ডেমোক্র্যাট সিনেট প্রার্থী বাছাই
মিশিগানে আবদুল আল-সাইয়েদের জয়ের পরও ইসরায়েলপন্থী আইপ্যাক আলোচনায়, কিন্তু কেন
যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্রেটিক পার্টির সিনেটের প্রার্থী বাছাইয়ের প্রাথমিক নির্বাচনে (দলীয় প্রাইমারি) জয়ী হয়েছেন প্রগতিশীল জনস্বাস্থ্যকর্মী আবদুল আল-সাইয়েদ। তাঁর এ জয়কে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে প্রভাবশালী ইসরায়েলপন্থী লবিং সংগঠন আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটির (আইপ্যাক) জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইসরায়েলপন্থী গোষ্ঠীগুলো নির্বাচনী প্রচারে ছয় কোটি ডলারের বেশি ব্যয় করেও সফল হতে পারেনি। তাদের সমর্থিত প্রার্থী কংগ্রেস সদস্য হ্যালি স্টিভেন্সকে পরাজিত করে মিশিগানের এ আসনে প্রথম মুসলিম হিসেবে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন আবদুল আল-সাইয়েদ।
ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার ১২ ঘণ্টার বেশি সময় পর গতকাল বুধবার যুক্তরাষ্ট্র–ভিত্তিক বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) ও অন্যান্য প্রধান গণমাধ্যম আল-সাইয়েদের জয়ের খবর নিশ্চিত করে।
আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনে আল-সাইয়েদ রিপাবলিকান দলের সাবেক কংগ্রেস সদস্য মাইক রজার্সের মুখোমুখি হবেন। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনের মধ্যে মিশিগানের এ আসনটি অন্যতম।
গত মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনের ফল আইপ্যাকের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ডেমোক্র্যাটদের দলীয় প্রাথমিক বাছাইয়ে আল-সাইয়েদকে হারাতে সবচেয়ে সক্রিয় ভূমিকা নেয় সংগঠনটি। ইসরায়েলপন্থী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে শুধু আইপ্যাকই স্টিভেন্সের প্রচারে তিন কোটি ডলারের বেশি ব্যয় করেছে।
আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনে আল-সাইয়েদ রিপাবলিকান দলের সাবেক কংগ্রেস সদস্য মাইক রজার্সের মুখোমুখি হবেন। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনের মধ্যে মিশিগানের এ আসনটি অন্যতম। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাকি মেয়াদে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ কোন দলের হাতে থাকবে, তা এ আসনের ফলই নির্ধারণ করে দিতে পারে।
মিসরীয় বংশোদ্ভূত আবদুল আল-সাইয়েদ নভেম্বরে জয়ী হলে তিনি হবেন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের প্রথম মুসলিম সিনেটর।
২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের পক্ষে ভোট দেওয়া দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্য মিশিগানের এই ফল মধ্যপ্রাচ্যের সংকট নিয়ে ডেমোক্রেটিক পার্টির নীতিতেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
আল-সাইয়েদ গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসনকে ‘জাতিগত নিধন’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, যেসব যুদ্ধে অর্থ ব্যয় করলে মূলত ইসরায়েলই লাভবান হয়, সেই অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন ও অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় করা উচিত।
কোনো প্রার্থীকে আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন না দেওয়া নিরপেক্ষ সংগঠন আরব আমেরিকান ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক মায়া বেরি প্রাথমিক বাছাইয়ে আল-সাইয়েদের জয়কে বড় ঘটনা বলে মন্তব্য করেছেন।
মায়া বেরি বলেন, নির্বাচনী প্রচারে কোনো নীতিগত আলোচনা ছাড়া শুধু আবদুল নামের একজন আরব–আমেরিকান মুসলিমকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা হয়েছে। ভোটাররা এ ধরনের নেতিবাচক প্রচারে প্রভাবিত হননি।
প্রচারের সময় স্টিভেন্স ও তাঁর সমর্থকেরা আল-সাইয়েদকে নারীবিদ্বেষী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেন। আরব–আমেরিকান অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, এর মাধ্যমে আরব পুরুষদের নিয়ে প্রচলিত নেতিবাচক ধারণাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করা হয়েছিল।
আল-জাজিরাকে মায়া বেরি বলেন, ‘মিশিগানের মানুষ যে এ ধরনের নোংরা রাজনীতি মেনে নেবে না, সেটা দেশের সবাই জানতে পারবে—এতে আমি খুবই আনন্দিত।’
প্রচারের সময় স্টিভেন্স ও তাঁর সমর্থকেরা আল-সাইয়েদকে নারীবিদ্বেষী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেন। আরব–আমেরিকান অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, এর মাধ্যমে আরব পুরুষদের নিয়ে প্রচলিত নেতিবাচক ধারণাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করা হয়েছিল।
স্টিভেন্স ইসরায়েলের একজন দৃঢ় সমর্থক। ২০২২ সালেও আইপ্যাকের সমর্থনে তিনি প্রগতিশীল ইহুদি আইনপ্রণেতা অ্যান্ডি লেভিনকে পরাজিত করেছিলেন।
মঙ্গলবারের এ ফলাফল ডেমোক্রেটিক পার্টির ইসরায়েলপন্থী অংশের জন্য সাম্প্রতিক আরেকটি নির্বাচনী ধাক্কা। কারণ, দলটির তৃণমূল সমর্থক এবং সামগ্রিকভাবে মার্কিন জনমতের একটি বড় অংশ এখন ইসরায়েল সম্পর্কে আগের তুলনায় বেশি সমালোচনামুখর।
জনমত জরিপে আল-সাইয়েদের জয়ের আভাস থাকলেও স্টিভেন্স প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ফল করেন। বিশেষ করে মিশিগানের সবচেয়ে বড় শহর ডেট্রয়েটে তিনি শক্ত অবস্থান গড়ে তোলেন। রাত বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তিনি আল-সাইয়েদের ব্যবধানও কমিয়ে আনেন। ফলে ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার পর কয়েক ঘণ্টা জয়-পরাজয় নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল।
গতকাল বুধবার সকালে দীর্ঘ অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে আল-সাইয়েদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, ‘মিশিগান...আমরা জিতেছি। যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী হতে পেরে আমি গর্বিত। এবার নভেম্বরে জয়ের পথে এগিয়ে চলুন।’
এপি আল–সাইয়েদের জয় নিশ্চিত করার পরপরই হ্যালি স্টিভেন্স তাঁকে অভিনন্দন জানান এবং সাধারণ নির্বাচনে সমর্থনের ঘোষণা দেন।
এক বিবৃতিতে স্টিভেন্স বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির মনোনয়ন জেতায় আবদুল আল-সাইয়েদকে অভিনন্দন। তিনি একজন চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা, রোডস স্কলার এবং নিবেদিতপ্রাণ মিশিগানবাসী। মাইক রজার্সের বিরুদ্ধে সাধারণ নির্বাচনে আমি তাঁকে সমর্থন করছি।’
প্রাইমারি থেকে কয়েক সপ্তাহ আগে সরে দাঁড়ানো অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতা ম্যালরি ম্যাকমরোও আল-সাইয়েদকে সমর্থন জানান।
এ ছাড়া প্রাইমারিতে স্টিভেন্সকে সমর্থন দেওয়া মিশিগানের গভর্নর গ্রেচেন হুইটমার এবং সিনেটর গ্যারি পিটার্সও বুধবার সাধারণ নির্বাচনে আল-সাইয়েদের প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেন।
ঐক্যের আহ্বান
এখন আল-সাইয়েদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ডেমোক্রেটিক পার্টিকে ঐক্যবদ্ধ করা। জয় নিশ্চিত হওয়ার আগেই সমর্থকদের উদ্দেশে আল-সাইয়েদ বলেন, ‘এখন থেকে আমাদের ভাঙা সম্পর্কগুলো জোড়া লাগাতে হবে।’
আল-সাইয়েদ আরও বলেন, ‘আমি সবার কাছে একটি অনুরোধ করব, জয়ের পর যেন উদারতা দেখাই। “আমি তো আগেই বলেছিলাম”—এমন মনোভাব নয়। আমাদের এমন একটি আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে, যা আরও বড়, আরও শক্তিশালী এবং আরও প্রভাবশালী হবে। এমন একটি আন্দোলন, যা এই অঙ্গরাজ্যের প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছাবে এবং আমাদের মনে করিয়ে দেবে, আমরা আসলে কী হতে পারি।’
আল-সাইয়েদ বলেন, সাধারণ নির্বাচনে মাইক রজার্স ও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে ধরনের রাজনৈতিক আক্রমণ চালাবেন, তার তুলনায় প্রাইমারির এই লড়াই অনেক ছোট। তিনি বলেন, ‘মাইক, আমি জানি আপনি শুনছেন, আমরা আসছি।’
অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আল-সাইয়েদের জয়কে রিপাবলিকানদের জন্য ‘সুসংবাদ’ বলে মন্তব্য করেছেন।