ইরানে হামলা নিয়ে নতুন ব্যাখ্যা দিলেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী

ইরানে হামলা নিয়ে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের ব্রিফিংয়ের জন্য ক্যাপিটলে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। ২ মার্চ, ২০২৬ছবি: এএফপি

ইরানে হামলা চালানো নিয়ে নতুন ব্যাখ্যা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তিনি বলেছেন, ইরানে হামলার বিষয়ে সংকল্পবদ্ধ ছিল ইসরায়েল এবং একবার দেশটিতে হামলা হলে নিশ্চিতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা তেহরানের পাল্টা হামলার লক্ষ্যবস্তু হবে। সেই চিন্তা থেকে ট্রাম্প প্রশাসন আগেই দেশটিতে হামলা করেছে।

ইরান–ইসরায়েল সংঘাতে বিস্ময়করভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ঢুকে পড়া নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই ব্যাখ্যা কংগ্রেসের জ্যেষ্ঠ সদস্যদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। ওয়াশিংটনের স্থানীয় সময় গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় কংগ্রেসের শুনানিতে ইরানে হামলা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। রুদ্ধদ্বার ওই শুনানিতে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর পরিচালক জন র‌্যাটক্লিফ, জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান ড্যান কেইন উপস্থিত ছিলেন। ইরান যুদ্ধ নিয়ে চলতি সপ্তাহের শেষের দিকে কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে একটি প্রস্তাবের ওপর ভোটাভুটি হতে পারে। ওই প্রস্তাবে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ইরানের বিরুদ্ধে শত্রুতা শেষ করতে বাধ্য করার আহ্বান জানানো হতে পারে। অবশ্য প্রস্তাবটি পাস হওয়ার সম্ভাবনা তেমন নেই বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

শুনানির পর ক্যাপিটলে (কংগ্রেস ভবন) উপস্থিত সাংবাদিকদের রুবিও বলেন, ‘এটা অনেকটা স্পষ্ট ছিল যে ইরানে কেউ হামলা করলে সেটা যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল বা অন্য যে কেউ করুক না কেন, তারা জবাব দিত এবং জবাবটা হতো যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে।’

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা জানতাম যে সেখানে ইসরায়েল পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে। আমরা জানতাম যে এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীগুলোর ওপর হামলা হবে। আমরা জানতাম যে তারা হামলা চালানোর আগে যদি আমরা তাদের ওপর হামলা না করি তাহলে আমরা বেশি হতাহতের শিকার হতে পারি।’

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সোমবার রাতে ফক্স নিউজকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হলো এটা নিশ্চিত করা যে ‘ইরান যেন কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে’।

ভ্যান্স বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট (ট্রাম্প) ইরানিদের ও পুরো বিশ্বকে স্পষ্ট করে জানাতে চান যে ইরান যেন পারমাণবিক অস্ত্র পেতে না পারে—সেটা নিশ্চিত করার জন্য সব গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত তিনি বিশ্রামে যাবেন না।’

ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যে জেডি ভ্যান্সই ইরানে সামরিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে সবচেয়ে জোরালো অবস্থান নিয়েছিলেন। ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা নিয়ে মার্কো রুবিওর তুলনায় কম কথা বলেছেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওসহ দেশটির শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা রুদ্ধদ্বার শুনানিতে ইরানে হামলা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেওয়ার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন সিনেটে ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা চাক শুমার। ২ মার্চ, ২০২৬
ছবি: এএফপি

সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানজুড়ে ধারাবাহিকভাবে বিমান হামলা চালিয়েছে। জবাবে তেহরান মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কিত দেশগুলোতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলায় ইরানের শীর্ষ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েকজন সামরিক ও রাজনৈতিক নেতা নিহত হয়েছেন। এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ছয়জন সেনাসদস্য নিহত হওয়ার কথা স্বীকার করেছে দেশটির সেনাবাহিনী। আর ইরানের রেড ক্রিসেন্টের দেওয়া তথ্যমতে, দেশটিতে নিহত ব্যক্তির সংখ্যা বেড়ে ৭৮৭ জনে পৌঁছেছে।

এই যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিবিদদের মধ্যে বিভক্তি দেখা দিয়েছে। রিপাবলিকান নেতারা ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের পক্ষে দাঁড়ালেও ডেমোক্র্যাটরা সমালোচনা করে বলছেন, এটা অপ্রয়োজনীয় সংঘাত, যার লক্ষ্যও স্পষ্ট নয়।

সিনেটে ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা চাক শুমার বলেছেন, ‘এটা ট্রাম্পের যুদ্ধ। এই যুদ্ধ বেছে নেওয়া হয়েছে। তাঁর কোনো কৌশল নেই, কীভাবে যুদ্ধ শেষ হবে তারও কোনো পরিকল্পনা নেই।’

শুমার বলেন, ‘শুনানিতে উপস্থিত আইনপ্রণেতারা অনেক প্রশ্ন করেছিলেন। কিন্তু তাঁরা যে জবাব পেয়েছেন, তা একেবারেই অপর্যাপ্ত। আসলে অন্তত আমার কাছে মনে হয়েছে, শুনানিতে অনেক বেশি প্রশ্ন ওঠে, যেগুলোর উত্তর দেওয়া হয়নি।’

সিনেট ইন্টেলিজেন্স কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান মার্ক ওয়ার্নার বলেন, ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন একটি যুদ্ধে টেনে নেওয়ার ফলে যেসব জটিলতা দেখা দেবে, তা নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন।

ওয়ার্নার বলেন, ‘ইরানিদের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আসন্ন কোনো হুমকি ছিল না। হুমকি ছিল ইসরায়েলের প্রতি। যদি আমরা ইসরায়েলের প্রতি হুমকিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আসন্ন হুমকি হিসেবে দেখি, তাহলে আমরা একটি অজানা পরিস্থিতিতে পড়ে যাই।’

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওসহ দেশটির শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা রুদ্ধদ্বার শুনানিতে ইরানে হামলা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেওয়ার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন সিনেট ইন্টেলিজেন্স কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান মার্ক ওয়ার্নার। ২ মার্চ, ২০২৬
ছবি: এএফপি

ইরানে হামলা চালানোর পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কয়েকটি লক্ষ্যের কথা বলেছিলেন। তার মধ্যে রয়েছে, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ও তাদের নৌবাহিনীকে ধ্বংস করা, দেশটিকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে আটকানো এবং মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো জায়গায় তাদের ‘প্রক্সি’ বাহিনীকে তেহরানের সমর্থন দেওয়া বন্ধ করা।

তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও গতকাল মাত্র দুটি লক্ষ্যের কথা বলেছেন। তা হলো ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ও তাদের নৌবাহিনীকে ধ্বংস করা।

গোপন ওই শুনানি শেষে মার্ক ওয়ার্নার বলেন, ট্রাম্প এই যুদ্ধ কীভাবে শেষ করতে চান, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন। ভার্জিনিয়ার এই সিনেটর বলেছেন, ‘আমি মনে করি, প্রেসিডেন্টের বিষয়টি নিয়ে কংগ্রেসের মুখোমুখি হওয়া দরকার।’ ইরানে হামলা নিয়ে যে চার বা পাঁচটি লক্ষ্যের কথা বলা হয়েছে, তার মধ্যে আসল লক্ষ্য কোনটা, সেটা স্পষ্ট করা দরকার বলে মন্তব্য করেন তিনি।