গুগলকে বিজ্ঞাপন ব্যবসার নিয়ম শিথিল করা ও পর্যবেক্ষক নিয়োগের নির্দেশ আদালতের
অনলাইন বিজ্ঞাপনের বাজারে একচেটিয়া আধিপত্য ধরে রাখার অভিযোগে বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান গুগলের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের একটি ফেডারেল আদালত। রায়ে গুগলকে বড় ধরনের ভাঙনের হাত থেকে রেহাই দেওয়া হলেও তাদের একচেটিয়া বিজ্ঞাপন ব্যবসা বন্ধে বেশ কিছু কঠোর শর্তজুড়ে দেওয়া হয়েছে।
আদালতের বিচারক গুগলকে অনলাইন বিজ্ঞাপন নিলাম পরিচালনার কিছু নিয়ম শিথিল করার নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি যাতে বাজারে প্রতিযোগিতার পরিবেশ নষ্ট করতে না পারে, সেটি তদারক করতে একজন অভ্যন্তরীণ পর্যবেক্ষক নিয়োগ দিতে বলা হয়েছে।
গত বছর গুগলের মূল প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেটের আয়ের প্রায় ৭৩ শতাংশই এসেছিল বিজ্ঞাপনী খাত থেকে। আদালতের রায় অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল বিজ্ঞাপনে বার্ষিক ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ৪২৪ বিলিয়ন ডলার। এটি আগামী বছরের মধ্যে বেড়ে প্রায় ৬০৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ এবং দেশটির বেশ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যের যৌথভাবে করা মামলায় ভার্জিনিয়ার আলেকজান্দ্রিয়ার ডিস্ট্রিক্ট আদালতের বিচারক লিওনি ব্রিঙ্কেমা গতকাল বুধবার এ রায় দেন। মামলায় গুগলের বিরুদ্ধে একচেটিয়া বাজার দখলের মাধ্যমে বেআইনিভাবে প্রতিযোগিতার পরিবেশ নষ্ট করার অভিযোগ আনা হয়েছিল।
মামলায় বাদীপক্ষ গুগলের অনলাইন বিজ্ঞাপন ব্যবসা পুরোপুরি ভেঙে দেওয়ার আবেদন জানিয়েছিল। তবে দুই সপ্তাহ আগে ওই আবেদন খারিজ করে দেন বিচারক লিওনি ব্রিঙ্কেমা।
বিচারক তাঁর রায়ে বলেন, ২০২৫ সালের এপ্রিলে অনলাইন বিজ্ঞাপন প্রযুক্তির কিছু ক্ষেত্রে গুগলের অবৈধ একচেটিয়া আধিপত্যের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
ব্রিঙ্কেমা আরও বলেন, আদালতের দেওয়া সিদ্ধান্তের ফলে গুগলের একচেটিয়া ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্ত বিজ্ঞাপন প্রযুক্তির বাজারে প্রতিযোগিতার সুযোগ তৈরি হবে। গুগল যাতে আবার বাজারে প্রতিযোগিতার পরিবেশ নষ্ট না করতে পারে, তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। তবে গুগল বলেছে, এ রায়ের সঙ্গে তারা একমত নয়। রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হবে।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তাদের ব্যবসা ভেঙে দেওয়া হলে ছোট ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সাধারণ গ্রাহকদের কাছে পৌঁছানো অনেক কঠিন হয়ে পড়ত।
অন্যদিকে, মার্কিন বিচার বিভাগের অ্যাসোসিয়েট অ্যাটর্নি জেনারেল স্ট্যানলি উডওয়ার্ড জুনিয়র এক বিবৃতিতে রায়টিকে বাজারে প্রতিযোগিতা ফিরিয়ে আনার লড়াইয়ে একটি ‘বড় জয়’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, রায়টি পর্যালোচনা করে আইনি পদক্ষেপের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এর আগে গত বছরের সেপ্টেম্বরে আরেক মার্কিন বিচারক অনলাইন সার্চ ইঞ্জিনের ব্যবসায় প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি করতে গুগলকে কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। মার্কিন বিচার বিভাগ চেয়েছিল, গুগল যেন ক্রোম ব্রাউজার বিক্রি করে দেয়। তবে বিচারক সেবারও বহুল ব্যবহৃত ব্রাউজারটি বিক্রি করে দেওয়ার নির্দেশ দেননি। কিন্তু গুগলকে নির্দেশ দেন, তারা যেন একচেটিয়া চুক্তি (ক্রোম ব্রাউজার সংশ্লিষ্ট) আর না করে। পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে সার্চ–সংক্রান্ত তথ্য ভাগ করে নিতে বলেন বিচারক।
গত বছর গুগলের মূল প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেটের আয়ের প্রায় ৭৩ শতাংশই এসেছিল বিজ্ঞাপনী খাত থেকে। আদালতের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল বিজ্ঞাপনে বার্ষিক ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ৪২৪ বিলিয়ন ডলার, যা আগামী বছরের মধ্যে বেড়ে প্রায় ৬০৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, গুগলকে আগামী ছয় বছর এসব শর্ত মেনে চলতে হবে। অবশ্য মামলার বাদীদের চাওয়া ছিল ১৫ বছর।
মার্কিন সরকার চেয়েছিল, গুগল যেন তাদের বিজ্ঞাপন নিলাম করার মাধ্যম ‘অ্যাডএক্স’ বিক্রি করে দেয়। এ মাধ্যমে ওয়েবসাইটের মালিকেরা বিজ্ঞাপন দেখানোর জন্য গুগলকে ২০ শতাংশ ফি হিসেবে দেন। ব্যবহারকারী কোনো ওয়েবসাইটে ঢুকলে সেখানে কোন বিজ্ঞাপনটি দেখানো হবে, তা এ নিলামের মাধ্যমে ঠিক হয়।
সরকারের কথা ছিল, এ নিলাম ব্যবস্থা চালানোর জন্য গুগলকে আর বিশ্বাস করা যায় না। কিন্তু বিচারক ব্রিঙ্কেমা সরকারের সে দাবি মানেননি। তিনি বলেন, গুগলকে এ ব্যবসা বিক্রি করতে হবে না; বরং অন্য কোম্পানির বিজ্ঞাপন মাধ্যম যারা ব্যবহার করে, তাদেরও যদি অ্যাডএক্সের তাৎক্ষণিক নিলামে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়, তবে বাজারে আসল প্রতিযোগিতা ফিরে আসবে।
অবশ্য বিচারক সরকারের কিছু দাবি মেনে নিয়েছেন। যেমন কোনো ওয়েবসাইট যদি গুগলের বিজ্ঞাপন মাধ্যম ব্যবহার করে, তবে তাকে বাধ্যতামূলকভাবে গুগলের অ্যাডএক্স ব্যবহার করতে হবে, এমন নিয়ম আর চলবে না। এ ছাড়া বিজ্ঞাপন প্রকাশকেরা যেসব নিয়মের কারণে গুগলের প্রযুক্তি ব্যবহার করতে বাধ্য হতেন, সেসব নিয়মও গুগলকে বন্ধ করতে হবে।
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, গুগলকে আগামী ছয় বছর এসব শর্ত মেনে চলতে হবে। অবশ্য মামলার বাদীদের চাওয়া ছিল ১৫ বছর।