জাতিসংঘে ইরানের প্রেসিডেন্টের ভাষণ শুরুর সময়ে বেরিয়ে গেল মার্কিন প্রতিনিধিদল

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের ভাষণের শুরুতে মার্কিন প্রতিনিধিদল সভাকক্ষ থেকে বের হয়ে যায়। নিউইয়র্কে, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ছবি: রয়টার্স

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের চলমান অধিবেশনে ভাষণ দেওয়ার সময় বের হয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদল। আজ বুধবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম বার্ষিক অধিবেশনের দ্বিতীয় দিনে এ ঘটনা ঘটে। আগের দিন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অধিবেশনের উদ্বোধনী ভাষণের সময় একজন ছাড়া ইরানের প্রতিনিধিদলের সব কর্মকর্তা বের হয়ে গিয়েছিলেন।

ভাষণে পেজেশকিয়ান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধে ইরান আত্মসমর্পণ করবে না। তবে সংঘাত অবসানে কূটনীতিতে বিশ্বাস করে ইরান।

যুদ্ধের আগে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বিশ্ববাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এটি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনার অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।

পেজেশকিয়ান বলেন, ‘সবাই হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে সুবিধা নেবে, অথচ আমাদেরকেই এ পথে জাহাজ চলাচল থেকে বঞ্চিত করা হবে—এটা হতে পারে না। এখানে শত্রুভাবাপন্ন নৌবহরের স্থায়ী উপস্থিতি এবং যুদ্ধের বিস্তার কোনোভাবেই শান্তি আনবে না।’

গতকাল মঙ্গলবার সাধারণ পরিষদের ৮১তম বার্ষিক অধিবেশনের উদ্বোধনী ভাষণে ইরানকে ‘নিশ্চিহ্ন’ করে দেওয়ার হুমকি দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘তেহরানের সঙ্গে এমন কোনো চুক্তি হবে কি না, যার মাধ্যমে ইরান নিজেকে “পুনর্গঠন করে আগের চেয়েও অনেক শক্তিশালী দেশ হয়ে উঠতে পারে”, নাকি “আমি ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে ধ্বংস করে দেব”—এ বিষয়ে আমাকে একটি বড় সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’

ট্রাম্পের বক্তৃতায় ইরান প্রসঙ্গ আসার সঙ্গে সঙ্গে দেশটির প্রতিনিধিদল সভাকক্ষ থেকে বেরিয়ে যায়। শুধু একজন প্রতিনিধি তাঁর আসনে বসে ছিলেন।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দিচ্ছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। নিউইয়র্ক, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

বোমা নয়, ইরানের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক শক্তি প্রয়োজন

আজ ভাষণে পারমাণবিক ইস্যুতে পেজেশকিয়ান বলেন, ইরানের পারমাণবিক বোমা নয়, শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক শক্তি প্রয়োজন।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি হামলা শুরুর সময় ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বারবার ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করাকে তাঁদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেন।

জাতিসংঘে ভাষণে পেজেশকিয়ান বলেন, ‘শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তি আমাদের দেশের উন্নয়নেরই একটি অংশ। পারমাণবিক প্রযুক্তি শুধু কয়েকটি দেশের হাতে অল্প কয়েকজনের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে থাকবে, তা ইরান গ্রহণযোগ্য মনে করে না।’

যুদ্ধ বন্ধে ওয়াশিংটন ও তেহরানের আলোচনায় ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত একটি বড় বিরোধের বিষয় হয়ে আছে। ট্রাম্প জোর দিয়ে বলে আসছেন, ইরানকে এ মজুত ছেড়ে দিতে হবে।

ইরানের দাবি, তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে। তবে পশ্চিমা দেশগুলো ও ইসরায়েলের সন্দেহ, পারমাণবিক বোমা তৈরির সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যে ইরান এ কর্মসূচি চালাচ্ছে।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বক্তব্য দেওয়ার সময় প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছবি তুলে ধরছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। নিউইয়র্কে, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

পেজেশকিয়ানের হাতে খামেনি ও নিহত শিশুদের ছবি

ভাষণের শুরুতে ইরানের প্রেসিডেন্ট একটি ছবি তুলে ধরেন। এতে দেশটির প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির প্রতিকৃতি ছিল। যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের হামলা শুরুর প্রথম দিন তেহরানে নিজের কম্পাউন্ডে খামেনি নিহত হন।

এরপর পেজেশকিয়ান হামলায় নিহত শিশুদের ছবি তুলে ধরেন। একটি স্কুলে বিমান হামলায় এসব শিশু নিহত হয়েছিল।

ইরানবিষয়ক জাতিসংঘের একটি তথ্য অনুসন্ধান মিশন চলতি মাসের শুরুতে বলেছে, ইরানের একটি স্কুল ও একটি ক্রীড়া স্থাপনায় দুটি সামরিক হামলার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের জড়িত থাকার বিষয়ে তাদের কাছে বিশ্বাস করার মতো যথেষ্ট কারণ রয়েছে। মিশনটি বলেছে, এসব হামলা যুদ্ধাপরাধের শামিল।

ভাষণ দেওয়ার সময় নিহত শিশুদের ছবি তুলে ধরছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। নিউইয়র্কে, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

‘আমরাই সন্ত্রাসবাদের শিকার’

পেজেশকিয়ান তাঁর ভাষণের শুরুতে জাতিসংঘে আগের দিন দেওয়া ট্রাম্পের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টানেন। তিনি বলেন, ‘আপনাদের সামনে দেওয়ার জন্য গতকাল আমি একটি ভাষণ প্রস্তুত করেছিলাম। (কিন্তু) যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আমাদের সন্ত্রাসী হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অথচ আমরাই সন্ত্রাসবাদের শিকার।’

গতকালের ভাষণে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে তাঁর যুদ্ধের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছিলেন। তিনি বলেন, ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে, তা তিনি ঠেকিয়েছেন। একই সঙ্গে সতর্ক করে বলেন, সংঘাত বন্ধে কোনো সমঝোতা না হলে তিনি ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে নিশ্চিহ্ন’ করে দিতে পারেন।