ডিমেনশিয়া রোগীদের জন্য আসলেই কি সংগীত থেরাপিতে কাজ হয়

নিউইয়র্কের ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি ও তাঁদের পরিচর্যাকারীদের জন্য আয়োজিত ‘লিংকন সেন্টার মোমেন্টস’ নামের পরিবেশনাভিত্তিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন কয়েকজনছবি: এএফপি ফাইল ছবি

ষাটের দশকের শুরুর দিকে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন রোব কাউফম্যান। তিনি কাঠের মেঝের ওপর পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পান। এতে তাঁর ট্রমাটিক ব্রেন ইনজুরি (মস্তিষ্কে গুরুতর আঘাত) হয়।

কাউফম্যানের স্ত্রী এলেন এএফপিকে বলেন, ওই ঘটনার পর তাঁর স্বামী কোমায় ছিলেন। প্রায় এক মাস তাঁকে হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউতে) চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে তাঁকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরাতে প্রায় ৯ সপ্তাহ ধরে স্পিচ থেরাপিসহ বিভিন্ন চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে কাউফম্যান স্বল্পমেয়াদি স্মৃতিভ্রমে ভুগছেন।

বিভিন্ন থেরাপির মধ্যে সংগীত থেরাপি তাঁর জন্য বেশি কার্যকারিতা দেখিয়েছে। কাউফম্যান স্টুডিও সংগীতশিল্পী ছিলেন। তিনি একসময় জিমি হেন্ডরিক্সের মতো শিল্পীদের সঙ্গে বাজিয়েছেন।

কাউফম্যান দম্পতি এখন নিউইয়র্কের ম্যানহাটানে এক সংগীত কর্মসূচিতে নিয়মিত অংশ নেন। ডিমেনশিয়া-জাতীয় উপসর্গ থাকা ব্যক্তিদের জন্য বিশেষভাবে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সম্প্রতি এই দম্পতি এ কর্মসূচির ১০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। সেখানে ক্যালিডোর স্ট্রিং কোয়ার্টেট নামের সংগীত দলের পরিবেশনা ছিল।

সংগীতশিল্পীরা প্রায় ১০০ দর্শকের সামনে বসন্ত মৌসুমের শেষ কনসার্টটি করেন।

দর্শকদের একজন চোখ বন্ধ করে সংগীতের তালে এমনভাবে হাত নাড়ছিলেন, যেন তিনি সংগীত পরিচালক। আরেক দর্শক তাঁর পরিচর্যাকারীর হাতে আঙুল দিয়ে টোকা দিচ্ছিলেন, যেন সেখানে পিয়ানোর চাবি আছে।

নিউইয়র্কের আপার ওয়েস্ট সাইডে বিখ্যাত সাংস্কৃতিক কেন্দ্র লিংকন সেন্টার প্রথম এ ধরনের উদ্যোগ শুরু করে।

লিংকন সেন্টারের কর্মকর্তা মিরান্ডা হফনার বলেন, একটা দায়বোধের জায়গা থেকে তাঁরা এ ধরনের উদ্যোগ নিয়েছেন। কারণ, একটা সময় তাঁরা বুঝতে পারেন, তাঁদের দর্শকদের মধ্যে অনেকে আছেন, যাঁরা আগে নিয়মিত কনসার্টে আসতেন, কিন্তু এখন ডিমেনশিয়ার কারণে আর সদস্য পদ নবায়ন করতে পারছেন না। অথচ এসব মানুষ অনেক বছর ধরে তাঁদের পাশে ছিলেন। তাই প্রতিষ্ঠানটি মনে করছে, এই শূন্যতা পূরণ করাটা তাদের দায়িত্ব।

বয়স্ক জনগোষ্ঠী

ডিমেনশিয়া কোনো একক রোগ নয়। এটি কিছু গুরুতর উপসর্গের সমষ্টিগত নাম। এ ক্ষেত্রে মানুষের স্মৃতিশক্তি কমে যায় এবং চলাফেরা ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় ব্যাঘাত ঘটে।

আলঝেইমার রোগকে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ডিমেনশিয়ার প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হয়। তবে নানা ঝুঁকিপূর্ণ কারণ ও শারীরিক অবস্থার প্রভাবেও এ সমস্যা দেখা দিতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিওএইচও) তথ্য বলছে, ২০২১ সাল পর্যন্ত বিশ্বে প্রায় ৫ কোটি ৭০ লাখ মানুষ ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন। প্রতিবছর প্রায় এক কোটি নতুন রোগী শনাক্ত হন। বর্তমানে এ রোগের কোনো নিরাময় নেই।

ডিমেনশিয়ার হার বৃদ্ধির একটি বড় কারণ হলো বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জনসংখ্যার বিস্ফোরণ হয়েছিল এবং সে সময় জন্ম নেওয়া ‘বেবি বুমার’ প্রজন্ম এখন বার্ধক্যে পৌঁছেছে। এ বেবি বুমার প্রজন্ম আগের প্রজন্মগুলোর তুলনায় সাধারণত বেশি সময় বেঁচে থাকছেন। তাঁরা বার্ধক্যজনিত দীর্ঘমেয়াদি রোগ ও স্বাস্থ্য সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। এর মধ্যে ডিমেনশিয়া অন্যতম বলে মনে করছেন নিউইয়র্ক-প্রেসবিটারিয়ান মেডিকেল সেন্টারের জেরিয়াট্রিকস (বয়স্কদের স্বাস্থ্যসেবা) বিশেষজ্ঞ এমিলি ফিঙ্কেলস্টেইন।

ডিমেনশিয়ার উপসর্গে ভোগা মানুষের জন্য আয়োজিত এই পরিবেশনা সিরিজে অংশগ্রহণমূলক (ইন্টারঅ্যাকটিভ) কর্মশালাও অন্তর্ভুক্ত আছে
ছবি: এএফপি ফাইল ছবি

এমিলি এএফপিকে বলেন, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত মানুষের যত্ন নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সামাজিক সহায়তাকাঠামো এখনো পর্যাপ্ত নয়।

এমিলির মতে, এটি একটি বিশাল সমস্যা। বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনকে উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া মানুষদের জন্য শিল্পকলা, সংগীত ও নৃত্যভিত্তিক থেরাপি খুবই কাজে দেয়।

তবে যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের কর্মসূচি সাধারণত নির্দিষ্ট কিছু এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে এবং অনেক মানুষের জন্য সেগুলোতে অংশ নেওয়াটা সহজ হয় না।

এমিলি বলেন, ‘আমাদের কোনো জাতীয় স্বাস্থ্য কর্মসূচি নেই। তাই আমরা এর উপকারিতা জানলেও এ ধরনের কর্মসূচিকে দেশজুড়ে সহজে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজটি অনেক বেশি জটিল ও কঠিন।’

স্বাভাবিক জীবনযাপন

নিউইয়র্কের লিংকন সেন্টারে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত মানুষ এবং তাদের পরিচর্যাকারীদের জন্য বিনা মূল্যে অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ দেওয়া হয়।

আলঝেইমার রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সেবা প্রদানকারী একটি সংস্থা এ অনুষ্ঠানের কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে, যেন তারা দর্শকদের ভালোভাবে সহযোগিতা করতে পারে এবং সবার জন্য সহজে অংশ নেওয়ার মতো অনুষ্ঠান তৈরি করতে পারে।

আয়োজক মিরান্ডা হফনার বলেন, ‘আপনি দেখবেন, মানুষ একে অপরের হাত ধরে বসে আছে, কেউ কেউ পা নাড়াচ্ছে, আবার কেউ কেউ গানের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে অংশ নিচ্ছে।’

এ কনসার্টগুলো প্রচলিত ধ্রুপদি সংগীত অনুষ্ঠানের চেয়ে কম আনুষ্ঠানিক। অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর এখানে ছোট ছোট কর্মশালা হয়। মিউজিক থেরাপিস্ট ও শিক্ষকেরা এ কর্মশালাগুলো করান, যেন সবাই আরও সহজভাবে ও কল্পনাশক্তি দিয়ে যুক্ত হতে পারে।

এই উদ্যোগের একটি উদ্দেশ্য হলো বয়স্ক মানুষদের এমন সহায়তা দেওয়া, যেন তারা শহরের ব্যস্ত পরিবেশেও নিজেদের বাড়ি বা পরিচিত জায়গায় থেকে স্বাভাবিকভাবে জীবন যাপন করতে পারে।

৭৩ বছর বয়সী রোব কাউফম্যান একসময় গণিত ও বিজ্ঞানের শিক্ষক ছিলেন। তিনি বলেন, এই কনসার্টগুলো তাঁকে আগের চেয়ে বেশি স্বাভাবিক হতে সাহায্য করেছে। তাঁর স্ত্রীর মতে, কাউফম্যান নিজের অক্ষমতা কাটিয়ে উঠতে পারছেন।

এলেন কাউফম্যান বলেন, শুরুতে তিনি যখন তাঁর স্বামীর নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন, তখন এ ধরনের সহায়তামূলক কর্মসূচি খুব কম ছিল। এ ধরনের কর্মসূচিকে অনেক মূল্যবান বলে মনে করেন তিনি।

কাউফম্যান বলেন, ‘এখানে উপস্থিত কারও জীবনই সহজ নয়। আমি দেখি আমার বন্ধুরা কী পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তারা তাদের স্বামীদের ধীরে ধীরে বদলে যেতে দেখছে। তবু তারা তাদের স্বামীদের পাশে থাকে। তাদের নিয়ে বাইরে আসে, বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অংশ নেয় এবং এই পুরো যাত্রার সঙ্গী হয়ে থাকে।’