আদালতে হাজির নিহত বাংলাদেশি শিক্ষার্থী লিমন–বৃষ্টির বন্ধুরা কে কী বলেছেন
‘আমরা বাংলাদেশিরা এখানে একটি পরিবারের মতো বসবাস করি। আমরা একসঙ্গে খাবার খাই, একসঙ্গে বেড়াতে যাই, ঘুরতে যাই’—হিশাম আবুঘরবেহর জামিন শুনানির দিন আদালতকক্ষে উপস্থিত জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির বন্ধু আবীর আল হাসিব সৌরভ এভাবেই ফ্লোরিডায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যকার বন্ধনের কথা বললেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে দুই বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির হত্যাকাণ্ডে সন্দেহভাজন খুনি হিসেবে লিমনের রুমমেট হিশাম আবুঘরবেহকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
১৬ এপ্রিল টাম্পা বে এলাকায় ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার দুই শিক্ষার্থী লিমন ও বৃষ্টি নিখোঁজ হন। পরদিন বৃষ্টির একজন বন্ধু তাঁদের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে জানান।
গত শুক্রবার লিমনের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করে ফ্লোরিডার স্থানীয় পুলিশ। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে লিমন খুন হয়েছেন বলে জানানো হয়। বৃষ্টির মরদেহের বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
এ ঘটনায় সন্দেহভাজন খুনি হিসেবে হিশাম সালেহ আবুঘরবেহ নামের এক মার্কিন তরুণকে গত শুক্রবার গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ২৪ বছর বয়সী হিশাম আর লিমন সাউথ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের বাইরে একই অ্যাপার্টমেন্টের একটি কক্ষে শেয়ারে ভাড়া থাকতেন।
হিশামের বিরুদ্ধে প্রথম শ্রেণির দুটি হত্যার অভিযোগসহ আরও কয়েকটি অভিযোগ করা হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার হিলসবরো কাউন্টির একটি আদালত আবুঘরবেহকে জামিন না দিয়ে কারাবন্দী করে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। এদিন সরাসরি বিচারপ্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করতে বাংলাদেশিদের একটি দল আদালতে উপস্থিত ছিল। তাঁদের মধ্যে বেশির ভাগই লিমন ও বৃষ্টির সহপাঠী ও বন্ধু।
তাঁদের একজন সালমান সাদিক শুভ বলেন, ‘আমাদের বন্ধুদের সঙ্গে ঠিক কী ঘটেছে, সেটা আমরা জানতে চাই।’
জামিল ও বৃষ্টি হাত্যাকাণ্ড নিয়ে চলমান মামলার বিষয়ে অনেকেই উদ্বিগ্ন জানিয়ে সালমান আরও বলেন, ‘আমরা নিজেদের দায়িত্বশীল মনে করি, আমাদের খুব ঘনিষ্ঠভাবে ঐক্যবদ্ধ থাকা উচিত বলে মনে করি। আমাদের অন্য বন্ধুরা আছে, অন্যান্য মানুষও আছে, যারা লিমন ও বৃষ্টিকে ভালোবাসে এবং তাদের হত্যা মামলা নিয়ে উদ্বিগ্ন। এখানে আমরা যা দেখছি, পর্যবেক্ষণ করছি, তাদের তা জানাতে চাই।’
রিফাতুল ইসলাম নামের আরেক তরুণ বলেন, ‘এখনো অনেক প্রক্রিয়া বাকি। দেখুন, আমরা যখন এখানে আসি, বাড়ি থেকে ৮ হাজার মাইল দূর থেকে—এখানে তারাই আমাদের পরিবার, আমাদের সবকিছু। সব অনুষ্ঠানে আমরা সবাই সবার সঙ্গে দেখা করি।’
রিফাতুল আরও বলেন, ‘আমরা এটা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না। যে জায়গাকে আমরা সবচেয়ে নিরাপদ স্থান বলে মনে করি—আমাদের বাড়ি, আমাদের নিজের ঘর, আমাদের নিজের রান্নাঘর—সেখানেই তাদেরকে হত্যা করা হয়েছে। এটা আমাদের খুবই হতবাক করেছে। আমি বুঝতে পারছি না কী বলব, এ অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।’
স্টেট অ্যাটর্নি সুজি লোপেজ আদালতে লিমন ও বৃষ্টির বন্ধু এবং সহপাঠীদের এমন সরব উপস্থিতির বিষয়টি লক্ষ করেছেন।
লোপেজ বলেন, ‘আমি ভাবতেও পারিনি, তাঁদের এত বন্ধু আসবেন। তবে আমরা ভেবেছিলাম, তাঁদের পরিবারের একজন সদস্য উপস্থিতি থাকবেন।’
লিমন–বৃষ্টিকে ন্যায়বিচার পাইয়ে দিতে তাঁদের বন্ধুদের এই সমর্থন দেখে স্টেট অ্যাটর্নি খুবই খুশি হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘অন্যান্য শিক্ষার্থী ও বন্ধু ওই দুজনকে আপন করে নিচ্ছেন, যাঁদের তাঁরা হারিয়েছেন এবং তাঁদের জন্য ন্যায়বিচার পাওয়ার এই প্রক্রিয়ার অংশ হতে চাইছেন। এটা জানতে পারা সত্যিই দারুণ।’
হিলসবরো কাউন্টি জজ জে লোগান মারফি মঙ্গলবার আবুঘরবেহকে জামিন না দিয়ে কারাগারে রাখার আদেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে আবুঘরবেহকে কোনো সাক্ষী বা নিহত ব্যক্তিদের কোনো স্বজনের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগের চেষ্টা না করার নির্দেশও দিয়েছেন বিচারক।
গতকাল মঙ্গলবার সকালে সংক্ষিপ্ত শুনানিতে এসব আদেশ দেন বিচারক মারফি। আবুঘরবেহ এদিন আদালতে উপস্থিত ছিলেন না।
প্রসিকিউটররা আশা করছেন, আগামী ৭ মে তাঁরা মামলাটি গ্র্যান্ড জুরির সামনে উপস্থাপন করতে সক্ষম হবেন। দোষী সাব্যস্ত হলে আবুঘরবেহর সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হতে পারে।
লোপেজ বলেন, ‘কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। প্রথমে আমাদের গ্র্যান্ড জুরি প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে হবে, এরপর আমরা ঠিক করব, আমরা মৃত্যুদণ্ড চাইব কি না।’
আবীর আল হাসিব সৌরভ বলেন, ‘এখন আমাদের মূল লক্ষ্য ও সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হলো, এই ব্যক্তিকে ন্যায়বিচারের আওতায় আনা। এই মুহূর্তে এটিই আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।’