ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে চীন: ট্রাম্প
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতায় সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য খোলা রাখার পক্ষেও মত দিয়েছেন তিনি।
বেইজিংয়ে সির সঙ্গে বৈঠকের পর ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ দাবি করেছেন।
সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘সি চিন পিং যুদ্ধ বন্ধে সহায়তা করতে চান। তিনি বলেছেন, “আমি যদি কোনোভাবে সাহায্য করতে পারি, তবে অবশ্যই করতে চাই।”’
ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো। যুদ্ধের প্রভাবে এ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে থাকায় বিশ্ব তেল–বাণিজ্যের ওপর ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ এ জলপথ খোলা রাখার পদক্ষেপ নিয়ে বিশ্বজুড়েই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা কাজ করছে।
ট্রাম্প বলেন, চীন হরমুজ প্রণালি খোলা রাখতে চায়। কারণ, দেশটি ওই পথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল আমদানি করে। তিনি বলেন, ‘তারা ওই পথ দিয়ে অনেক তেল কেনে এবং তারা তা চালিয়ে যেতে চায়। তাই তারা হরমুজ প্রণালি খোলা দেখতে চায়।’
ট্রাম্প আরও বলেন, সি চিন পিং তাঁকে আশ্বস্ত করেছেন, চীন ইরানকে সামরিক সরঞ্জাম দেবে না।
তবে এ আশ্বাসে ইরানকে চীনের সম্ভাব্য গোয়েন্দা সহায়তা, ইলেকট্রনিক পণ্য রপ্তানি বা চীনা ক্রেতাদের মাধ্যমে ইরানের তেল বিক্রি থেকে পাওয়া বিপুল আয়ের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল না।
ইরান যুদ্ধে চীনের অবস্থানকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে। কারণ, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরানি তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা চীন। এ তেল বিক্রির আয়ই ইরানের অর্থনীতির বড় ভরসা।
ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের আশা, চীন তার ওই প্রভাব ব্যবহার করে ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রহণযোগ্য শর্তে একটি পারমাণবিক চুক্তিতে রাজি করাতে পারে।
ট্রাম্প বলেন, সি তাঁকে জানিয়েছেন যে চীন ইরান থেকে তেল কেনা চালিয়ে যাবে। তবে বেইজিং চায় না ইরান হরমুজ প্রণালি সামরিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করুক বা সেখানে কার্যত টোল আরোপ করুক।
চীনের সরকারি বিবৃতিতে অবশ্য ইরান প্রসঙ্গ সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি।
হোয়াইট হাউস থেকে প্রকাশিত দুই নেতার প্রথম দিনের বৈঠকের সারসংক্ষেপে বলা হয়, ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র না পায়, সে বিষয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে একমত হয়েছেন সি চিন পিং। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমাতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও বেশি তেল কিনতে আগ্রহ দেখিয়েছে চীন।
হোয়াইট হাউসের বিবৃতিতে বলা হয়, ‘দুই পক্ষ একমত হয়েছে, জ্বালানি সরবরাহের স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখতে হরমুজ প্রণালি অবশ্যই খোলা রাখতে হবে।’
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সি চিন পিং হরমুজ প্রণালিকে সামরিকীকরণ বা সেখানে চলাচলের জন্য টোল আরোপের বিরোধিতা করেছেন।
এই শীর্ষ বৈঠক এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যখন মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি সামরিক সম্পৃক্ততা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। অনেকের আশঙ্কা, এতে এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। একই সময় তাইওয়ান ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের তৎপরতাও বেড়েছে।
বৈঠকে সি চিন পিং ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলেন, দুই দেশের সম্পর্কের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক একটি ইস্যু তাইওয়ান। এ ইস্যুতে বিদ্যমান বিরোধ ঠিকঠাক সামলানো না গেলে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে।
চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সি চিন পিং বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রকে তাইওয়ান ইস্যু অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে। এতে ভুল হলে দুই দেশ সংঘর্ষের দিকে চলে যেতে পারে এবং পুরো চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক অত্যন্ত বিপজ্জনক অবস্থায় পৌঁছাতে পারে।’
বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে দুই নেতার প্রথম দিনের বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। ট্রাম্প ‘গ্রেট হল অব দ্য পিপল’-এ পৌঁছালে সি তাঁকে স্বাগত জানান। এ সময় ট্রাম্পকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। শিশুরা ফুল আর চীন-যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা নেড়ে অতিথিকে বরণ করে নেয়।
সফরে ট্রাম্প সিকে বারবার ‘একজন মহান নেতা’ বলে উল্লেখ করেন। অন্যদিকে সি এ দুই পরাশক্তির মধ্যে ‘কৌশলগত স্থিতিশীলতা’ বজায় রাখার ওপর জোর দেন।
ট্রাম্প যেখানে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও চুক্তির বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়েছেন, সেখানে সি বারবার দুই দেশের মধ্যে সংঘাত এড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
সি চিন পিং বলেন, ‘চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের অভিন্ন স্বার্থ আমাদের মতপার্থক্যের চেয়ে অনেক বড়। সহযোগিতা দুই পক্ষের জন্যই উপকারী, আর সংঘাত উভয়ের জন্য ক্ষতির।’
ট্রাম্প বলেন, চীন যুক্তরাষ্ট্র থেকে সয়াবিন, তেল ও এলএনজি কেনার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। পাশাপাশি ২০০টি বোয়িং ৭৩৭ উড়োজাহাজ কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।