ডেমোক্র্যাটদের মোকাবিলায় আরও আক্রমণাত্মক হতে যাচ্ছেন ট্রাম্প
মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলে বড় ধাক্কার পর হোয়াইট হাউসে কট্টরপন্থী স্টিফেন মিলারকে দায়িত্বে আনলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
তাঁর কঠোর অভিবাসননীতির অন্যতম রূপকার মিলার হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ হচ্ছেন। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর এই নিয়োগের মধ্য দিয়ে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিলেন, ডেমোক্র্যাটদের মোকাবিলায় তিনি আরও আক্রমণাত্মক হতে যাচ্ছেন।
গতকাল শনিবার রাত সোয়া নয়টায় এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫ আসনের মধ্যে ডেমোক্রেটিক পার্টি ২৫৪ আসনে জয়ী হয়েছে বলে জানিয়েছে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস। একই সময় পর্যন্ত রিপাবলিকান পার্টি পেয়েছে ১৬২ আসন। ফল ঘোষণা বাকি রয়েছে ১৯ আসনের। নিম্নকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন হয় ২১৮ আসন। আর ১০০ আসনের উচ্চকক্ষ সিনেটে ডেমোক্রেটিক পার্টির এখন ৫৪ এবং রিপাবলিকান পার্টির ৪৪ আসন রয়েছে। সিনেটের দুটি আসনের ফল ঘোষণা বাকি। এবার সিনেটের ৩৫ আসনে ভোট গ্রহণ হয়েছে।
নির্বাচনে হারের পর প্রশাসনে রদবদল শুরু করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজের ‘সিক্সটি মিনিটস’ অনুষ্ঠানে মন্ত্রিসভায় কিছু পরিবর্তন আনার কথা জানানোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই গত শুক্রবার মিলারের নিয়োগের কথা ঘোষণা করেন। সুসি ওয়াইলসের স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন মিলার। আগামীকাল সোমবার থেকে মিলারের নতুন দায়িত্ব নেওয়ার কথা রয়েছে।
নির্বাচনের পর ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ দেখিয়েছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু ‘আপসহীন’ মিলারকে বেছে নেওয়ায় ট্রাম্পের সেই আগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ডেমোক্র্যাটরা বলছেন, ভোটের ধাক্কা থেকেও শিক্ষা নেননি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। কিছু রিপাবলিকানও ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন।
মিলারকে নিয়োগ দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি একটি পরিবর্তন আনতে চেয়েছিলাম।’ মিলারকে পাশে নিয়ে তিনি বলেন, ‘মিলার দারুণ লড়াকু। শুরু থেকেই আমার সঙ্গে আছেন। তিনি খুবই বিশ্বস্ত।’
আপসের বার্তার পর লড়াইয়ের প্রস্তুতি
কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালেও ট্রাম্প আরও দুই বছর ক্ষমতায় থাকছেন। এই সময়ে তাঁর প্রশাসনের নানা কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্তের প্রস্তুতি নিচ্ছেন ডেমোক্র্যাটরা। এমন পরিস্থিতিতে হোয়াইট হাউস সামলানোর দায়িত্ব পেলেন প্রেসিডেন্টের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযোগীদের একজন—স্টিফেন মিলার।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কারা দেখা করবেন, হোয়াইট হাউসের অগ্রাধিকার কী হবে, তা মূলত হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ নির্ধারণ করেন। কংগ্রেসের সঙ্গে দর-কষাকষিতেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে।
মিলারকে নিয়োগ দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি একটি পরিবর্তন আনতে চেয়েছিলাম।’ মিলারকে পাশে নিয়ে তিনি বলেন, ‘মিলার দারুণ লড়াকু। শুরু থেকেই আমার সঙ্গে আছেন। তিনি খুবই বিশ্বস্ত।’
হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন, এ নিয়োগের মধ্য দিয়ে বোঝা যাচ্ছে, ট্রাম্প তাঁর নীতি পুনর্বিবেচনা করছেন না। বরং সবচেয়ে অনুগত সহযোগীদের পুরস্কৃত করছেন। ওই কর্মকর্তার ভাষায়, ‘তিনি পথ বদলাচ্ছেন না।’
নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক প্রচার ও জনসংযোগের কাজ নিয়ে অসন্তুষ্ট ছিলেন ট্রাম্প। বিষয়টি সম্পর্কে জানেন, এমন এক ব্যক্তি রয়টার্সকে বলেছেন, ট্রাম্প মনে করেন, ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের ক্ষমতায় ফেরায় হোয়াইট হাউসকে ‘আরও আক্রমণাত্মক’ হতে হবে।
স্টিফেন মিলার প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা ব্যাপকভাবে ব্যবহারের ঘোর সমর্থক। কংগ্রেসের দুই কক্ষেই দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোয় নিজের কর্মসূচি এগিয়ে নিতে ট্রাম্পকে এখন নির্বাহী ক্ষমতার ওপর আরও নির্ভর করতে হতে পারে।
অভিবাসী বিতাড়নের রূপকার
৪১ বছর বয়সী মিলার এত দিন ট্রাম্পের নীতিবিষয়ক ডেপুটি চিফ অব স্টাফ ছিলেন। প্রতিদিন তিন হাজার অভিবাসী গ্রেপ্তারের লক্ষ্য নির্ধারণসহ ট্রাম্পের ব্যাপক ধরপাকড় ও বিতাড়ন কর্মসূচিতে তাঁর বড় ভূমিকা রয়েছে।
লক্ষ্য পূরণে মুখোশধারী অভিবাসন কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়েছেন। অপরাধের রেকর্ড নেই, এমনকি কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন, এমন মানুষও গ্রেপ্তার হয়েছেন।
ট্রাম্পের এ নীতি তেমন জনসমর্থন পায়নি। চলতি সপ্তাহের শুরুতে শেষ হওয়া রয়টার্স–ইপসোস জরিপে ৫৪ শতাংশ উত্তরদাতা অভিযানের বিরোধিতা করেছেন। সমর্থন করেছেন ৩৬ শতাংশ।
‘বিপজ্জনক বিদেশিবিদ্বেষী’
সিনেটের ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার বলেছেন, মিলারকে নিয়োগ দিয়ে ট্রাম্প ভুল করেছেন। তাঁর ভাষায়, ‘ট্রাম্প এর চেয়ে খারাপ সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন না।’
মিলারকে ‘বিপজ্জনক বিদেশিবিদ্বেষী ও বেপরোয়া চরমপন্থী’ বলে অভিহিত করেছেন প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফ্রিস। ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য রবার্ট গার্সিয়া জানিয়েছেন, অভিবাসননীতি নিয়ে মিলারের বিরুদ্ধে তদন্ত চালানো হবে।
দ্য গার্ডিয়ান–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, রিপাবলিকান শিবির থেকেও সমালোচনা এসেছে। ইন্ডিয়ানার কংগ্রেস সদস্য মার্লিন স্টুটজম্যান এই নিয়োগকে ‘ভয়াবহ সিদ্ধান্ত’ বলেছেন। তবে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথসহ ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠরা উচ্ছ্বসিত। মিলারও জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্টকে সমর্থন দিতে সর্বশক্তি দিয়ে লড়াই করাই এখন তাঁর লক্ষ্য।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে সমালোচনার মুখে থাকা হেগসেথের ওপর অবশ্য এ পর্যন্ত প্রকাশ্যে আস্থা রেখেছেন ট্রাম্প। আপাতত হেগসেথের পদ নিরাপদ সিবিএসকে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
বিদায়ী চিফ অব স্টাফ ওয়াইলস ট্রাম্পের রাজনৈতিক কার্যক্রমে যুক্ত হবেন। হোয়াইট হাউসের প্রথম নারী চিফ অব স্টাফ হিসেবে কর্মীদের মধ্যে শৃঙ্খলা বজায় রাখার কৃতিত্ব দেওয়া হয় তাঁকে।
নির্বাচনের আগে ওয়াইলসকে সরানোর সম্ভাবনা বারবার উড়িয়ে দিয়েছিলেন ট্রাম্প। তবে এখন আরও রদবদলের আভাস দিচ্ছেন। সাক্ষাৎকারে সিবিএসকে তিনি বলেছেন, মন্ত্রিসভার সদস্যরা ভালো কাজ করছেন। তারপরও কিছু পরিবর্তন আনতে পারেন। তবে কারা বাদ পড়তে পারেন, তা জানাননি।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে সমালোচনার মুখে থাকা হেগসেথের ওপর অবশ্য এ পর্যন্ত প্রকাশ্যে আস্থা রেখেছেন ট্রাম্প। আপাতত হেগসেথের পদ নিরাপদ সিবিএসকে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।