সিএনএনের ফ্যাক্টচেক
ইরান যুদ্ধ ও পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে একের পর এক মিথ্যা বললেন ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল সোমবার তাঁর সংবাদ সম্মেলনে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ ও পররাষ্ট্রনীতি–সংক্রান্ত অন্যান্য বিষয় নিয়ে বেশ কিছু মিথ্যা দাবি করেছেন। সিএনএন তাঁর বক্তব্যগুলো যাচাই করে দেখেছে।
তবে ট্রাম্প এমন কয়েকটি দাবিও করেছেন, যেগুলোর সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। যেমন তাঁর দাবি, সব জীবিত সাবেক প্রেসিডেন্ট এখন ‘তাঁদের বন্ধুদের কাছে’ বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত ছিল আগেই ইরানে হামলা চালানো।
সোমবার সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প যেসব মিথ্যা বলেছেন, তা তুলে ধরা হলো—
নিজের বইয়ে ওসামা বিন লাদেন প্রসঙ্গ
ট্রাম্প বরাবরই মিথ্যা বলে থাকেন। ২০০০ সালে প্রকাশিত একটি বইয়ে তিনি নাকি আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনকে মার্কিন কর্তৃপক্ষের হত্যা করা উচিত বলে মত দিয়েছিলেন। সোমবারের সংবাদ সম্মেলনে তিনি আবারও সেই মিথ্যা দাবি করেছেন।
ট্রাম্প বলেন, ২০২০ সালে ইরানি কমান্ডার কাসেম সোলাইমানিকে তাঁর নির্দেশে হত্যা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্পের এ দাবি সত্য। তবে এরপর তিনি বলেন, ‘আমি আরেকটি ভূমিকা রেখেছি, কিন্তু সেটিকে কেউ গুরুত্ব দেয়নি। সেটি ছিল ওসামা বিন লাদেনের বিষয়ে। যদি আপনারা আমার বইটি পড়ে থাকেন, তাহলে বুঝতে পারবেন, আমি সেখানে বলেছি, “তাঁকে শেষ করে দিতে হবে।” ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ধ্বংসের এক বছর আগে এটা বলেছিলাম। আমি আশা করব, আপনারা বইটি পড়বেন।’
সতিকার অর্থে, ওই বইতে বিন লাদেনের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয় তো দূরে থাক, তাঁকে কীভাবে মোকাবিলা করা যাবে, সে–সম্পর্কিত কোনো পরামর্শও ছিল না। বইটিতে বিন লাদেনের নাম একবার মাত্র উল্লেখ করা হয়েছে।
২০১১ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার নির্দেশে মার্কিন বাহিনী পরিচালিত অভিযানে বিন লাদেন নিহত হন। ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রথম মেয়াদে ক্ষমতা গ্রহণের পাঁচ বছরের বেশি সময় আগে এটা ঘটেছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের বিমান
ট্রাম্প উল্লেখ করেছেন, ইরান যুদ্ধের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশ কুয়েত ভুলবশত গুলি করে তিনটি মার্কিন বিমান ভূপাতিত করেছিল। তাঁর দাবি, ‘এগুলোই একমাত্র মার্কিন বিমান, যেগুলো ক্ষতির স্বীকার হয়েছে।’
অথচ ওই সংবাদ সম্মেলনের মূল আলোচ্য বিষয়ই ছিল ইরানে বিধ্বস্ত মার্কিন যুদ্ধবিমানের দুই আরোহীকে উদ্ধার করা প্রসঙ্গে। গত সপ্তাহে ইরানের গুলিতে মার্কিন যুদ্ধবিমানটি ভূপাতিত হওয়ার কথা ট্রাম্প নিজেও উল্লেখ করেছিলেন।
পাশাপাশি জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান ড্যান কেইন সংবাদ সম্মেলনে নিশ্চিত করেন, যুদ্ধবিমানের নিখোঁজ ক্রুকে উদ্ধারে অভিযান চলার সময় যুক্তরাষ্ট্রের একটি এ-১০ থান্ডারবল্ট-২ বিমানও ধ্বংস হয়েছে। ইরানের গুলিতে সেটি ধ্বংস হয়।
এ ছাড়া সৌদি আরবের একটি ঘাঁটিতে ইরানের হামলায় মার্কিন ই থ্রি সেনট্রি বিমান ধ্বংস হয়েছে।
ট্রাম্প ও যুদ্ধ
ট্রাম্প বরাবরের মতো আবারও মিথ্যা দাবি করেছেন, তিনি আটটি যুদ্ধ থামিয়েছেন। অথচ আটটি যুদ্ধ বলতে তিনি যেসব পরিস্থিতির কথা বলে থাকেন, তার মধ্যে দুটি পরিস্থিতি আসলে যুদ্ধই ছিল না। সেগুলো হলো মিসর ও ইথিওপিয়ার মধ্যে কূটনৈতিক বিবাদ এবং সার্বিয়া ও কসোভোর মধ্যকার বিরোধ। এ ছাড়া তাঁর উল্লিখিত যুদ্ধগুলোর মধ্যে অন্তত একটি যুদ্ধ বাস্তবে শেষ হয়নি। সেটি হলো রুয়ান্ডা ও কঙ্গো গণপ্রজাতন্ত্রের যুদ্ধ।
মাদুরো ও কারাবন্দী
অতীতে বিভিন্ন সময়ে ট্রাম্প দাবি করেছেন, ভেনেজুয়েলার ক্ষমতাচ্যুত নেতা ‘নিকোলা মাদুরো তাঁর শাসনকালে কারাগার থেকে হাজার হাজার মানুষকে মুক্তি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়ে দিয়েছেন’। ট্রাম্প ও তাঁর কর্মকর্তাদের কেউ এ দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেননি।
ভেনেজুয়েলা–বিষয়ক বিশেষজ্ঞরাও আগে সিএনএন এবং অন্য সংবাদমাধ্যমগুলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তাঁরাও এ–সংক্রান্ত দাবির ভিত্তি খুঁজে পাননি।
দক্ষিণ কোরিয়ায় মার্কিন সেনা
ট্রাম্প আবারও দক্ষিণ কোরিয়ায় মার্কিন সামরিক উপস্থিতির সংখ্যাটা অতিরঞ্জিত করে বলেছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের ৪৫ হাজার সেনা দক্ষিণ কোরিয়ায় আছে।’ তিনি একই সংখ্যা বারবার উল্লেখ করেন।
বাস্তবে ২০২৫ সালের শেষ দিকে দক্ষিণ কোরিয়ায় মাত্র ২৬ হাজার ৭২২ জন মার্কিন সামরিক কর্মী অবস্থান করছিলেন। এর মধ্যে ২৩ হাজার ৪৯৫ জন সক্রিয় দায়িত্বে ছিলেন। ২০২৬ সালের শুরুতে প্রায় ২০ হাজার অতিরিক্ত সেনা পাঠানোর কোনো তথ্য নেই।
কমলা হ্যারিস ও সীমান্ত
ট্রাম্প আবারও দাবি করেছেন, সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস ‘সীমান্তে সুরক্ষা নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকার পরও কখনো সীমান্তে যাননি’।
ট্রাম্পের এ দাবিও মিথ্যা। বাস্তবে, কমলা হ্যারিস ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকাকালে দুইবার সীমান্তে গিয়েছেন—একবার ২০২১ সালে এবং একবার ২০২৪ সালে।
সাবেক প্রেসিডেন্ট বাইডেনের সময়কার হোয়াইট হাউস কর্তৃপক্ষ বলেছে, কমলা হ্যারিস কখনো সীমান্ত নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন না। তাঁর কাজ ছিল অভিবাসী সমস্যার মূল কারণ খুঁজে বের করে মধ্য আমেরিকার দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা, যেন মানুষ কেন যুক্তরাষ্ট্রে আসে, তা সমাধান করা যায়।