প্রথম দিনেই তিনি বিশ্বকে একটি বার্তা দিয়েছিলেন।
‘কোনো কিছুই আমাদের পথে দাঁড়াতে পারবে না,’ গত বছর ২০ জানুয়ারি ওয়াশিংটনে এক হাড়কাঁপানো শীতের সকালে নিজের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে অভিষেক ভাষণ শেষ করার সময় গগনবিদারী করতালির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ ঘোষণা দিয়েছিলেন।
বিশ্ব কি (ট্রাম্পের এই হুঁশিয়ারিকে) যথেষ্ট গুরুত্ব দিতে ব্যর্থ হয়েছিল?
ট্রাম্প তাঁর ভাষণের মধ্যেই উনিশ শতকের ‘ম্যানিফেস্ট ডেসটিনি’ মতবাদের কথা উল্লেখ করেন। এটি এমন এক ধারণা যাতে মনে করা হয়, পুরো মহাদেশে নিজেদের এলাকা সম্প্রসারণ করা এবং আমেরিকান নীতিগুলো ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে স্বয়ং ঈশ্বর বেছে নিয়েছেন।
সে সময় ট্রাম্পের নজর ছিল পানামা খালের দিকে। ট্রাম্প ঘোষণা করেন, ‘আমরা এটা ফিরিয়ে নিচ্ছি।’
এখন সেই একই ঘোষণা, একই রকম দৃঢ়সংকল্প নিয়ে তাক করা হয়েছে গ্রিনল্যান্ডের দিকে।
‘এটা আমাদের পেতেই হবে’—এটাই এখন নতুন মন্ত্র। মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ এক মুহূর্তে এটি যেন এক চাঁছাছোলা বার্তা।
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত আগ্রাসন, দখলদারত্ব এবং শাসক ও সরকার পতনের জন্য চালানো গোপন অভিযানের নজির রয়েছে। কিন্তু গত এক শতাব্দীতে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট দীর্ঘদিনের একটি মিত্রদেশের ভূমি দখল করে সেখানকার জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে শাসন করার হুমকি দেননি।
কোনো মার্কিন নেতা এতটা নির্দয়ভাবে রাজনৈতিক প্রথা ভাঙেননি বা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে বিশ্বব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা দীর্ঘস্থায়ী জোটগুলোকে এতটা হুমকির মুখে ফেলেননি।
পুরোনো নিয়মগুলো যে আজ নির্বিচারে ভাঙা হচ্ছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
ট্রাম্পকে এখন যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভবত সবচেয়ে ‘আমূল বদলে দেওয়া’ প্রেসিডেন্ট হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে। দেশে-বিদেশে তাঁর সমর্থকেরা উচ্ছ্বসিত; কিন্তু বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজধানীতে অন্যদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। আর মস্কো ও বেইজিং সতর্কভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ দাভোস ইকোনমিক ফোরামের মঞ্চে ট্রাম্পের নাম সরাসরি উল্লেখ না করেই কঠোর সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, ‘এটি এমন এক বিশ্বের দিকে মোড় নিচ্ছে, যেখানে কোনো নিয়ম নেই, যেখানে আন্তর্জাতিক আইন পদদলিত হয় এবং যেখানে সাম্রাজ্যবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে কেবল শক্তিমানের আইনই কার্যকর থাকে।’
এভাবে সম্ভাব্য তীব্র বাণিজ্যযুদ্ধের আশঙ্কা বাড়ছে। এমনকি কোনো কোনো মহলে এমন উদ্বেগও তৈরি হয়েছে যে পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ হলে মার্কিন কমান্ডার-ইন-চিফ যদি জোর করে গ্রিনল্যান্ড দখল করার চেষ্টা করেন, তাহলে ৭৬ বছরের পুরোনো ন্যাটো সামরিক জোটও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
ট্রাম্পের সমর্থকেরা যুদ্ধ-পরবর্তী বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার বিপরীতে তাঁর ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ এজেন্ডার সমর্থনে দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে মাঠে নেমেছেন।
বিবিসি নিউজআওয়ারে যখন প্রশ্ন করা হয়, গ্রিনল্যান্ড দখল করা জাতিসংঘের সনদ লঙ্ঘন করবে কি না, তখন রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান র্যান্ডি ফাইন বলেন, ‘আমার মনে হয়, জাতিসংঘ বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে এবং সত্যি বলতে, তারা যা-ই ভাবুক না কেন, সম্ভবত তার উল্টোটা করাই সঠিক কাজ।’
ফাইন গত সপ্তাহে কংগ্রেসে ‘গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণ ও রাজ্য মর্যাদা আইন’ নামে একটি বিল উত্থাপন করেছেন।
যখন মনে হচ্ছে ট্রাম্পের পথে কোনো কিছুই বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না, তখন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বিগ্ন মিত্ররা কীভাবে সাড়া দেবে?
যুক্তরাষ্ট্রের এই খামখেয়ালি প্রেসিডেন্ট যিনি কিনা আবার কমান্ডার-ইন-চিফ, তাঁর সঙ্গে মানিয়ে চলার সর্বোত্তম উপায় খুঁজতে গিয়ে গত এক বছরে কূটনৈতিক অঙ্গনে অনেক মুখরোচক বুলি শোনা গেছে।
যাঁরা মনে করেন আলোচনার মাধ্যমেই সবকিছুর সমাধান সম্ভব, তাঁরা বলেন, ‘তাঁকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। তবে তাঁর সব কথা আক্ষরিক অর্থে ধরলে চলবে না।’
ইউক্রেনে রাশিয়ার বিধ্বংসী যুদ্ধের বিরুদ্ধে ইউরোপের সঙ্গে একযোগে সাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে এই নীতি কিছুটা কাজ করেছে, তবে তা সীমিত পর্যায়ে।
ট্রাম্প প্রায়ই এক সপ্তাহ থেকে আরেক সপ্তাহে তাঁর অবস্থান পরিবর্তন করেন। কখনো তিনি রাশিয়ার কাছাকাছি অবস্থান নেন, পরক্ষণেই ইউক্রেনের দিকে ঝুঁকে পড়েন, তারপর আবার রাশিয়ার কক্ষপথে ফিরে যান।
যাঁরা ট্রাম্পের চরমপন্থী অবস্থানের মধ্যে নিউইয়র্কের আবাসন ব্যবসার কৌশল খুঁজে পান, তাঁরা বলেন, ‘তিনি একজন আবাসন ব্যবসায়ী।’
ইরানের বিরুদ্ধে বারবার সামরিক পদক্ষেপের হুমকির মধ্যেও সেই কৌশলের প্রতিধ্বনি পাওয়া যায়। অবশ্য এটাও স্পষ্ট যে সামরিক বিকল্পগুলো এখনো তাঁর ব্যস্ত টেবিলে রয়ে গেছে।
মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ কূটনীতিক, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে যখন বারবার ট্রাম্পের কৌশল সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়, তখন তিনি ব্যাখ্যা করেন, ‘তিনি গতানুগতিক রাজনীতিবিদদের মতো কথা বলেন না।’
রুবিও পূর্বসূরিদের হতাশাজনক রেকর্ডের সমালোচনা করে প্রেসিডেন্টের সর্বোচ্চ প্রশংসা করে বলেন, ‘তিনি যা বলেন, তা-ই করেন।’
গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের হুমকিকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টায় রুবিও অন্যতম প্রধান কণ্ঠ। তিনি জোর দিয়ে বলছেন, ট্রাম্প এই বিশাল কৌশলগত বরফদ্বীপটি কিনতে চান, সামরিক শক্তি প্রয়োগ করতে চান না।
মার্কো রুবিও উল্লেখ করেন, চীন ও রাশিয়ার হুমকি মোকাবিলায় বিশ্বের বৃহত্তম এই দ্বীপটি কেনার বিকল্পগুলো ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদ থেকেই খতিয়ে দেখছেন।
তবে ট্রাম্পের ভয় দেখানোর কৌশল, সম্মিলিত পদক্ষেপের প্রতি তাঁর অবজ্ঞা এবং ‘জোর যার মুল্লুক তার’—এই নীতিতে তাঁর বিশ্বাসকে অস্বীকার করার উপায় নেই।
দ্য ইকোনমিস্ট ম্যাগাজিনের প্রধান সম্পাদক জ্যানি মিনটন বেডোস বলেন, ‘তিনি দেওয়া-নেওয়া ও শক্তিপ্রয়োগে বিশ্বাসী মানুষ, অনেকটা মাফিয়াদের মতো।’
বেডোস আরও বলেন, ‘তিনি (ট্রাম্প) জোটের উপকারিতা বোঝেন না, তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে একটি আদর্শ বা মূল্যবোধের সমষ্টি হিসেবে দেখেন না, এসব নিয়ে তাঁর কোনো মাথাব্যথা নেই।’
এবং তিনি তা লুকানোর চেষ্টাও করেন না।
এই মাসের শুরুতে নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘ন্যাটোকে রাশিয়া বা চীন মোটেও ভয় পায় না। এক ফোঁটাও না। কিন্তু আমাদের তারা প্রচণ্ড ভয় পায়।’
নিরাপত্তাই যদি মূল বিষয় হতো তবে গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা আগে থেকেই মোতায়েন রয়েছেন এবং ১৯৫১ সালের চুক্তি অনুযায়ী তারা আরও সৈন্য পাঠাতে ও নতুন ঘাঁটি খুলতে পারত।
ট্রাম্প সরাসরি বলেন, ‘আমার এটার মালিকানা চাই।’
এবং ট্রাম্প প্রায়ই স্পষ্ট করে দেন, ‘আমি জিততে ভালোবাসি।’ এর সপক্ষে প্রমাণের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।
গত এক বছরে তাঁর নীতির ডিগবাজি ছিল হতবাক করে দেওয়ার মতো।
গত বছরের মে মাসে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে আমরা দেখেছি, কীভাবে তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বিদেশ সফরে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ ভাষণটি বিপুলভাবে প্রশংসিত হয়েছিল।
ট্রাম্প মার্কিন ‘হস্তক্ষেপকারীদের’ উদ্দেশ করে বলেছিলেন, তারা ‘যতগুলো না রাষ্ট্র গড়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি ধ্বংস করেছে...এমন জটিল সব সমাজে, যা তারা নিজেরাও বুঝত না।’
কথিত আছে, গত বছরের জুনে ইসরায়েল যখন ইরানে হামলা চালায়, তখন ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে সতর্ক করে বলেছিলেন, তেহরানের বিরুদ্ধে সামরিক হুমকি দিয়ে তাঁর কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে যেন ঝুঁকিতে না ফেলা হয়।
সপ্তাহের শেষে, যখন ট্রাম্প দেখলেন ইসরায়েল শীর্ষ পরমাণুবিজ্ঞানী ও নিরাপত্তাপ্রধানদের হত্যা করতে সফল হয়েছে, তখন ট্রাম্প উল্লাসের সঙ্গে বলেন, ‘আমার মনে হয়, এটা চমৎকার হয়েছে।’
বিশ্বজুড়ে ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডকে ভদ্রভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টার করতে কয়েক মাস আগে ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এডওয়ার্ড লুস ‘সেইন-ওয়াশিং’ শব্দটি তৈরি করেন। নিজেদের পক্ষে টানার জন্য নেতারা একের পর এক তাঁর দরজায় হাজির হচ্ছেন জমকালো উপহার ও প্রশংসার ফুলঝুরি নিয়ে।
লুস তাঁর সর্বশেষ কলামে লিখেছেন, ‘ট্রাম্পের সাফাইদাতারা তাঁর নীতিগুলোকে দিনরাত পরিশ্রম করে কোনো না কোনোভাবে যৌক্তিক প্রমাণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।’
গত অক্টোবরে এর একটি পরিপূর্ণ প্রদর্শনী দেখা যায়। মিসরের লোহিত সাগর তীরের শারম আল-শেখে বিশ্বের নেতারা তাঁর সঙ্গে যোগ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রিত হয়েছিলেন। সেখানে ট্রাম্প ঘোষণা করেন, ‘অবশেষে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি এসেছে’, যা ‘৩ হাজার বছরের মধ্যে’ প্রথম।
ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ধাপটি গাজায় একটি অতি প্রয়োজনীয় যুদ্ধবিরতি এবং ইসরায়েলি জিম্মিদের জরুরি মুক্তি নিশ্চিত করেছিল।
এটা ছিল ট্রাম্পের শক্তিশালী কূটনীতি, যা নেতানিয়াহু ও হামাসকে এ চুক্তিতে রাজি হতে বাধ্য করেছিল। এটি ছিল একটি বড় সাফল্য, যা কেবল ট্রাম্পই অর্জন করতে পারতেন।
তবে দুঃখজনকভাবে এটি শান্তির সূচনা ছিল না। সেখানে উপস্থিত কেউ-ই এই অপ্রিয় সত্যটি প্রকাশ্যে বলেননি।
গত বছর ট্রাম্পের নীতিকে ‘ম্যানিফেস্ট ডেসটিনি’ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। এই বছর এটি হয়ে উঠেছে উনিশ শতকের শুরুর ‘মনরো ডকট্রিন’-এর হালনাগাদ সংস্করণ, যা ভেনেজুয়েলা আগ্রাসনের পর থেকে ‘ডনরো ডকট্রিন’ নামে পরিচিতি পেয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন এই নীতির মালিক, তাঁর দলের কট্টর সমর্থকেরা এটিকে সমর্থন করেন। তিনি বিশ্বাস করেন, মার্কিন স্বার্থরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র তার বাড়ির পেছনের উঠানে, এমনকি তার বাইরেও যা খুশি করতে পারে।
কখনো ট্রাম্পকে বিচ্ছিন্নতাবাদী, কখনো হস্তক্ষেপকারী বলা হয়। কিন্তু একটি স্লোগান সব সময় ফিরে আসে, যা তাঁকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে এনেছে—‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’(আমেরিকাকে আবার মহান করো)।
নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী জোনাস গার স্তোরকে লেখা ট্রাম্পের চিঠিটি এই বছর নোবেল শান্তি পুরস্কার না জেতার তীব্র ক্ষোভকে সামনে এনেছে।
স্তোরকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানান: ‘আমি আর কেবল শান্তির কথা ভাবতে বাধ্য নই, যদিও তা সব সময় প্রাধান্য পাবে। তবে এখন আমি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যা ভালো ও সঠিক, তা নিয়ে ভাবতে পারি।’
এই মুহূর্তটি সম্পর্কে জানতে চাইলে নরওয়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসপেন বার্থ এইড কৌশলে বিবিসির এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘এমন দিনে নর্ডিক মেজাজ ধরে রাখতে পারাটা একটা ভালো ব্যাপার।’
নরওয়ে আর্কটিক অঞ্চলে গ্রিনল্যান্ড, ডেনমার্ক এবং সম্মিলিত নিরাপত্তার প্রশ্নে দৃঢ়তার সঙ্গে শান্ত থেকেছে।
ইউরোপের অন্যান্য দেশ অবশ্য নানাভাবে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট মাখোঁ ইইউয়ের (ইউরোপীয় ইউনিয়ন) লোভনীয় বাজারে প্রবেশাধিকার সীমিত করা এবং পাল্টা শুল্ক আরোপের ‘ট্রেড বাজুকা’ চালুর শপথ নিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের অন্যতম ঘনিষ্ঠ ইউরোপীয় মিত্র ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি অস্পষ্টভাবে ‘বোঝাপড়া ও যোগাযোগের সমস্যা’র কথা বলেছেন।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার প্রকাশ্যে ও জোরালোভাবে গ্রিনল্যান্ডের ভৌগোলিক অখণ্ডতার পক্ষে কথা বলেছেন। তবে তিনি পাল্টা শুল্ক এড়িয়ে গত এক বছরে ট্রাম্পের সঙ্গে গড়ে তোলা দৃঢ় ব্যক্তিগত সম্পর্ক রক্ষা করতে চান।
পুরোনো কূটনীতির মাধ্যমে নেতারা ট্রাম্পকে নিজেদের পক্ষে রাখার জন্য যেসব ব্যক্তিগত বার্তা পাঠাচ্ছেন, সেগুলো প্রকাশ করে ট্রাম্প যেন খাপখোলা তলোয়ারের মতো আচরণ করছেন।
‘যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার আগে বৃহস্পতিবার প্যারিসে একসঙ্গে রাতের খাবার খাওয়া যাক,’ প্রস্তাব দিয়েছিলেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট। তিনি ট্রাম্পের অন্যান্য বৈদেশিক নীতির সাফল্যের প্রশংসা করার মাঝে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘গ্রিনল্যান্ড নিয়ে আপনি কী করছেন, তা আমি বুঝতে পারছি না।’
গত বছর ইরান-ইসরায়েল ১২ দিনের সংঘাত বন্ধে বলিষ্ঠ ভূমিকার জন্য ট্রাম্পকে ‘ড্যাডি’ বলে সম্বোধন করা ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে লিখেছেন, ‘আপনাকে দেখার জন্য অধীর হয়ে আছি।’
রুটে ও অন্যেরা সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ন্যাটোর সদস্যদের প্রতিরক্ষা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধির পেছনে ট্রাম্পের সরাসরি হুমকির কৃতিত্ব দিয়েছেন।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদ থেকে দেওয়া সতর্কবার্তাগুলো এমন একটি প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করেছে, যার আহ্বান আগের মার্কিন প্রেসিডেন্টরাও জানিয়েছিলেন এবং রুশ হুমকির মুখে ন্যাটো সদস্যরা নিজেরাও তা শুরু করেছিলেন।
আটলান্টিকের অন্য পারে যে দেশটি দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ছায়ায় আছে, তারা নিজেদের চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও একটি ভিন্ন পথে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
হ্যাঁ, দেশটি হচ্ছে কানাডা। প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি গত সপ্তাহে চীন সফরের সময় মন্তব্য করেছিলেন, ‘আমাদের বিশ্বকে সেভাবেই গ্রহণ করতে হবে, যেভাবে তা আছে; সেভাবে নয়, যেভাবে আমরা তা দেখতে চাই।’
কয়েক বছরের তীব্র উত্তেজনা শেষে ২০১৭ সালের পর এটিই ছিল কোনো কানাডীয় নেতার প্রথম বেইজিং সফর, যা এই দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে।
উত্তরের প্রতিবেশীকে অধিগ্রহণের বিষয়ে ট্রাম্পের আশ্চর্যজনক হুমকি এই সপ্তাহে আবারও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্টে উঠে এসেছে, যেখানে কানাডা, গ্রিনল্যান্ডসহ পশ্চিম গোলার্ধকে মার্কিন পতাকার রঙে ঢাকা দেখানো হয়েছে।
কানাডার নাগরিকেরা বুঝতে পারছেন, পরবর্তী লক্ষ্যবস্তু যে তাঁরা, সে ঝুঁকি এখনো রয়ে গেছে।
সাবেক কেন্দ্রীয় ব্যাংকার কার্নি গত বছর কানাডার সর্বোচ্চ পদে আসীন হন। কানাডীয়রা বিশ্বাস করেছিল, ট্রাম্পকে মোকাবিলা করার জন্য তিনিই সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি।
কার্নি শুরু থেকেই ‘ডলারের জবাবে ডলার’ নীতি গ্রহণ করে পাল্টা শুল্ক আরোপ করেন। দেশটির বাণিজ্যের ৭০ শতাংশেরও বেশি দক্ষিণের প্রতিবেশীর (যুক্তরাষ্ট্র) সঙ্গে হয়ে থাকে।
গতকাল মঙ্গলবার যখন কার্নি দাভোসের মঞ্চে ওঠেন, তিনিও এই সংকটময় মুহূর্ত নিয়ে কথা বলেন।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য জনকল্যাণমূলক সেবা নিশ্চিত করতে, সমুদ্রপথ উন্মুক্ত রাখতে, একটি স্থিতিশীল আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে, সম্মিলিত নিরাপত্তা দিতে এবং বিরোধ নিষ্পত্তির কাঠামো বজায় রাখতে সাহায্য করেছিল।’ এরপরই তিনি সোজাসাপটাভাবে যোগ করেন, ‘এখন আমরা কোনো রূপান্তরের মধ্যে নেই; বরং আমরা একটি ভাঙনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি।’
আজ বুধবার ট্রাম্প সেই একই মঞ্চ থেকে ভাষণ দেবেন এবং সারা বিশ্ব তা দেখবে।
এই মাসে নিউইয়র্ক টাইমস যখন ট্রাম্পকে প্রশ্ন করেছিল, কোন জিনিসটা তাঁকে থামাতে পারে, উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার নিজের নৈতিকতা। আমার নিজের মন। একমাত্র এটিই আমাকে থামাতে পারে।’
এই কথার পেছনেই লুকিয়ে আছে সেই মিত্রদের বিশাল বহর, যারা এখন তাঁকে বোঝাতে, তোষামোদ করতে বা বাধ্য করতে চাইছে, যাতে তিনি তাঁর মন পরিবর্তন করেন।
এবার তারা সফল হবে কি না, তা নিশ্চিত নয়।