ইরান যুদ্ধ: যুক্তরাষ্ট্রের অহংকার ভাঙল যেভাবে

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আগামী শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি সই হবেপ্রতীকী ছবি: রয়টার্স

ইরান যুদ্ধ এখন পর্যন্ত ডোনাল্ড ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় ভুলের এক উদাহরণ হয়ে থাকবে। এ যুদ্ধের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভবিষ্যতে শত্রুদের দমানো আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

এ যুদ্ধের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল উৎপাদনকারী আরব দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের জোট বা বন্ধুত্বে ফাটল ধরেছে। মধ্যপ্রাচ্যের চরম অশান্তি ও বিশৃঙ্খলার মধ্যে আরব দেশগুলো নিজেদের ‘স্থিতিশীলতার প্রতীক’ হিসেবে গড়ে তুলেছিল। এটি ছিল তাদের ব্যবসায়িক মডেল বা মূল শক্তি। কিন্তু এ যুদ্ধের কারণে তাদের সেই স্থিতিশীলতার ভাবমূর্তি এতটাই নষ্ট হয়েছে যে তা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে বা মেরামত করতে এখন বহু বছর লেগে যাবে।

এসব দেশের কর্মকর্তারা এখন গোপনে জোট পরিবর্তনের কথা বলছেন। তারা সমুদ্রের ওপারের দেশ ইরানের সঙ্গে মানিয়ে চলার পথ খোঁজার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন। ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রও তার বিপুল পরিমাণ আধুনিক অস্ত্র ফুরিয়ে ফেলেছে। সেই সঙ্গে তার ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। অন্যদিকে চীন পুরো বিষয় খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করছে।

শেষ মুহূর্তে বড় কোনো বাধা না এলে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধের অবসান হবে। মূলত তেহরানের শক্তি সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ভুল ধারণার ওপর ভিত্তি করেই এ যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। যুদ্ধের কারণে যাঁদের জীবন লন্ডভন্ড হয়েছে, তাঁরা এখন স্বস্তির নিশ্বাস ফেলবেন। বিশেষ করে যুদ্ধের সামনের সারিতে থাকা বেসামরিক মানুষেরা বড় বাঁচা বাঁচবেন।

যুদ্ধ শুরুর ঘোষণা দিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ভিডিও বার্তায় ভাষণ দিয়েছিলেন। তাঁরা ভেবেছিলেন এ যুদ্ধ হবে সংক্ষিপ্ত এবং তাঁরা সহজেই জয়ী হবেন। তবে তাঁদের সেই হিসাব-নিকাশ পুরোপুরি ভুল প্রমাণিত হয়েছে।

ট্রাম্প জানিয়েছেন, এ চুক্তির ফলে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া হবে। এতে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর থেকে বড় চাপ কমবে। বিশ্বজুড়ে চরম সংকটে থাকা কোটি কোটি মানুষের জীবনেও স্বস্তি ফিরবে।

চলমান এ যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যে শত শত মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। অসংখ্য ঘরবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল, গ্যাস ও সার সরবরাহের কাজ ব্যাহত হয়েছে। ফলে বছরের শেষ নাগাদ গরিব দেশগুলোতে খাদ্যসংকট দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে সাহারা মরুভূমির দক্ষিণ অঞ্চলের দেশগুলো চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছে।

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের হওয়া সমঝোতাকে পূর্ণাঙ্গ ‘শান্তিচুক্তি’ বলা যাবে না। দুই পৃষ্ঠার এ দলিলে ১৪টি পয়েন্ট রয়েছে। এখনো এর পূর্ণাঙ্গ রূপ প্রকাশ করা হয়নি। তবে এ সমঝোতা স্মারকের আওতায় হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ছে এবং ইরানি বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ অবরোধ উঠে যাচ্ছে।

ইরানি বিপ্লবের প্রয়াত নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি, প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির ছবি–সংবলিত ব্যানারের কাছে বসে আছেন কয়েকজন। তেহরানের দক্ষিণাঞ্চলে, ইরান
ছবি: রয়টার্স

সবচেয়ে জটিল ও কণ্টকাকীর্ণ বিষয়গুলো আপাতত ভবিষ্যতের আলোচনার জন্য রাখা হয়েছে। ওই আলোচনার মূল সূচিতে থাকবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ। এ ছাড়া বিভিন্ন শর্ত মানার বিনিময়ে ইরান ঠিক কতটা নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি পাবে, তা-ও পরে নির্ধারণ করা হবে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে যে যুদ্ধ শুরু করেছিল, ওয়াশিংটন–তেহরান চুক্তির মধ্য দিয়ে অবশেষে তার ইতি ঘটছে।

একটু পেছনে ফেরা যাক। ২৭ ফেব্রুয়ারি। মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী তখন হামলার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে। যুদ্ধবিমানগুলোতে তোলা হচ্ছে গোলাবারুদ। ক্রুদের দেওয়া হচ্ছে শেষ মুহূর্তের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা। ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যবস্তুও ঠিক করে ফেলা হয়েছে তখন।

জেনেভায় তখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক চলছিল। বিশ্ববাসী জানত, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণই এ আলোচনার মূল লক্ষ্য। একাধিক সূত্র বলেছে, ইরানি আলোচকেরা তখন আলোচনাটিকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গেই নিয়েছিলেন। তাঁরা সেখানে নিজেদের দাবির পাশাপাশি ছাড় দেওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছিলেন।

আয়াতুল্লাহ খামেনি নিহত হওয়ার পর তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনি দ্রুত দেশের দায়িত্ব নেন। তাঁর সঙ্গে যোগ দেন ইসলামি রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) একঝাঁক তরুণ কমান্ডার। তাঁরা আগের নেতাদের মতোই কট্টর আদর্শবাদী, তবে লড়াইয়ের ময়দানে অনেক বেশি বেপরোয়া। নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় তাঁরা যেকোনো বড় ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত।

যুদ্ধের আগে উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রবেশদ্বার হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত ছিল। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়েই সরবরাহ করা হতো। এ ছাড়া আধুনিক জীবনের অপরিহার্য উপকরণ যেমন সার এবং সেমিকন্ডাক্টরের কাঁচামালও এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে আসত।

এ সমঝোতা স্মারক পারমাণবিক আলোচনার পথ আবারও খুলে দিয়েছে। জাহাজগুলো আগের মতোই হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে পারবে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর ঠিক ২৪ ঘণ্টা আগে পরিস্থিতি যেখানে ছিল সবকিছু যেন সেখানেই ফিরে গেল।

যুদ্ধের শুরুতে অতর্কিতে কয়েকটি ধ্বংসাত্মক হামলা চালায় ইসরায়েল। এতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও তাঁর ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টারা নিহত হন। তদন্তে দেখা গেছে, প্রায় একই সময় দক্ষিণ ইরানের মিনাবে একটি স্কুলে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। এ হামলায় ১৫০ জনের বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হন। তাঁদের মধ্যে অন্তত ১২০ জন ছিল স্কুলশিক্ষার্থী। তাদের বেশির ভাগের বয়স ১২ বছরের নিচে।

যুদ্ধ শুরুর ঘোষণা দিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ভিডিও বার্তায় ভাষণ দিয়েছিলেন। তাঁরা ভেবেছিলেন এ যুদ্ধ হবে সংক্ষিপ্ত এবং তাঁরা সহজেই জয়ী হবেন। তবে তাঁদের সেই হিসাব-নিকাশ পুরোপুরি ভুল প্রমাণিত হয়েছে।

এ দুই নেতা তেহরানে সরকারের পতনের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। তবে সরকারের পতন তো হয়ইনি, উল্টো তারা আরও শক্তিশালী হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল চেয়েছিল ইরানে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটাতে। কিন্তু সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। তেহরানের টিকে যাওয়া শাসকেরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ও সাহসী হয়ে উঠেছেন।

আয়াতুল্লাহ খামেনি নিহত হওয়ার পর তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনি দ্রুত দেশের দায়িত্ব নেন। তাঁর সঙ্গে যোগ দেন ইসলামি রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) একঝাঁক তরুণ কমান্ডার। তাঁরা আগের নেতাদের মতোই কট্টর আদর্শবাদী, তবে লড়াইয়ের ময়দানে অনেক বেশি বেপরোয়া। নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় তাঁরা যেকোনো বড় ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসনের জবাবে ইরান পরিকল্পিতভাবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। একই সঙ্গে তেহরান প্রতিবেশী আরব দেশগুলোসহ মার্কিন ঘাঁটি ও ইসরায়েলে হামলা চালায়।

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিটার হেগসেথ দাবি করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের সামরিক শক্তি পঙ্গু হয়ে গেছে। তবে তাঁর সেই যুদ্ধংদেহী দাবি অতিরঞ্জিত ও মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়েছে।

এই যুদ্ধে ইসরায়েল ছিল যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ অংশীদার। কিন্তু সমঝোতা স্মারক নিয়ে আলোচনার সময় তাদের দূরে রাখা হয়। ফলে এ চুক্তিকে এখন চরম হতাশার সঙ্গে দেখছে ইসরায়েল।

২৮ ফেব্রুয়ারি বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছিলেন, তিনি সারা জীবন এ সুযোগের (ইরান যুদ্ধ) জন্যই অপেক্ষা করেছেন। তিনি ইরানের বর্তমান সরকারকে ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন। তবে এখন উল্টো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। দেশের নিরাপত্তাঝুঁকির মুখে ফেলার অভিযোগে এখন নিজ দেশের রাজনৈতিক বিরোধীদের তোপের মুখে পড়েছেন তিনি।

আগামী অক্টোবর মাসের শেষে ইসরায়েলে সাধারণ নির্বাচন হওয়ার কথা। নির্বাচনের আগপর্যন্ত নেতানিয়াহুকে ইরান যুদ্ধ নিয়ে নানা অভিযোগ ও যুদ্ধের পরিণাম সামলাতে হবে।

গত রোববার ওমানের মুসান্দাম থেকে দেখা হরমুজ প্রণালি। ১৪ জুন ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

তবে যুদ্ধবিরতির চুক্তির পথে বড় বাধা হতে পারে লেবানন। ইসরায়েল লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের একটি বিশাল এলাকা দখল করে রাখার ঘোষণা দিয়েছে। সেখান থেকে তারা সাধারণ মানুষকে তাড়িয়ে দিয়েছে এবং হাজার হাজার ভবন ধ্বংস করেছে। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেছেন, লেবানন, সিরিয়া ও গাজায় তাঁদের দখলদারি ‘অনির্দিষ্টকাল’ চলবে।

নেতানিয়াহু এখন তাঁর মন্ত্রিসভার কট্টরপন্থী ও রাজনৈতিক বিরোধীদের চাপে আছেন। তাঁরা লেবাননে আরও হামলার দাবি তুলছেন। কেউ কেউ লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল স্থায়ীভাবে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন। তবে ট্রাম্প ইদানীং নেতানিয়াহুর ওপর বেশ বিরক্ত। ট্রাম্পের অবাধ্য হয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক আরও খারাপ করতে পারবেন কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

রোববার বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলের বিমান হামলা ছিল মূলত শান্তি আলোচনা পণ্ড করার একটি চেষ্টা। কিন্তু এতে হিতে বিপরীত হয়েছে। হামলার ফলে পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে আলোচনার গতি উল্টো আরও বেড়েছে।

আপাতত দুই পক্ষই (ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র) একটু হাঁফ ছাড়ার সুযোগ পেয়েছে। তবে এ সমঝোতা স্মারক বড় কোনো চুক্তিতে রূপ নেবে কি না, তা বলার সময় এখনো আসেনি। এমন চুক্তি হলে মধ্যপ্রাচ্যের চেহারা বদলে যেত। কিন্তু আস্থার সংকট ও আদর্শিক লড়াইয়ের কারণে এটি এখনো এক ‘আকাশকুসুম কল্পনা’ হয়ে আছে।

পুরো ঘটনা সবার জন্যই দুঃখজনক একটি অভিজ্ঞতা হয়ে আছে। ট্রাম্প ইরানি জনগণকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁরা এখনো সেই কঠোর শাসনের মধ্যে আছেন। তেহরানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী গত জানুয়ারিতেও রাজপথের আন্দোলন কঠোর হাতে দমন করেছে। তাতে প্রাণ গেছে অনেকের।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি এখনো প্রবল। তবে ট্রাম্পের এ হুট করে যুদ্ধে জড়ানোর সিদ্ধান্ত একটি বার্তাই দিচ্ছে। আর তা হলো, পরিবর্তনশীল বিশ্বে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে তারা হিমশিম খাচ্ছে।