ইলন মাস্কের স্পেসএক্স শেয়ারবাজারে আসার পরিকল্পনা করছে, প্রক্রিয়াটি কেমন হবে
গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে কয়েক শ কোম্পানি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে শেয়ার বিক্রি করে মোট ৭ হাজার কোটি ডলার সংগ্রহ করেছিল।
তবে ২০২৬ সালে সেই রেকর্ড ভেঙে যেতে পারে। কারণ, রকেট ও মহাকাশ প্রযুক্তি কোম্পানি স্পেসএক্স, চ্যাটজিপিটি নির্মাতা ওপেনএআই ও এআই স্টার্টআপ অ্যানথ্রোপিক—সব কটিই সম্ভবত শেয়ারবাজারে যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে।
এখন প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্রে একটি কোম্পানির শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হতে ঠিক কী প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়?
এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা ইনিশিয়াল পাবলিক অফারিং (আইপিও)। সাধারণত এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে কয়েক মাস থেকে কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লাগে। এতে লাখ লাখ ডলার খরচ হতে পারে।
কীভাবে কাজ করে এই প্রক্রিয়া
শেয়ারবাজার বেছে নেওয়া: আইপিওর পথে কোম্পানির প্রথম বড় কাজ হলো, তারা কোন শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া।
যুক্তরাষ্ট্রে মূলত দুটি শেয়ারবাজার সবচেয়ে বেশি প্রভাবশালী। সেগুলো হলো—নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জ (এনওয়াইএসই) ও ন্যাসড্যাক।
এনওয়াইএসই সবচেয়ে পুরোনো ও বিখ্যাত শেয়ারবাজার। এর ঐতিহ্যবাহী ট্রেডিং ফ্লোর নিউইয়র্কের লোয়ার ম্যানহাটানে অবস্থিত।
অন্যদিকে ন্যাসড্যাক পুরোপুরি ইলেকট্রনিকভিত্তিক একটি শেয়ারবাজার। এখানে বিশ্বের বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানির শেয়ার লেনদেন হয়।
এই দুই শেয়ারবাজার মিলে বিশ্বজুড়ে লেনদেন হওয়া মোট শেয়ারের মূল্যের প্রায় অর্ধেক নিয়ন্ত্রণ করে।
কোম্পানিগুলোকে শেয়ারবাজারে যুক্ত হওয়ার সময় একটি ‘টিকার’বেছে নিতে হয়। এটি কয়েকটি অক্ষরের সংক্ষিপ্ত কোড। এর মাধ্যমে কোম্পানির শেয়ারকে শনাক্ত করা হয়।
কিছু কোম্পানি সহজ টিকার ব্যবহার করে। যেমন মাইক্রোসফটের টিকার হলো ‘এমএসএফটি’। আবার কিছু কোম্পানি একটু সৃজনশীল নাম নেয়। যেমন ডোনাট কোম্পানি ক্রিসপি ক্রিমের টিকার ‘ডিএনইউটি’ বা ডোনাট। আবার গাড়ি ভাড়া প্রদানকারী কোম্পানি এভিসের টিকার হলো ‘সিএআর’ বা কার।
‘এস-১’ জমা: কোনো কোম্পানি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে শেয়ার বিক্রি করার আগে তাদের যুক্তরাষ্ট্রের বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) কাছে ‘এস-১’ নামের একটি বিস্তারিত নথি জমা দিতে হয়।
এসইসি যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক বাজার তদারককারী সরকারি সংস্থা। এটি কার্যত ওয়াল স্ট্রিটের রেফারি হিসেবে কাজ করে।
এস-১ নথিতে কোম্পানির আর্থিক অবস্থা, ব্যবসায়িক মডেল ও সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়। এর উদ্দেশ্য হলো, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করা।
মার্কিন বহুজাতিক বিনিয়োগ ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান জেপি মরগ্যান চেজের ভাষায়, এই নথির দুটি উদ্দেশ্য আছে। আর তা হলো—এসইসির কাছে সিকিউরিটিজ নিবন্ধন করা এবং বিনিয়োগকারীদের সম্ভাব্য বিনিয়োগের সুযোগ সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো।
এরপর এসইসি সেই নথি পর্যালোচনা করে। তারা কোম্পানির কাছে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইতে পারে।
সম্প্রতি এসইসির চেয়ারম্যান পল অ্যাটকিনস বলেন, এস-১ জমার ক্ষেত্রে অনেক সময় কর্মকর্তাদের দিক থেকে একাধিক দফায় মন্তব্য ও প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। তাই পুরো প্রক্রিয়াটি শেষ হতে কয়েক মাসও লেগে যেতে পারে।
তবে পল অ্যাটকিনস বলেন, সংস্থাটি এই প্রক্রিয়া আরও দ্রুত করার জন্য কাজ করছে।
বিষয়টির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের তথ্যমতে, স্পেসএক্স চলতি সপ্তাহেই তাদের এস-১ নথি জমা দিতে পারে।
বিনিয়োগ টানার প্রচার: কাগজপত্রের কাজ শুরু হলে কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তারা প্রচারে নামেন। তাঁরা শহর থেকে শহরে ঘুরে বিনিয়োগকারীদের কাছে নিজেদের কোম্পানির পরিকল্পনা ও সম্ভাবনা তুলে ধরেন। ভিডিও কলের মাধ্যমেও এই উপস্থাপনা চলে। পুরো প্রক্রিয়াটিকে বলা হয় ‘রোড শো’।
পেনশন ফান্ড, হেজ ফান্ডের মতো বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি সাধারণ খুচরা বিনিয়োগকারীদের কাছেও কোম্পানিগুলো নিজেদের সম্ভাবনা তুলে ধরে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনবিসির তথ্য অনুযায়ী, স্পেসএক্স আগামী জুনে প্রায় ১ হাজার ৫০০ ব্যক্তি বিনিয়োগকারীর জন্য একটি বিশেষ আয়োজন করার পরিকল্পনা করছে।
তবে সব কোম্পানি এই ধাপ পার হতে পারে না। ফিনটেক প্রতিষ্ঠান ক্লিয়ার স্ট্রিট গত ফেব্রুয়ারিতে তাদের আইপিও পরিকল্পনা বাতিল করে। বাজারের অস্থিরতার কারণে পর্যাপ্ত বিনিয়োগকারীর আগ্রহ তৈরি করতে না পারাকেই তারা এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
শেয়ারের দাম নির্ধারণ: আইপিও প্রক্রিয়ার সবচেয়ে কঠিন অংশগুলোর একটি হলো শেয়ারের মূল্য নির্ধারণ। অর্থাৎ শেয়ারবাজারে প্রথমবার তালিকাভুক্ত হওয়ার সময় কোম্পানির মালিকানার একটি অংশের দাম কত হবে, সেটিই ঠিক করতে হয়।
রেনেসাঁ ক্যাপিটালের আইপিও বিশেষজ্ঞ ম্যাথিউ কেনির মতে, আইপিওর মূল্য নির্ধারণ পুরোপুরি গাণিতিক হিসাবের বিষয় নয়, শিল্পসুলভ বিচারও গুরুত্বপূর্ণ।
কোম্পানির পরামর্শক ব্যাংকগুলো সাধারণত যত বেশি সম্ভব অর্থ তুলতে চায়। তবে একই সঙ্গে তাদের এমন দামও ঠিক করতে হয়, যেন লেনদেন শুরু হওয়ার পর শেয়ারের দাম আরও বাড়ার সুযোগ থাকে। না হলে বিনিয়োগকারীরা আগ্রহ হারাতে পারেন।
রেনেসাঁ ক্যাপিটালের ম্যাথিউ কেনি বলেন, ‘আপনি যদি শেয়ারের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে তুলতে যান, তাহলে তালিকাভুক্তির পরের বাজারে চাহিদা খুব কমে যেতে পারে। তখন আইপিও ব্যর্থও হতে পারে। কেউই উদ্বোধনী ঘণ্টা বাজিয়ে লেনদেন শুরু হওয়ার দিন নিজের শেয়ারের দাম পড়ে যেতে দেখতে চায় না।’
অনেক সময় কোম্পানিগুলো শুরুতেই সঠিক মূল্য নির্ধারণ করতে পারে না। আর পরে তা পরিবর্তন করতে হয়।
চিপ স্টার্টআপ সেরেব্রাস শেয়ারবাজারে আসার আগে দুবার তাদের লক্ষ্যমাত্রার মূল্য সংশোধন করেছিল। শেষপর্যন্ত তারা প্রতি শেয়ারের দাম ১৮৫ ডলার নির্ধারণ করে বাজারে আসে। পরে প্রথম দিনেই তাদের শেয়ারের দাম ৬৮ শতাংশ বেড়ে যায়।