মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর এবার তাঁর প্রতি জনসমর্থন সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে। জ্বালানিপণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি এবং ইরান নিয়ে মানুষের মনে অসন্তোষই এর মূল কারণ। রয়টার্স/ইপসোস-এর করা এক নতুন জনমত জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে।
চার দিন ধরে চালানো এ জরিপ শেষ হয়েছে গত সোমবার। এতে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের মাত্র ৩৬ শতাংশ মানুষ ট্রাম্পের বর্তমান কর্মকাণ্ডে সন্তুষ্ট। গত সপ্তাহেও এই হার ছিল ৪০ শতাংশ।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে আগ্রাসন শুরু করে। এর পর থেকেই মার্কিন মুলুকে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে শুরু করে পেট্রলের দাম। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায়। অর্থনীতি পরিচালনা ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে তাঁর প্রতি জনগণের আস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
জরিপে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে মাত্র ২৫ শতাংশ জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে ট্রাম্পের ভূমিকায় সমর্থন দিয়েছেন। অথচ ২০২৪ সালের নির্বাচনে এই ইস্যুই ছিল তাঁর প্রচারের কেন্দ্রবিন্দুতে।
দেশের অর্থনীতি পরিচালনায় ট্রাম্পের ওপর আস্থা রাখছেন মাত্র ২৯ শতাংশ মানুষ, যা তাঁর আগের ও বর্তমান মেয়াদের রেকর্ড অনুযায়ী সর্বনিম্ন। এমনকি তাঁর পূর্বসূরি জো বাইডেনের আমলের যেকোনো সময়ের চেয়েও এই হার কম। অথচ অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ভোটারদের দুশ্চিন্তাই ছিল ডেমোক্র্যাটদের পরাজয়ের অন্যতম বড় কারণ।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই জরিপ ইঙ্গিত দিচ্ছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন জনগণের প্রবল বিরোধিতার মুখে পড়েছেন। এ বিষয়ে রিপাবলিকান রাজনৈতিক কৌশলবিদ ও আইনজীবী আমান্ডা মাক্কি বলেন, প্রেসিডেন্ট মানুষের কষ্ট অনুভব করতে পারছেন কি না, তাঁদের জন্য সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে কি না—এসব বিষয় জনগণকে জানানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মানুষের কষ্ট যে প্রেসিডেন্ট অনুভব করছেন এবং দ্রুতই এর সমাধান আসছে—এটি জনগণকে জানানো জরুরি।
যুদ্ধ নিয়ে উদ্বেগ
নিজের দল রিপাবলিকান পার্টির ভেতরে ট্রাম্পের অবস্থান এখনো বেশ মজবুত। প্রতি পাঁচজন রিপাবলিকানের মধ্যে মাত্র একজন তাঁর সামগ্রিক কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেছেন; গত সপ্তাহে এই হার ছিল প্রতি সাতজনে একজন। তবে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে তাঁর ব্যর্থতা নিয়ে দলের সমর্থকদের মধ্যেও অস্বস্তি বাড়ছে। গত সপ্তাহে যেখানে ২৭ শতাংশ রিপাবলিকান এ নিয়ে অসন্তুষ্ট ছিলেন, তা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪ শতাংশে।
দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার শুরুর দিনগুলোতে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার গড় হার ছিল ৪৭ শতাংশ, যা গত গ্রীষ্ম থেকে মোটামুটি ৪০ শতাংশের আশপাশে ঘুরপাক খাচ্ছিল। তবে এখনো তাঁর জনপ্রিয়তা প্রথম মেয়াদের সর্বনিম্ন ৩৩ শতাংশের চেয়ে কিছুটা বেশি আছে। এমনকি এটি তাঁর পূর্বসূরি জো বাইডেনের মেয়াদের সর্বনিম্ন ৩৫ শতাংশের চেয়ে সামান্য বেশি।
‘অহেতুক যুদ্ধে’ যোগ না দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসা ট্রাম্পের জন্য ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতি বদলে দিচ্ছে। জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ৩৫ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ইরানে হামলার পক্ষে মত দিয়েছেন, যা গত সপ্তাহের ৩৭ শতাংশ থেকে কমেছে। বিপরীতে হামলার বিপক্ষে মত দিয়েছেন ৬১ শতাংশ নাগরিক, যা গত সপ্তাহে ছিল ৫৯ শতাংশ।
রয়টার্স/ইপসোসের আগের জরিপগুলো চালানো হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রথম দফার হামলার পরপরই। সে সময় অনেক মার্কিন উদ্ভূত পরিস্থিতি সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত ছিলেন না।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১ মার্চের রয়টার্স/ইপসোস জরিপে দেখা গিয়েছিল, ২৭ শতাংশ উত্তরদাতা হামলার পক্ষে এবং ৪৩ শতাংশ বিপক্ষে মত দিয়েছেন। ২৯ শতাংশ এ ব্যাপারে অনিশ্চিত ছিলেন।
জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ৪৬ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, ইরান যুদ্ধ দীর্ঘ মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রকে আরও অনিরাপদ করে তুলবে। মাত্র ২৬ শতাংশ মানুষ মনে করেন, এতে দেশ নিরাপদ হবে। আর বাকিরা মনে করেন, এর উপকার হবে যৎসামান্য।
কয়েক দিন ধরে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিচ্ছেন, যুদ্ধ শিগগিরই শেষ হয়ে আসতে পারে। তবে ইরান আলোচনার বিষয়টি অস্বীকার করেছে। এদিকে রয়টার্স গতকাল মঙ্গলবার এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ওয়াশিংটন মধ্যপ্রাচ্যে আরও হাজার হাজার অতিরিক্ত সেনা পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন গ্যাসোলিনের দাম প্রায় এক ডলার বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এর প্রভাব গোটা অর্থনীতিতে পড়বে। বর্তমানে ৬৩ শতাংশ মার্কিন নাগরিক দেশের অর্থনীতিকে ‘দুর্বল’ বলে মনে করছেন। এর মধ্যে ৪০ শতাংশ রিপাবলিকান ও ৮৪ শতাংশ ডেমোক্র্যাট।
রয়টার্স/ইপসোস অনলাইনে দেশজুড়ে এ জরিপ পরিচালনা করে। জরিপে ১ হাজার ২৪ জন প্রাপ্তবয়স্ক মার্কিন নাগরিক অংশ নেন।