গ্রিসে মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে পদত্যাগের নির্দেশ ট্রাম্পের, কারণ কী
গ্রিসে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত কিম্বারলি গিলফয়েলকে পদত্যাগ করতে বলেছে হোয়াইট হাউস। অর্থ, উপহার ও বিভিন্ন সুবিধার বিনিময়ে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগে তাঁকে এ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে গিলফয়েলের বিরুদ্ধে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর এই সিদ্ধান্ত এল।
অর্থ, উপহার ও বিভিন্ন সুবিধার বিনিময়ে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগে গ্রিসে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত কিম্বারলি গিলফয়েলকে পদত্যাগ করতে বলেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর বিরুদ্ধে মার্কিন সংবাদমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর এ সিদ্ধান্ত এল।
একসময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়রের সঙ্গে গিলফয়েলের বাগ্দান হয়েছিল।
ট্রাম্প গত সোমবার বলেছিলেন, গিলফয়েলকে বরখাস্ত করার বিষয়টি তিনি বিবেচনা করছেন। আর গতকাল মঙ্গলবার তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘তিনি ভালো কাজ করছিলেন, কিন্তু আমরা যা পড়ছিলাম, তা আমাদের পছন্দ হয়নি।’
গত মাস থেকে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে গিলফয়েলের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। এসব প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, গ্রিস সরকারকে চাপে ফেলতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব খাটানোর হুমকিও দিয়েছিলেন তিনি। এর পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন আইনপ্রণেতারাও উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
হোয়াইট হাউসের নতুন প্রেস সেক্রেটারি কেটি জাকারাইয়া গতকাল এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে গিলফয়েলকে পদত্যাগ করতে বলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘তিনি আমাদের দলের জন্য অসাধারণ সম্পদ ছিলেন। আমরা তাঁর ভবিষ্যৎ জীবনের সাফল্য কামনা করি।’
এক্সে দেওয়া এক পোস্টে গিলফয়েল তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর প্রতি তাঁর কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধা ‘অটুট’ আছে।
গিলফয়েল আরও লিখেছেন, ‘রাষ্ট্রদূত হিসেবে আমার দায়িত্ব হয়তো শেষ হতে যাচ্ছে, কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, আমেরিকা ফার্স্ট আন্দোলন এবং আমার প্রিয় দেশের প্রতি আমার অঙ্গীকার কখনো শেষ হবে না। এসব অভিযোগ মিথ্যা। আমার নাম, সুনাম ও সততা রক্ষায় আমি জোরালোভাবে লড়াই করব।’
অর্থের বিনিময়ে যোগাযোগের সুযোগ দেওয়ার অভিযোগ
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের একটি প্রতিবেদনে গ্রিসের একটি জ্বালানি কোম্পানির লবিস্টের সঙ্গে গিলফয়েলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং ওই কোম্পানির পক্ষে তাঁর প্রচারণার কথা তুলে ধরা হয়। আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্পের ছেলে এরিকের সম্মানে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে আয়োজিত একটি নৈশভোজে আমন্ত্রণ পাওয়ার চেষ্টা করার সময় ধনী গ্রিক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক নিয়ে বড়াই করেছিলেন গিলফয়েল। এ বিষয়ে একটি অডিও রেকর্ডিংয়ের কথাও উল্লেখ করা হয়।
মার্কিন ব্যবসায়ী এরিক ডিটার্স সংবাদপত্রটিকে বলেন, সাবেক সান ফ্রান্সিসকো প্রসিকিউটর গিলফয়েল অর্থের বিনিময়ে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ করে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। একপর্যায়ে গিলফয়েল তাঁর কাছে ক্রেডিট কার্ডের এক লাখ ডলারের বিল পরিশোধের অনুরোধ করেছিলেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ডেইলি মেইল গত সপ্তাহে জানিয়েছে, এথেন্সে মার্কিন দূতাবাসের কর্মীদের কাছ থেকে পাওয়া অনুপযুক্ত আচরণসংক্রান্ত অভিযোগ খতিয়ে দেখছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের অভ্যন্তরীণ তদারকি বিভাগ।
গিলফয়েলের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন নিয়ে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে গ্রিস সরকার কোনো মন্তব্য করেনি। এ বিষয়ে জানতে চেয়ে যোগাযোগ করা হলেও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ও এথেন্সে মার্কিন দূতাবাসের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
চুক্তি ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন
যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ন্যাটো মিত্র গ্রিস। পূর্ব ভূমধ্যসাগরের নিরাপত্তা রক্ষায় দেশটি যুক্তরাষ্ট্রকে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা ব্যবহারের সুযোগ দেয়। এ ছাড়া লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) একটি সামুদ্রিক অভিযানের নেতৃত্ব দিচ্ছে গ্রিস।
গত সপ্তাহে এথেন্স সফরে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, সন্ত্রাসবাদ দমনে দুই দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময়ের নতুন উদ্যোগ শুরু হচ্ছে।
গ্রিসে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই আলোচনায় ছিলেন গিলফয়েল। তিনি ভোগ গ্রিস ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে জায়গা পেয়েছিলেন। গ্রিসের তারকাদের সঙ্গে গভীর রাত পর্যন্ত বিভিন্ন পার্টিতেও অংশ নিয়েছিলেন।
দায়িত্ব পালনকালে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন চুক্তির পক্ষে সক্রিয় ছিলেন গিলফয়েল। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি এবং এক্সনমবিলসহ বিভিন্ন কোম্পানির সঙ্গে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানসংক্রান্ত চুক্তি ছিল।
তবে গিলফয়েলের কিছু বক্তব্য দুই দেশের বাইরেও কূটনৈতিক বিতর্ক তৈরি করে। গত বছরের নভেম্বরে গ্রিসে পৌঁছানোর পর স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া প্রথম সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, চীনের উচিত পিরেয়ুস বন্দরে থাকা তাদের ৬৭ শতাংশ মালিকানা বিক্রি করে দেওয়া। বন্দরটি বেইজিংয়ের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
গিলফয়েলের ওই বক্তব্যের জবাবে গ্রিসে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ফাং চিউ যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘সেকেলে ও ক্ষতিকর মানসিকতা’ এবং ‘আধিপত্যবাদী মনোভাব’ পোষণের অভিযোগ তোলেন।
গ্রিসের বিরোধী দল পাসোকের (পিএএসওকে) পররাষ্ট্রবিষয়ক মুখপাত্র দিমিত্রিস মানৎসোস বলেন, গিলফয়েলকে বরখাস্ত করার ঘটনায় কিছু প্রশ্ন উঠেছে, যেগুলোর উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। গ্রিক কর্মকর্তারা এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চাইবেন কি না, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
মানৎসোস বলেন, গ্রিস কি এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চাইবে, নাকি দেশটি বাইরের স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ‘নাট্যমঞ্চ’ হয়ে থাকলেও তা মেনে নেবে?