মিত্রদের সঙ্গে ট্রাম্পের বিবাদ দীর্ঘ হতে পারে

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পফাইল ছবি: রয়টার্স

জার্মানি থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার, ইউরোপের অন্যত্রও সেনা কমানোর হুমকি এবং মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ মিত্রের ওপর ইরানের সাম্প্রতিক হামলাকে গুরুত্ব না দেওয়া—প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এসব পদক্ষেপ যুদ্ধের এক দীর্ঘস্থায়ী পরিণতিরই ইঙ্গিত দিচ্ছে। সেই ইঙ্গিতটি হচ্ছে প্রধান মিত্রদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের টানাপোড়েন।

১০ সপ্তাহের যুদ্ধ শেষে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যখন একটি সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতির দিকে এগোচ্ছে, তখন ট্রাম্পের কথা ও কাজ ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের বন্ধুদের মনে নতুন করে শঙ্কা জাগিয়ে তুলেছে। ইউরোপ থেকে মধ্যপ্রাচ্য কিংবা এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল—সবখানেই মিত্রদের ভয়, ভবিষ্যৎ কোনো সংকটে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো আর আগের মতো নির্ভরযোগ্য থাকবে না।

এই আশঙ্কা থেকেই বোধ হয় যুক্তরাষ্ট্রের কিছু ঐতিহ্যবাহী অংশীদার এখন থেকেই বিকল্প পথ খুঁজতে শুরু করেছে, যা ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের ধরনে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনতে পারে। অন্যদিকে চীন ও রাশিয়ার মতো প্রতিপক্ষরা এই কৌশলগত সুযোগ কাজে লাগানোর অপেক্ষায় রয়েছে।

ইরানের সঙ্গে ট্রাম্পের এই যুদ্ধ বিশ্বরাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের স্থায়ী কোনো পরিবর্তন আনবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে অধিকাংশ বিশ্লেষক মনে করেন, ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে ট্রাম্পের খামখেয়ালি আচরণ বৈশ্বিক শৃঙ্খলাকে ওলটপালট করে দিয়েছে। বিশেষ করে যুদ্ধের সময় ট্রাম্পের দাবিগুলো না মানায় ন্যাটোর ওপর তার ক্ষোভ মার্কিন মিত্র জোটগুলোকে আরও দুর্বল করে দেবে।

ওবামা প্রশাসনের সাবেক উপদেষ্টা ব্রেট ব্রুয়েন বলেন, ইরান ইস্যুতে ট্রাম্পের বেপরোয়া মনোভাব নাটকীয় কিছু পরিবর্তন আনছে। এখন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতাই ঝুঁকির মুখে।

ইউরোপের সঙ্গে উত্তেজনা

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানে হামলার পর থেকে ট্রাম্পের সঙ্গে ইউরোপীয় দেশগুলোর উত্তেজনা তুঙ্গে। ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কাছাকাছি—এমন অপ্রমাণিত দাবি তুলে ওই হামলা চালানো হয়েছিল। জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিলে বিশ্বজুড়ে নজিরবিহীন জ্বালানিসংকট দেখা দেয়। ফলে এই যুদ্ধের কোনো দায় না থাকলেও ইউরোপীয় দেশগুলোই এখন সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে।

ফাটল আরও বড় হয় যখন ট্রাম্প ঘোষণা দেন, তিনি জার্মানি থেকে ৫ হাজার সেনা সরিয়ে নিচ্ছেন। চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস প্রকাশ্যে বলেছিলেন, ‘ইরানের কাছে যুক্তরাষ্ট্র অপদস্থ হচ্ছে’—এই মন্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়েই ট্রাম্প এমন সিদ্ধান্ত নেন। এরপর পেন্টাগন জার্মানিতে টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের পরিকল্পনাও বাতিল করে দেয়। এ ছাড়া ইতালি ও স্পেন থেকেও সেনা কমানোর কথা ভাবছেন ট্রাম্প।

মিত্রদের সঙ্গে বিবাদ

মিত্ররা যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে যথেষ্ট সহায়তা করছে না—ট্রাম্পের এমন অভিযোগের পর হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ন্যাটো ও অন্য মিত্রদের ওপর তাঁর অসন্তুষ্টি স্পষ্ট করেছেন। তিনি জানান, ইরান যুদ্ধের জন্য ইউরোপের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের কিছু অনুরোধ স্বাগতিক দেশগুলো প্রত্যাখ্যান করেছিল।

ট্রাম্প এর আগে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারকেও উপহাস করেছেন। এমনকি ব্রিটিশ পণ্য আমদানিতে বড় ধরনের শুল্ক আরোপের হুমকিও দিয়েছেন তিনি। পেন্টাগন তো আরও এক ধাপ এগিয়ে ন্যাটো সদস্য হিসেবে স্পেনের সদস্যপদ স্থগিত করা এবং ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের ওপর যুক্তরাজ্যের দাবির স্বীকৃতি পুনর্বিবেচনার কথা তুলেছে।

জবাবে ইউরোপীয় সরকারগুলো নিজেদের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি করার ওপর জোর দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে তারা নিজেদের প্রতিরক্ষা বাজেট বৃদ্ধি করা এবং যৌথভাবে অস্ত্র তৈরির পরিকল্পনা করছে। জাপানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাকেশি ইওয়ায়া বলেন, ‘সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আস্থা ও সম্মান দিন দিন কমছে। এটি পুরো অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী ছায়া ফেলতে পারে।’

এদিকে চীন ও রাশিয়া এই পরিস্থিতির ওপর গভীর নজর রাখছে। যুদ্ধের কারণে জ্বালানির উচ্চমূল্য থেকে রাশিয়া লাভবান হচ্ছে। অন্যদিকে চীন নিজেকে ট্রাম্পের চেয়েও বেশি ‘নির্ভরযোগ্য’ বৈশ্বিক অংশীদার হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ নিচ্ছে।

আগামী সপ্তাহে ট্রাম্পের চীন সফরের কথা রয়েছে। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, মিত্রদের সঙ্গে ট্রাম্পের এই ক্রমবর্ধমান দূরত্ব বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্যকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।