ট্রাম্পের দর্শন ঘরে চলছে না, বিদেশে রপ্তানির তোড়জোড়

  • ট্রাম্পের লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রকে আবার মহান করে তোলা, এ জন্য ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ দর্শন নিয়ে কাজ করছেন।

  • ট্রাম্প ইতিমধ্যে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, হন্ডুরাস ও পোল্যান্ডের নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্দেশ্য যুক্তরাষ্ট্রকে আবার মহান করে তোলা। এ লক্ষ্যে তিনি মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন (মাগা) দর্শন নিয়ে কাজ করছেন। মাগা মূলত ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয় করে তোলা রাজনৈতিক স্লোগান। ট্রাম্প ২০১৬ ও ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রচারের সময় এ স্লোগান তোলেন।

ট্রাম্প প্রায়ই একধরনের হতাশা ব্যক্ত করছেন এই ভেবে যে তাঁর দেশের নাগরিকেরা সম্ভবত তাঁদের জীবনের ‘সোনালি সময়ে’ বাস করছেন—এটি তাঁরা যথেষ্ট উপলব্ধি করতে পারছেন না। তবে দেশের মানুষের এই অনীহা ট্রাম্পকে থামিয়ে রাখতে পারছে না। নিজের আদর্শকে বিদেশে রপ্তানি করতে উঠেপড়ে নেমেছেন।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজনীতি ও নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করে কট্টর ডানপন্থী জনতুষ্টিবাদী নেতাদের ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখা বা তাঁদের উত্থান নিশ্চিত করাই তাঁর লক্ষ্য। আর এই লক্ষ্যপূরণেই হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্তর অরবানকে সমর্থন জোগাতে বুদাপেস্টে হাজির হয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। অরবান রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ হলেও মার্কিন স্বার্থে তাঁকে ক্ষমতায় রাখতে চান ট্রাম্প।

ট্রাম্পের আদর্শ

জনতুষ্টিবাদী ও একনায়কতন্ত্রের অনুসারী অরবান ট্রাম্পের মাগা নামের রাজনৈতিক আদর্শ আসার আগে থেকেই এর চর্চা করছেন। বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার, অভিবাসনে কঠোর নীতি, অনুগত শক্তিশালী অভিজাত শ্রেণির ক্ষমতার দাপট আর সংবাদপত্রের টুঁটি চেপে ধরা—অরবানের এই কৌশলগুলোই যেন ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের নীলনকশা। তবে অরবান এখন তাঁর টানা ১৫ বছরের ক্ষমতার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে ।

ইউক্রেন ইস্যু থেকে শুরু করে মার্কিন প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ কিংবা জ্বালানিনীতি—সব কটি ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সিদ্ধান্তের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া অরবানের সঙ্গে মার্কো রুবিওর এই সাক্ষাৎ মূলত একটি শক্তিশালী বার্তা। গত সপ্তাহে মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে রুবিওর নমনীয় সুর দেখে যাঁরা ভেবেছিলেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের উত্তেজনা এবার হয়তো কমতে শুরু করেছে, তাঁদের সেই আশায় কার্যত জল ঢেলে দিলেন তিনি।

রুবিওর উচ্চাকাঙ্ক্ষা

রুবিওর এই অবস্থান তাঁর নিজের রাজনৈতিক বিবর্তনেরও এক বড় প্রমাণ, যা ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে নিজের ভবিষ্যৎ নিশ্চিতে বেশ জরুরি। ফ্লোরিডার এই তৎকালীন সিনেটর রুবিও ২০১৯ সালের এক বিবৃতিতে অরবানের অধীনে হাঙ্গেরির গণতন্ত্রের ‘মারাত্মক অবক্ষয়’ নিয়ে কথা বলেছিলেন। আর গত সোমবার সেই রুবিও অরবানের মুখোমুখি হয়ে বললেন, ‘আমরা আমাদের দুই দেশের সম্পর্কের সোনালি অধ্যায়ে প্রবেশ করছি। এটি কেবল জনগণের ঐক্যের কারণে নয়; বরং মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আপনার সুসম্পর্কের কারণেই সম্ভব হয়েছে।’

তবে এখানে রুবিওর ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষাই শেষ কথা নয়। হাঙ্গেরির নির্বাচনে ট্রাম্প প্রশাসনের অরবানের পাশে দাঁড়ানো আসলে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে এক বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত। এতে বোঝা যায়, ঐতিহ্যগত অবস্থানগুলোকে এক পাশে সরিয়ে কট্টর ডানপন্থার দিকে ঝুঁকেছে ওয়াশিংটন। ইউরোপের অনেক নেতা এখন তাঁদের দীর্ঘদিনের ‘রক্ষাকর্তা’ যুক্তরাষ্ট্রকে রাজনৈতিক হুমকি হিসেবে দেখতে শুরু করেছেন।

অন্য দেশে হস্তক্ষেপ

এ বছরই যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন; কিন্তু ট্রাম্প এর আগেই মার্কিন নির্বাচনী ব্যবস্থা জালিয়াতিতে ভরা বলে দাবি করেছেন। দেশের অভ্যন্তরে নিজের মতাদর্শ নিয়ে হোঁচট খেলেও তিনি অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নাক গলানোর এক প্রবল ইচ্ছা দেখিয়ে যাচ্ছেন। ট্রাম্প ইতিমধ্যে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, হন্ডুরাস ও পোল্যান্ডের নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছেন। এমনকি নিকোলা মাদুরোকে তুলে আনার পর ওভাল অফিস থেকেই ভেনেজুয়েলা চালানোর দাবিও তুলেছেন। ট্রাম্পের এসব পদক্ষেপ কোনো সাময়িক খেয়াল নয়। তিনি তাঁর লক্ষ্যগুলোকে নতুন মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে বিধিবদ্ধ করেছেন।

ট্রাম্পের বার্তাবাহক

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও ট্রাম্পের বার্তাবাহক হিসেবে কাজ করছেন। একই সঙ্গে তিনি ইউরোপের জনতোষণবাদী দলগুলোর সমর্থকদের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছেন। তবে ইউরোপের মূলধারার রাজনীতিবিদেরা সতর্ক করে বলছেন, এই জনতোষণবাদী শক্তিগুলো স্থিতিশীলতা ও গণতন্ত্রের জন্য বড় হুমকি। তাঁরা ট্রাম্পের নীতিকে ঘৃণা করেন এবং অভিবাসন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কড়া বার্তাগুলোকে ইউরোপীয় মানবাধিকার ও সংহতির পরিপন্থী বলে মনে করেন।

মাগা নিয়ে সন্দেহ

ট্রাম্পের মাগা বার্তা বিদেশে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টার পেছনে এক বড় ধরনের বিদ্রূপও লুকিয়ে আছে। কারণ, নিজ দেশে তিনি এখন ইতিহাসের অন্যতম নাকি অজনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট। জনমত জরিপে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ৪০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে এবং রিপাবলিকান নেতারা আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভরাডুবির আশঙ্কা করছেন। খোদ মার্কিন জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই যেখানে তাঁর বিশ্বদর্শন গ্রহণ করছে না, সেখানে ইউরোপে তাঁর আদর্শ রপ্তানির চেষ্টা কতটা সফল হবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।