ডগলাস ব্রিংকলে বলেন, ২০২৬ ও ২০২৮ সালের নির্বাচন অনেকটাই নির্ধারণ করবে ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার কী হবে। ভোটাররা যদি তাঁর রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করেন, তাহলে ইতিহাস তাঁকে হয়তো একটি প্রভাবশালী কিন্তু ক্ষণস্থায়ী অধ্যায় হিসেবে দেখবে। আর যদি তাঁর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিই নতুন স্বাভাবিক হয়ে ওঠে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব আরও দীর্ঘস্থায়ী হবে।