৪ জানুয়ারি ২০০৭

প্রথম নারী স্পিকার

ন্যান্সি পেলোসি বহুবার এ কথা বলেছেন, দেশের শিশুদের মঙ্গলের চেয়ে আর কোনো একক সমস্যাই তাঁকে অতটা তাড়া করে ফেরে না। তিনি প্রথমবার যখন স্পিকার নির্বাচিত হন, তখন আইনপ্রণেতাদের সন্তান-সন্ততিদের ক্যাপিটল হিলে আমন্ত্রণ জানান। ২০১৯ সালে দ্বিতীয়বার স্পিকার হওয়ার পর পেলোসি আবারও একই কাজ করেন। পাঁচ সন্তানের জননী পেলোসি রাজনীতিতে আসার আগে সন্তান লালন-পালন করেছেন। সেই শিক্ষা তাঁকে রাজনীতিকদের কীভাবে চালাতে হয়, শিখিয়েছে। পেলোসি ছয় বছর বয়সে প্রথম ক্যাপিটল হিলে যান। পেলোসি বলেন, ‘আমি কোনো দিনও ভাবিনি যে কখনো গৃহিণী থেকে হাউস স্পিকার হব।’

২২-২৩ মার্চ ২০১০
অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্ট বা ওবামাকেয়ার পাস

ট্রাম্পের আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ছিলেন ডেমোক্রেটিকদলীয় বারাক ওবামা। তাঁর শাসনামলে অ্যাফর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্ট বা ওবামা কেয়ার আইনের সাফল্যের মুখ দেখে। তবে স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি ছাড়া ওবামা প্রশাসনের যুগান্তকারী এ আইন হয়তো শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখত কি না, অনেকেই সে কথা তোলেন। এর পক্ষে ছিলেন না, এমন আইনপ্রণেতাদের সমর্থন আদায় করতে সমর্থ হন। আইনটি পাসের মাধ্যমে স্বাস্থবিমা নেই, এমন আমেরিকানদের জন্য স্বাস্থ্যসেবার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। এ আইনের কারণে সাড়ে তিন কোটির বেশি আমেরিকান এখন স্বাস্থ্যসেবা ছাড়াও প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী পাচ্ছে। ন্যান্সি পেলোসি সম্প্রতি এক বক্তৃতায় অ্যাফর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্টকে তাঁর একটি ‘বড় অর্জন’ বলে অভিহিত করেন।

১১ ডিসেম্বর ২০১৮
হোয়াইট হাউসে বাগ্‌বিতণ্ডা

২০১৮ সালে মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পান। এর কয়েক সপ্তাহ পরই পেলোসি ও উচ্চকক্ষ সিনেটের সংখ্যালঘু দল ডেমোক্র্যাটদের নেতা চাক শুমার হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যান। হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্টের কার্যালয় ওভাল অফিসে তাঁরা বৈঠকে বসেন। তবে সেই বৈঠকে ট্রাম্পের সঙ্গে বাগ্‌বিতণ্ডায় জড়ান পেলোসি। টেলিভিশনে সেই বৈঠক সম্প্রচারিত হয়েছিল। সেখানে ট্রাম্প পেলোসিকে সস্তা একজন ব্যক্তিত্ব হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে ট্রাম্পের উদ্দেশে পেলোসি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট আমি যে সমর্থন পেয়ে এ পর্যায়ে এসেছি, তাকে দুর্বল ভাববেন না।’ তবে সে বাগ্‌বিতণ্ডায় শেষ পর্যন্ত পেলোসিই জয়ী হন এবং বীরের বেশে রোদচশমা চোখে হালকা কমলা রঙের কোট পরে হোয়াইট হাউস থেকে বেরিয়ে আসেন।

৩ জানুয়ারি ২০১৯
বামপন্থীদের নিয়ে সমস্যা

মধ্যপন্থী ডেমোক্রেটিক পার্টিতে কিছু আইনপ্রণেতা আছেন, যাঁরা অন্যদের তুলনায় বেশিই বামঘেঁষা। এই আইনপ্রণেতাদের প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাটও বলা হয়। এই আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে বোঝাপড়া নিয়ে পেলোসির সমস্যা ছিল। ২০১৮ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে নিউইয়র্ক থেকে নির্বাচিত কংগ্রেস উইমেন আলেক্সান্দ্রা ওকাসিও কর্তেজ হচ্ছেন তেমনি একজন বামঘেঁষা ডেমোক্র্যাট। তাঁর সঙ্গে নিম্নকক্ষে আরও চারজন নারী আইনপ্রণেতা ছিলেন, যাঁরা সবাই উদারপন্থী রাজনীতিক হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। এই চারজনের সঙ্গে পেলোসির সম্পর্ক ভালো ছিল না। মাঝেমধ্যে তাঁদের সঙ্গে পেলোসির সম্পর্কে উত্তেজনাও ছড়িয়েছে। কারণ, এই চারজন নারী আইনপ্রণেতা স্পিকার পেলোসিকে নীতিগত জায়গা থেকে আরও কঠোর অবস্থান নেওয়ার কথা বলেন। কিন্তু পেলোসি এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯
সেই হাততালি

প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের সেটাই ছিল প্রথম ‘স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন’ ভাষণ। ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে থাকা প্রতিনিধি পরিষদে ডোনাল্ড ট্রাম্প জাতির উদ্দেশে দেওয়া প্রথম ভাষণে ‘প্রতিশোধের রাজনীতি’ শেষ করার আহ্বান জানান। স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি ট্রাম্পের সেই বক্তব্যের প্রশংসা করে হাততালিও দিয়েছিলেন। পরে দেখা যায়, সে হাততালি অন্য রকম। সেটি অনলাইনেও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। পেলোসির দাবি, প্রেসিডেন্টকে ব্যঙ্গ করার কোনো উদ্দেশ্য তাঁর ছিল না। তবে পেলোসি ব্যঙ্গ করেননি দাবি করলেও এরপর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ক্ষমতায় থাকার পরের দুই বছর তাঁদের সম্পর্ক প্রমাণ করে পেলোসি ব্যঙ্গই করেছিলেন।

১৬ অক্টোবর ২০১৯
একা একজন নারী

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়াদের শেষ দুই বছর পেলোসি স্পিকার ছিলেন। এ সময়ে ট্রাম্পের সঙ্গে পেলোসির বিবাদ প্রাত্যহিক একটি বিষয়ে পরিণত হয়। ২০১৯ সালে সিরিয়া বিষয়ে একটি বিতর্কিত বৈঠকের পর ট্রাম্প হোয়াইট হাউসের একজন চিত্রগ্রাহকের তোলা একটি ছবি টুইট করেছিলেন। সেখানে দেখা যায়, একটি লম্বা টেবিলের প্রায় পুরোটাজুড়ে একদল পুরুষ বসে আছেন। সেখানে স্পিকার পেলোসি দাঁড়িয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দিকে তাঁর আঙুল তুলে কথা বলছেন।

১৮ ডিসেম্বর ২০১৯
ট্রাম্পকে প্রথমবার অভিশংসন

কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিশংসনপ্রক্রিয়া নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন ন্যান্সি পেলোসি। তিনি ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতাদের একটি আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করার নির্দেশ দেন। ট্রাম্পকে অভিশংসনে নিম্নকক্ষের আইনপ্রণেতাদের ভোটের বিষয়টি পেলোসি ব্যক্তিগতভাবে তত্ত্বাবধান করেন। তাঁর নেতৃত্বেই তৃতীয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প নিম্নকক্ষে অভিংশসিত হন। ক্ষমতার অপব্যবহার ও কংগ্রেসের কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে ২০১৯ সালে প্রতিনিধি পরিষদ ট্রাম্পকে অভিশংসন করে। তবে কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটে রিপাবলিকান পার্টি ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। তাই সিনেট ট্রাম্পকে খালাস দেয়। পেলোসি তখন বলেছিলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ব্যক্তিস্বার্থে আবার নির্বাচনে দুর্নীতির চেষ্টা করায় অভিশংসন ছাড়া আমাদের কোনো উপায় ছিল না।’

৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০ 

ট্রাম্পের ভাষণের কপি ছিঁড়ে ফেলেন ন্যান্সি পেলোসি

২০২০ সালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মার্কিন কংগ্রেসে স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণ দেন। ভাষণ শেষে ট্রাম্প যখন পেলোসির ডায়াসের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন সাদা স্যুট পরিহিত পেলোসি শক্ত মুখে দাঁড়িয়ে সেই ভাষণের কপি ছিঁড়ে ফেলেন। দৃশ্যত, পেলোসির এ কর্মকাণ্ডে ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হন। কিন্তু পরে পেলোসি দলের নেতাদের সঙ্গে এক রুদ্ধদার বৈঠকে বলেছিলেন, এটা করতে পেরে নিজেকে অনেক স্বাধীন মনে হয়েছে তাঁর। কেউ যদি সত্যিই কিছু ছিঁড়ে ফেলে থাকেন, তিনি হলেন ট্রাম্প, যিনি আমাদের সামনে ‘সত্যকে ছিন্নভিন্ন’ করেছেন। পরে অবশ্য পেলোসি বলেছেন, তিনি সেই ভাষণের ছিঁড়ে ফেলা টুকরাগুলো রেখে দিয়েছেন।

জানুয়ারি ২০২১

ক্যাপিটল হিলে হামলা এবং ট্রাম্পকে দ্বিতীয়বার অভিশংসন

২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে তখনকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জালিয়াতির অভিযোগ তুললে ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি তাঁর একদল উগ্র সমর্থক ক্যাপিটল হিলে হামলা চালান। এ ঘটনার পরপরই তৎপর হন পেলোসি। আইনপ্রণেতার জীবনের নিরাপত্তার কথা ভেবে ক্যাপিটল হিল ভবনের সুরক্ষার জন্য পেলোসি দ্রুতই কংগ্রেসের নেতাদের সঙ্গে কাজ শুরু করেন। ওই সময় কংগ্রেস বাইডেনের জয়ের বিষয়টি অনুমোদন দেওয়ার কাজ করছিল। এ ঘটনার পরপরই স্পিকার পেলোসি ট্রাম্পকে দ্বিতীয়বার অভিশংসনের প্রক্রিয়া শুরু করেন। পরে এক সাক্ষাত্কারে পেলোসি এ নিয়ে রসিকতা করে বলেছিলেন, ‘তিনি তাঁর চার ইঞ্চি লম্বা হিল দিয়ে দাঙ্গাকারীদের প্রতিরোধ করতেন।’ তাঁর কথায়, ‘আমি বেশ কঠোর। আমি মাঠে লড়াই করা মানুষ। তাঁদের সঙ্গে হয়তো একটি লড়াই হতো।’

৩ আগস্ট ২০২২
তাইওয়ান সফর

কংগ্রেসে যত দিন ছিলেন, মানবাধিকার বিষয়ে সোচ্চার ছিলেন পেলোসি। বিশেষ করে চীনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে। পেলোসি এটিকে তাঁর কংগ্রেস–জীবনের একটি প্রধান ইস্যু করে তুলেছিলেন। গত গ্রীষ্মে তাইওয়ান সফর করে বেইজিংকে উদ্বেগের মধ্যে ফেলে দিয়েছিলেন তিনি। কারণ, চীন সব সময় তাইওয়ানকে নিজেদের বলে দাবি করে থাকে। তাই বেইজিং পেলোসির সফরের সমালোচনা করে। চীনকে উসকানি দেওয়া হবে, এ শঙ্কায় প্রেসিডেন্ট বাইডেন প্রশাসনও তাঁর এ সফরের অনুমতি দিতে অপারগতা জানিয়েছিল।