মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয়ের সম্ভাবনা প্রবল, তবে জরিপ নিয়ে আশঙ্কাও কি নেই
৩ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রত্যাশা অনেক বেশি। ঐতিহাসিকভাবে একজন অপ্রিয় রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট, খাদ্য ও জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি নিয়ে মার্কিন জনগণের অসন্তোষ এবং বিগত কয়েক মাসের অনুকূল জনমত জরিপ আগামীকাল মঙ্গলবার তাদের জন্য ভালো ফলের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
জরিপের তথ্য অনুযায়ী, কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ২১৮টি আসনের চেয়ে অনেক বেশি আসনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা এগিয়ে রয়েছেন। সিনেটের মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোয় তাঁরা সমানে-সমানে অথবা সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে আছেন।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, সাউথ ক্যারোলাইনার সিনেট নির্বাচনে লড়াই সমানে-সমানে হচ্ছে। অথচ ২০২৪ সালে এই অঙ্গরাজ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্প ১৮ শতাংশ বেশি ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছিলেন। সিএনএনের সাম্প্রতিক জরিপগুলোয় টেক্সাস, কানসাস এবং মেইন অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্র্যাটদের এগিয়ে রাখা হয়েছে।
এই জরিপগুলো কি আসলেই নির্ভুল
মার্কিন রাজনীতির সাম্প্রতিক ইতিহাসে এমন অনেক উদাহরণ রয়েছে, যেখানে জনমত জরিপ, এমনকি নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগের জরিপও ভুল প্রমাণিত হয়েছে। ২০১৬ ও ২০২৪ সালে ট্রাম্প যখন হোয়াইট হাউসের জয় নিশ্চিত করেন, তখন তিনি পূর্বাভাসকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। ২০২০ সালে তাঁর অল্প ব্যবধানের পরাজয়ের আগেও বেশির ভাগ জরিপ ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট প্রার্থী জো বাইডেনের একটি সহজ জয়ের ইঙ্গিত দিয়েছিল।
চলতি বছরের শুরুর দিকে জরিপে দেখা গিয়েছিল, ডেমোক্র্যাট আবদুল আল-সাইদ মিশিগানের ডেমোক্র্যাট–দলীয় সিনেট প্রাইমারিতে দুই অঙ্কের ব্যবধানে জিততে যাচ্ছেন। অথচ বাস্তবে জয়ের ব্যবধান ছিল মাত্র ১ শতাংশ। উইসকনসিনের গভর্নর পদে ডেমোক্র্যাট–দলীয় প্রাইমারিতে যে প্রার্থী জরিপে প্রায় ২০ শতাংশ ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন, তিনি ১ শতাংশেরও কম ব্যবধানে হেরে যান।
পরিচয় সংকটে ভুগছে ডেমোক্র্যাটরা
রাজনৈতিক ও বাজার গবেষণা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ইপসোস পাবলিক অ্যাফেয়ার্সের প্রেসিডেন্ট ক্লিফোর্ড ইয়াংয়ের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় জনমত জরিপ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। কারণ, মানুষ ল্যান্ডলাইন ফোন ব্যবহার ছেড়ে দিচ্ছে। তারা অচেনা কল এড়িয়ে চলছে। ফলে মার্কিন ভোটারদের নাগাল পাওয়া কঠিন হয়ে গেছে। জরিপ পরিচালনাকারীরা যাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন, তাঁদের মধ্যেও অনেকে অংশ নিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করছেন।
ইয়াং বলেন, রক্ষণশীলেরা, বিশেষ করে যাঁরা কট্টর ডানপন্থী, তাঁরা স্বভাবগতভাবেই ক্ষমতাসীনবিরোধী। তাঁরা কোনো কিছুতেই অংশ নেয় না। তাঁরা বর্তমান ব্যবস্থাকে ঘৃণা করেন। এটাই মূল চ্যালেঞ্জ।
যদি রিপাবলিকান ভোটারদের সংগৃহীত তথ্যে নিয়মিতভাবে কম গণনা করা হয় এবং জরিপকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাঁদের ভোটিং মডেল তৈরির সময় বিষয়টি বিবেচনা না করে, তবে উপাত্তগুলো ডেমোক্র্যাটদের দিকে পক্ষপাতদুষ্ট বা একপেশে হয়ে উঠতে পারে।
ভোটারদের আচরণ কেমন হবে, তা পূর্বাভাস দেওয়া জরিপকারীদের জন্য দিন দিন আরও জটিল হয়ে ওঠার পেছনে এটি অন্যতম একটি কারণ।
আগের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনগুলোয় ট্রাম্পের প্রত্যাশার চেয়ে ভালো করার একটি কারণ হলো, তাঁর সমর্থকদের যাঁরা নিয়মিত ভোটার ছিলেন না, তাঁরা প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি সংখ্যায় ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হয়েছিলেন।
সেই অনিশ্চয়তাই সাম্প্রতিক সময়ের জরিপ ভুলের অন্যতম প্রধান কারণ। যদিও বেশির ভাগ নির্ভরযোগ্য জরিপে ভুলের ব্যবধান ছিল মাত্র কয়েক শতাংশ।
হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে এই সামান্য কয়েক পয়েন্টই একজন প্রার্থীর জন্য জয়–পরাজয়ের মধ্যকার পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। আর এ বছর সিনেটের মূল লড়াইয়ের অনেকগুলোই এই স্বল্প ব্যবধানের মধ্যেই রয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় মধ্যবর্তী সাধারণ নির্বাচনের জনমত জরিপগুলো অবশ্য বেশি নির্ভুল প্রমাণিত হয়েছে। এর একটি কারণ হলো, ট্রাম্প এবং অসন্তুষ্ট মার্কিন ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে টেনে আনার তাঁর অনন্য ক্ষমতা।
২০২২ সালে জরিপগুলোয় আভাস দেওয়া হয়েছিল, বাইডেনের কম গ্রহণযোগ্যতা সত্ত্বেও ডেমোক্র্যাটরা প্রথাগত ধারণাকে ভুল প্রমাণ করবে এবং বড় ধরনের নির্বাচনী বিপর্যয় এড়াতে সক্ষম হবে।
কিন্তু দলটি প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল। তবে জয়ের ব্যবধান ছিল সামান্য এবং ডেমোক্র্যাটরা মার্কিন সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছিল।
যদিও এ বছরের প্রাইমারি নির্বাচনগুলোর ফলাফল বড় ধরনের চমক দিয়েছিল। তবে ইয়াং বলেন, প্রার্থী বাছাইয়ের এই লড়াই ঐতিহাসিকভাবেই পরিবর্তনশীল হয়ে থাকে, যেখানে ভোটাররা একেবারে শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেন। সাধারণ নির্বাচনের বর্তমান জনমত জরিপগুলো ভুল, এমনটি ভাবার কারণ হিসেবে এটাকে দেখা উচিত নয়।
প্রেসিডেন্টের নিজস্ব দলের জন্য মধ্যবর্তী নির্বাচনের রাতটি বাজে যাওয়া অতীত থেকেই অনেকটা সাধারণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম উল্লেখযোগ্য উদাহরণ ছিল ২০১০ সাল। ওই নির্বাচনে রিপাবলিকানরা হাউসের ৬০টির বেশি আসন ছিনিয়ে নিয়েছিল এবং সিনেটেও আসন সংখ্যা বাড়িয়েছিল।
আর্থিক মন্দা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে হিমশিম খাওয়া অর্থনীতি এবং প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার স্বাস্থ্যসেবা সংস্কার নিয়ে রক্ষণশীলদের উদ্বেগের কারণে এটি ঘটেছিল। জরিপগুলোয় পরাজয়ের পূর্বাভাস দেওয়া হলেও ধাক্কাটা এতটা বড় হবে, তা ধারণা করা যায়নি।
ডেমোক্র্যাটদের দুশ্চিন্তাও আছে
এবার পরিস্থিতি ঠিক উল্টো। ডেমোক্র্যাটরা এখন বিরোধী দলে এবং অর্থনীতি ভোটারদের ভাবনায় প্রধান বিষয়। কিন্তু ট্রাম্পের কম গ্রহণযোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও এবং ইতিহাস ডেমোক্র্যাটদের অনুকূলে কথা বললেও তাদের জন্য নির্বাচনী রাতটি প্রত্যাশিত বা ঐতিহাসিক ফলাফলের মতো ভালো না-ও হতে পারে। এর পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে।
প্রথমত, এই নির্বাচনে যেসব আসনে মূল লড়াই হচ্ছে, তার বেশির ভাগই মাত্র দুই বছর আগে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প খুব সহজেই দখল করেছিলেন। রিপাবলিকানদের জন্য এগুলো হোম গ্রাউন্ডের মতো।
দ্বিতীয়ত, বছরের পর বছর ধরে হাউস নির্বাচনী এলাকার সীমানা পরিবর্তনের (পুনর্নির্ধারণ) ফলে দলগুলোর মধ্যে আসন পরিবর্তনের সুযোগ কমে এসেছে।
তৃতীয়ত, দেশে রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও গভীর হওয়ার কারণে সুইং ভোটার বা অনিশ্চিত ভোটারের সংখ্যা কমে গেছে। কিছু বিশেষজ্ঞ এই ভোটারদের নির্দিষ্ট ধারায় জমে যাওয়া বা স্থবির বলে বর্ণনা করেছেন।
এ ছাড়া রিপাবলিকানরা বিপুল অর্থের সুবিধা পেয়েছে, যা তাদের প্রচারের শেষ সপ্তাহে আক্রমণাত্মক বিজ্ঞাপনে শত শত মিলিয়ন ডলার খরচ করার সামর্থ্য দিয়েছে।
প্রতিটি পৃথক জরিপের নিজস্ব ভুলের সম্ভাব্য সীমা (মার্জিন অব এরর) থাকে, যা সামগ্রিক জনসংখ্যার তুলনায় নমুনা আকারের ওপর ভিত্তি করে তৈরি একটি পরিসংখ্যানগত অনিশ্চয়তার মাত্রা। তাই একক কোনো জরিপের চেয়ে সব জরিপের গড় হিসাব (পোলিং অ্যাভারেজ) বেশি নির্ভুল পূর্বাভাস দিতে পারে।
এই মুহূর্তে সাম্প্রতিক প্রেসিডেন্ট নির্বাচনগুলোয় দেখা যাওয়া জনমত জরিপের ঝোঁক হিসাব করলেও ইঙ্গিত পাওয়া যায়, ৩ নভেম্বরের রাতটি ডেমোক্র্যাটদের জন্য ভালো হতে পারে। আর জরিপের ভুল উভয় দিকেই হতে পারে। গত বছরের অঙ্গরাজ্য ও বিশেষ নির্বাচনগুলোয় ডেমোক্র্যাটরা বেশির ভাগ জরিপকে পেছনে ফেলে ভালো ফল করেছিল। কারণ, তাদের সমর্থকেরাই অপ্রত্যাশিতভাবে বেশি সংখ্যায় ভোট দিতে এসেছিলেন।
প্রচারের শেষ দিনগুলোয় ট্রাম্পকে এমন সব অঙ্গরাজ্যে সমাবেশ করতে দেখা গেছে, যেখানে তিনি ২০২৪ সালে সহজেই জিতেছিলেন। এটি ডেমোক্র্যাটদের মনে আশা জাগিয়েছে, রিপাবলিকানদের অভ্যন্তরীণ জরিপে হয়তো রক্ষণশীল প্রার্থীরা বিপদে আছেন।
কখনো কখনো শেষ মুহূর্তের মোড় বা পরিবর্তন প্রতিদ্বন্দ্বিতার গতিপথ বদলে দিতে পারে। আবার কখনো সিদ্ধান্তহীনতায় থাকা ভোটাররা, যাঁরা অনেক আসনের ক্ষেত্রে মোট ভোটারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, সবাই একই দিকে ঝুঁকে পড়তে পারেন।
জরিপের ক্ষেত্রে সব সময়ই কিছুটা অনিশ্চয়তা থাকবে। আর সেই অনিশ্চয়তাকে সামলে নেওয়াই হলো এই বিজ্ঞানের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা শিল্পকলা।
ইয়াং বলেন, ‘আমি মনে করি, আমরা আগের চেয়ে ভালো কাজ করছি। তবে আমরা সব সময় যে সমস্যার মুখোমুখি হই, তা কেবল জরিপকারীদের নিয়ে নয়। এর কিছুটা হলো আমরা মানুষকে নিয়ে কাজ করছি। আর মানুষকে বোঝা বা তাদের আচরণ হিসাব করা মোটেও সহজ নয়।’