ট্রাম্পের হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার স্বপ্ন পূরণ বাস্তবে কতটা সম্ভব

হরমুজ প্রণালিছবি: রয়টার্স

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের জন্য একটি নৌবাহিনী জোট গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। বিশ্ববাজারে আসা মোট তেলের এক–পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে তেল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় বৈশ্বিক তেলবাজার এরই মধ্যে অস্থির হয়ে উঠেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আক্রমণের জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে, এমন খবর আসার পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম বারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।

ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এই সমুদ্রপথ বন্ধ রাখার প্রতিজ্ঞা করেছেন। তেহরানের আরেক শীর্ষ কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছেন, তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

ট্রাম্প বলেন, তিনি আশা করছেন, একটি নৌবাহিনী জোট গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ নিরাপদ রাখতে পারবে। হরমুজ প্রণালি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে।

অবশ্য ট্রাম্পের এই আশা মনে হয় আর বাস্তবায়ন হচ্ছে না। তাঁর ইউরোপীয় মিত্ররাসহ অনেক মিত্র দেশ ইতিমধ্যে বিষয়টি নিয়ে তাদের অনীহার কথা জানিয়ে দিয়েছে।

প্রায় দুই সপ্তাহ আগে যুদ্ধ শুরুর পর ইরান এই সংকীর্ণ নৌপথ দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা এক ডজনের বেশি জাহাজে হামলা করেছে।

এই জলপথে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখতে ট্রাম্প যে সমাধানের কথা বলছেন, সেটা কি আসলেই কাজে দেবে?

ট্রাম্প কী বলেছেন

ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রবেশ করায় নিজ দেশে চাপের মুখে পড়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ যুদ্ধ শেষ করার বা যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার কোনো পথ এখনো দেখা যাচ্ছে না।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস মারফি বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি নিয়ে তাঁদের কোনো পরিকল্পনা ছিল না। ইরান কীভাবে হরমুজ প্রণালিতে বাধা সৃষ্টি করছে, তা বিস্তারিত আমি বলতে পারছি না। তবে এটুকু বলা যথেষ্ট যে এখন নিরাপদে প্রণালিটি আবার কীভাবে খুলতে হবে, তা তাঁরা জানেন না।’

হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ার পর একটি তেলের ট্যাঙ্কার ওমানের মুসকাতের পোর্ট সুলতান কাবুসে নোঙর করছে
ছবি: রয়টার্স

ইরানকে আরও বোমা হামলার হুমকি দেওয়ার পর এবার ট্রাম্প চীন, ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাজ্যের নৌবাহিনীকে হরমুজ প্রণালি নিরাপদ করতে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের সামরিক সক্ষমতার শতভাগ এরই মধ্যে ধ্বংস হয়ে গেছে। তেহরান এখন এক বা দুটি ড্রোন পাঠাতে পারে, একটি মাইন ফেলতে পারে এবং এই জলপথের কোথাও কাছের দূরত্বে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে পারে।

ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে একটি পোস্টে লিখেছেন, ‘আশা করি চীন, ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাজ্য ও অন্যান্য দেশ—যারা এই কৃত্রিম সংকটের কারণে প্রভাবিত হয়েছে, তারা এ অঞ্চলে জাহাজ পাঠাবে; যাতে হরমুজ প্রণালি আর কোনো দেশের কারণে হুমকির মুখে না পড়ে, এমন দেশ যেটি সম্পূর্ণরূপে অক্ষম হয়ে পড়েছে।’

যুক্তরাষ্ট্র কী করবে সে পরিকল্পনাও ট্রাম্প জানিয়েছেন। ট্রাম্প বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র (ইরানের) উপকূলরেখায় ব্যাপক বোমা হামলা চালাবে এবং ইরানি নৌকা ও জাহাজকে নিয়মিতভাবে ধ্বংস করবে। যেকোনো উপায়ে হোক, আমরা শিগগিরই হরমুজ প্রণালিকে খোলা, নিরাপদ ও মুক্ত করে দেব।’

কিছুক্ষণ পর ট্রাম্প আরেকটি পোস্টে বলেন, যারা তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে নৌবাহিনী জোটে অংশ নেবে, তাদের যুক্তরাষ্ট্র ‘অনেক সহায়তা’ দেবে।

তবে ট্রাম্পের জন্য হতাশার খবর হচ্ছে, তাঁর কোনো মিত্র দেশই তাঁর এই আহ্বানে সাড়া দেয়নি।

ইরান কী বলেছে

ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ডের নৌবাহিনীর কমান্ডার আলীরেজা টাংসিরি এক বিবৃতিতে বলেছেন, ইরানের নৌবাহিনী ধ্বংস করে দেওয়ার বা তেল ট্যাঙ্কারের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার যে দাবি যুক্তরাষ্ট্র করছে, তার সবই মিথ্যা।

বিবৃতিতে আলীরেজা আরও বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি সামরিকভাবে অবরুদ্ধ করা হয়নি, এটি কেবল নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়েছে।’

পরে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে বলেন, হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য খোলা রয়েছে, কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জাহাজ ব্যতীত।

আরাগচি আরও বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি খোলা আছে। এটি কেবল আমাদের শত্রুদের ট্যাঙ্কার ও জাহাজের জন্য বন্ধ, যারা আমাদের এবং তাদের নিজেদের মিত্রদের ওপর হামলা করছে; অন্যরা নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারবে।’

হরমুজ প্রণালির সবচেয়ে সংকীর্ণ স্থান মাত্র ২১ নটিক্যাল মাইল (৩৯ কিলোমিটার) চওড়া। এটি আরব উপসাগরে (ইরানে পারস্য উপসাগর নামে পরিচিত) প্রবেশের একমাত্র সামুদ্রিক পথ। প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নৌপথ লেনগুলো আরও সংকীর্ণ এবং আক্রমণের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।

এটির এক পাশে ইরান, অন্য পাশে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলে সমুদ্রপথে ঢোকা বা বেরোনোর কোনো উপায় থাকে না।

হরমুজ প্রণালির কাছে একটি থাই বাল্ক ক্যারিয়ারে আক্রমণের পর ধোঁয়া উড়ছে। ১১ মার্চ, ২০২৬
ছবি: এএফপি

হরমুজ প্রণালিতে কী কী চ্যালেঞ্জ রয়েছে

এই নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যে উপায় ট্রাম্প বলছেন, তা নিয়ে আল–জাজিরার সঙ্গে কথা বলেছেন সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ আলেকজান্দ্রু হুদিস্টেয়ানু। তিনি রোমানিয়ার নৌবাহিনীতে ১৩ বছর কাজ করেছেন।

হুদিস্টেয়ানু বলেন, ট্রাম্প যে ধরনের জোটের ইঙ্গিত দিচ্ছেন, সেখানে ‘ইন্টারঅপারেবিলিটি’ বা একযোগে কাজ করার সক্ষমতাই সবচেয়ে বড় বাধা। কারণ, এমন পরিস্থিতিতেও মৌলিক যোগাযোগই বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

এই বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, ‘এরপর আছে হরমুজ প্রণালির ভূপ্রকৃতি। এ ধরনের যুদ্ধকালীন হুমকির মধ্যে জাহাজ চলাচলের জন্য এটি একটি খুবই কঠোর ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ।’

তা ছাড়া নিরাপত্তার জন্য পণ্যবাহী জাহাজকে পাহারার ব্যবস্থা করা একটি ব্যয়বহুল বিকল্প হবে। এতে অংশগ্রহণকারী বিদেশি যুদ্ধজাহাজগুলোর ওপর ইরানি আক্রমণের ঝুঁকিও থাকবে, যা হয়তো আরও দেশকে চলমান যুদ্ধে টেনে আনবে।

হুদিস্টেয়ানু বলেন, ইরানের দিক থেকে, হরমুজ প্রণালি তাদের উপকূলরেখার একেবারে কাছাকাছি অবস্থিত হওয়ায় এবং জলপথটি অত্যন্ত সংকীর্ণ ও অনেক বেশি জাহাজ চলাচলের কারণে স্বাভাবিকভাবে তাদের জন্য এটি একটি সুবিধা। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ইরান এই পথে বড় বাধা সৃষ্টি করতে পারে—তেহরানের অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ হরমুজ প্রণালি পার হতে পারবে না।

হরমুজ প্রণালি নিরাপদ রাখতে যেকোনো নৌবাহিনী জোটের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে, যেকোনো অভিযান ঠিক কত সময় ধরে পরিচালিত হবে, তা নির্ধারণ করা।

হুদিস্টেয়ানু বলেন, ‘প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। এটি কেবল সময় কত লাগবে ও কত সম্পদ প্রয়োজন, তার বিষয়। দ্রুত কাজ করলে অভিযান ও অঞ্চলের নিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।’

দেশগুলো কীভাবে সাড়া দিয়েছে

এ পর্যন্ত কোনো দেশই ট্রাম্পের হরমুজ প্রণালি নিরাপদ করতে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আহ্বানে প্রকাশ্যে সম্মতি জানায়নি।

লন্ডন বলেছে, সামুদ্রিক পথটি আবার কীভাবে খোলা যায়, তা নিয়ে তারা ‘গভীরভাবে বিবেচনা’ করছে।

ব্রিটিশ জ্বালানিমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড বলেন, ‘কীভাবে কী করা সম্ভব, সেটা নিয়ে আমরা আমাদের মিত্রদের সঙ্গে গভীরভাবে আলোচনা করছি। এই প্রণালি আবার খুলে দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেছেন, বেইজিং সংঘাত বন্ধের আহ্বান জানাচ্ছে। স্থিতিশীল ও বাধাহীন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা সব পক্ষের দায়িত্বের ভেতর পড়ে।

জাপান বলেছে, এ ধরনের অভিযানে তাদের যুদ্ধজাহাজ পাঠানো ‘অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ’।

ফ্রান্সও যুদ্ধজাহাজ না পাঠানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

দক্ষিণ কোরিয়া বলেছে, তারা ট্রাম্পের বক্তব্য ‘নিবিড়ভাবে নজরদারি’ করছে এবং জ্বালানি পরিবহন পথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন ব্যবস্থা বিবেচনা ও পরীক্ষা করছে। দক্ষিণ কোরিয়ার মোট আমদানি করা তেলের ৭০ শতাংশ আসে উপসাগর থেকে।

দেশগুলো কি ইরানের সঙ্গে আলোচনা করছে

কয়েকটি দেশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিজেদের তেল পরিবহন নিশ্চিত করতে ইরানের সঙ্গে আলোচনা করছে।

দুটি ভারতীয় পতাকা বহনকারী ট্যাঙ্কার তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) নিয়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে গেছে। নয়াদিল্লি তাদের মোট এলপিজি আমদানির ৮০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে আমদানি করে।’

ইরানে যুদ্ধের কারণে ভারতে ৩৩ কোটির বেশি পরিবার মারাত্মকভাবে রান্নার গ্যাসের সংকটে পড়েছে।

নয়াদিল্লির সঙ্গে তেহরানের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। তবে এবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানাননি। যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল যৌথ হামলার প্রথম দিনেই আলী খামেনি নিহত হন।

বরং মোদি উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। লাখ লাখ ভারতীয় শ্রমিক ওইসব দেশে কাজ করেন এবং প্রতিবছর ৫ হাজার ১০০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠান।

ভারতে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ ফাথালি বলেন, তেহরান কয়েকটি ভারতীয় জাহাজকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে, যা চলমান অবরোধের একটি বিরল ব্যতিক্রম।

আরও পড়ুন

কতগুলো ভারতীয় জাহাজকে অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তা তিনি নিশ্চিত করেননি।

তুরস্কের মালিকানাধীন একটি জাহাজও গত সপ্তাহে অনুমতি পেয়েছে। আঙ্কারা সরাসরি তেহরানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে জাহাজটির প্রণালি পারাপারের ব্যবস্থা করেছে। আরও ১৪টি তুর্কি জাহাজ অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

ফ্রান্স এবং ইতালিও ইরানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসেছেন বলে জানা গেছে। হুদিস্টেয়ানু বলেন, ‘ইরান সমুদ্র দিয়ে পণ্য সরবরাহে প্রভাব ফেলছে। এর ফলে ওই অঞ্চলের সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও পুরো পরিবেশব্যবস্থা প্রভাবিত হচ্ছে। বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় পুরো বিশ্বকেই এখন এটি নিয়ে আলোচনার টেবিলে বসতে হচ্ছে।’

আরও পড়ুন