আইসিই কী, যুক্তরাষ্ট্রে কেন তাদের অভিযান নিয়ে এত বিতর্ক

বিক্ষোভকারীদের নিরুৎসাহিত করতে কাঁদানে গ্যাস ছুড়ছেন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের মিনিয়াপোলিস, ২১ জানুয়ারি ২০২৬ছবি: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের মিনিয়াপোলিস শহরে সম্প্রতি ৩৭ বছর বয়সী রিনি নিকোল গুড নামের এক নারী দেশটির ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট সংস্থার (আইসিই যা আইস নামে পরিচিত বেশি) এক সদস্যের গুলিতে নিহত হন। এ ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাটির প্রতি মানুষের মনোভাব হয়ে ওঠে আরও ক্ষুব্ধ।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় দফায় হোয়াইট হাউসে আসার পর থেকে আইসিই তৎপরতা বৃদ্ধি করেছে। হাজার হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করেছে।

আইসিই সদস্যরা যেভাবে গ্রেপ্তার অভিযান পরিচালনা করছেন, তা নিয়ে মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে বিরূপ মনোভাব বেড়েছে। কখনো কখনো তা সংঘাতের পর্যায়ে গড়িয়েছে।

আইসিই কী এবং কখন গঠিত হয়েছিল

অভিবাসীদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে ব্যাপকহারে বহিষ্কার করা ট্রাম্পের অন্যতম নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। এ কাজে নেতৃত্ব দিচ্ছে আইস।

ট্রাম্প প্রশাসনের প্রথম ৯ মাসে ১৭০টির বেশি এমন ঘটনা ঘটেছে, যেখানে আইসিইর সদস্যরা (ফেডারেল এজেন্ট) মার্কিন নাগরিকদের তাঁদের ইচ্ছার বিপরীতে আটক করেছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদ সংস্থা প্রোপাবলিকা

ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর আইসিইর বাজেট ও কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে। সংস্থাটি অভিবাসন আইন প্রয়োগ করে এবং অবৈধ অভিবাসন–সম্পর্কিত তদন্ত পরিচালনা করে। অবৈধ অভিবাসীদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কারেও ভূমিকা রাখে।

যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি আইনের অংশ হিসেবে ২০০২ সালে আইসিই গঠিত হয়। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার পর হোমল্যান্ড সিকিউরিটি দপ্তরটি (ডিএইচএস) চালু করা হয়। আইসিই এ বিভাগের অধীন পরিচালিত একটি সংস্থা।

আইসিই সদস্যদের কি গ্রেপ্তারের ক্ষমতা আছে

আইসিই নিজের কাজকে জননিরাপত্তা ও জাতীয় নিরাপত্তা—উভয় দিক থেকে দেখে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সাধারণ পুলিশ বিভাগ ও আইসিইর ক্ষমতার মধ্যে কিছু পার্থক্য আছে।

চলতি মাসের মাসের শুরুতে মিনিয়াপোলিসে রিনি গুড যখন এক আইসিই সদস্যের গুলিতে নিহত হন, তখন তিনি গাড়ি চালাচ্ছিলেন।

যুক্তরাষ্ট্রে কোনো বাসিন্দাকে অবৈধ বলে সন্দেহ হলে আইসিই তাঁকে থামাতে, আটক ও গ্রেপ্তার করতে পারে। তবে কোনো বাড়ি বা ব্যক্তিগত পরিসরে (স্পেস) প্রবেশের জন্য তাদের পরোয়ানার দরকার হয়।

কোনো মার্কিন নাগরিক যদি গ্রেপ্তারে বাধা দেন বা কোনো কর্মকর্তার ওপর আক্রমণ করেন, আইসিই সদস্যরা তাঁদেরও আটক করতে পারেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদ সংস্থা প্রোপাবলিকার তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসনের প্রথম ৯ মাসে ১৭০টির বেশি এমন ঘটনা ঘটেছে, যেখানে আইসের সদস্যরা (ফেডারেল এজেন্ট) মার্কিন নাগরিকদের তাঁদের কোনো প্রমাণিত কারণ ছাড়াই আটকে করেছিলেন। এসব ঘটনার মধ্যে এমন কিছু মার্কিন নাগরিকও ছিলেন, যাঁদের অবৈধ অভিবাসী সন্দেহে আটক করা হয়েছিল। কিন্তু তাঁরা ছিলেন সাধারণ মার্কিন নাগরিক।

ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট সংস্থার (আইসিই বা আইস) বিরোধী একটি প্ল্যাকার্ড। কলোরাডো অঙ্গরাজ্যের হাডসনে, ২১ জানুয়ারি ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

আইসিইর কি বলপ্রয়োগের ক্ষমতা আছে

আইসিইর বল প্রয়োগের ক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান, আইন ও হোমল্যান্ড সিকিউরিটি দপ্তরের নিজস্ব নীতি-নির্দেশনার সমন্বয়ে পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়।

২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৬৫ হাজার মানুষ আইসিইর আটককেন্দ্রে ছিলেন।
ট্র্যানজেকশনাল রেকর্ডস অ্যাকসেস ক্লিয়ারিং হাউস

টেনেসি অঙ্গরাজ্যের ন্যাশভিল শহরের ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যায়বিচার কর্মসূচির পরিচালক ক্রিস স্লোবোগিন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুসারে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ‘কেবল তখনই প্রাণঘাতী বল প্রয়োগ করতে পারে, যদি ব্যক্তি তাদের বা অন্য মানুষের জন্য গুরুতর বিপদের কারণ হয়। অথবা ওই ব্যক্তি যদি সহিংস কোনো অপরাধ করে’।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ঐতিহাসিকভাবে এমন নীতি অনুসরণ করে এসেছেন, যেখানে মুহূর্তের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়া কর্মকর্তাদের অনেক বেশি ছাড় দেওয়া হয়।

হোমল্যান্ড সিকিউরিটির ২০২৩ সালের একটি নির্দেশিকায় বলা হয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্মকর্তারা কেবল তখনই প্রাণঘাতী বল ব্যবহার করতে পারবেন, যখন যুক্তিসংগত কারণে মনে হয়, কেউ তাঁদের বা অন্য কাউকে তাৎক্ষণিকভাবে মারাত্মক আঘাত করতে বা মৃত্যু ঘটাতে পারে।

মিনিয়াপোলিসে ১৪ জানুয়ারি পর্যন্ত আইসিই এবং অন্যান্য কেন্দ্রীয় সংস্থার প্রায় ২ হাজার সদস্য মোতায়েন ছিলেন। একই সময়ে সেখানে ইউএস কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশনের অতিরিক্ত ৮০০ সদস্যও ছিলেন।

চলতি মাসের শুরুতে মিনিয়াপোলিসে রিনি গুড যখন এক আইসিই সদস্যের গুলিতে নিহত হন, তখন তিনি গাড়ি চালাচ্ছিলেন। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, ওই আইসিই সদস্য আত্মরক্ষায় গুলি চালিয়েছেন। কিন্তু স্থানীয় কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলছেন, রিনি গুড ওই আইস সদস্যের জন্য কোনো বিপদ সৃষ্টি করেননি।

রিনি গুডের মৃত্যুকে ঘিরে কেন্দ্রের সঙ্গে মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়। এ ঘটনায় রাজ্য সরকার ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেছে। আইসিই সদস্যদের মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যে মোতায়েন বন্ধ করতে এ মামলা করা হয়েছে।

আইসিই সাধারণত কোথায় কাজ করে

আইসিই সদস্যরা সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে কাজ করেন। তবে সংস্থাটির কিছু কর্মী বিদেশেও থাকেন। এর সহযোগী সংস্থা ইউএস কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান সীমান্তরক্ষী বাহিনী হিসেবে পরিচিত।

৫৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মার্কিন নাগরিক মনে করেন, অবৈধ অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর পদ্ধতি নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন ‘বাড়াবাড়ি’ করছে।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপ

কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন বিভিন্ন কেন্দ্রীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা থেকে সদস্যদের এনে অভিবাসন আইন প্রয়োগের কাজে যুক্ত করেছে। ফলে কোন বাহিনীর কোন সদস্য কখন কোন কাজ করছেন, তা ক্রমে অস্পষ্ট হয়ে গেছে। সীমান্তরক্ষীর কর্মকর্তারা বর্তমানে সীমান্ত এলাকার চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে বেশি করে কাজ করছেন এবং আইসিইর সদস্যদের সঙ্গে অভিযানে অংশ নিচ্ছেন।

আইসিই ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অন্যান্য সংস্থা লস অ্যাঞ্জেলেস, শিকাগো ও মিনিয়াপোলিসের মতো শহরে শত শত কর্মকর্তা মোতায়েন করেছে। অন্যান্য কেন্দ্রীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে মিলে তাঁরা নানা অভিযানে অংশ নিচ্ছেন।

মিনিয়াপোলিসে ১৪ জানুয়ারি পর্যন্ত আইসিই ও অন্যান্য কেন্দ্রীয় সংস্থার প্রায় দুই হাজার সদস্য মোতায়েন ছিলেন। একই সময়ে সেখানে ইউএস কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশনের অতিরিক্ত ৮০০ সদস্যও ছিলেন।

আইসিই যাঁদের আটক করে, তাঁদের কী হয়

ট্রাম্প প্রশাসন চলতি মেয়াদে অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর কার্যক্রম ব্যাপকহারে বৃদ্ধি করেছে। এক বছর আগে ক্ষমতা গ্রহণের পর তাঁর প্রশাসন অভিবাসীদের নিজ দেশে ফেরত যাওয়ার জন্য বড় ধরনের প্রচার চালিয়েছে। তাঁদের গ্রেপ্তারের ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে।

বিভিন্ন জরিপে দেখা যায়, ট্রাম্পের অভিবাসন আইন নিয়ে মার্কিন নাগরিকদের দৃষ্টিভঙ্গি সরল নয়।

ট্রাম্প প্রশাসনের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি থেকে ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে ৬ লাখ ৫ হাজার মানুষকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। একই সময়ে প্রায় ১৯ লাখ অভিবাসী ‘স্বেচ্ছায় নিজ দেশ ফিরে গেছেন’।

কোনো অভিবাসী যদি আইসিইর হাতে ধরা পড়েন, তাহলে তিনি নানা পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারেন।

কখনো কখনো কোনো অভিবাসীকে সাময়িকভাবে আটক করা হতে পারে। এরপর জেরা করে ছেড়ে দেওয়া হতে পারে। কখনো কখনো কোনো অভিবাসীকে দীর্ঘ সময় আটক রাখা হতে পারে। তাঁকে আইসিইর বড় কোনো আটককেন্দ্রে রাখা হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে আইসিইর বড় বড় আটককেন্দ্র রয়েছে।

আটক অবস্থা থেকে অনেক অভিবাসী আইনি লড়াইয়ের সুযোগ পান। কিন্তু এতে ব্যর্থ হলে তাঁদের ফেরত পাঠানো হতে পারে।

ট্র্যানজেকশনাল রেকর্ডস অ্যাকসেস ক্লিয়ারিং হাউসের (ট্র্যাক) তথ্যমতে, ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৬৫ হাজার মানুষ আইসিইর আটককেন্দ্রে ছিলেন।

অনেক অভিবাসন আইনজীবী বিবিসিকে বলেন, কেউ আইসিইর হাতে একবার আটক হলে তিনি কোথায় আছেন, তা তাঁর পরিবার বা আইনজীবীরা জানতে অনেক দিন লেগে যেতে পারে।

বিশপ হেনরি হুইপল কেন্দ্রীয় ভবনের বাইরে আইসের কিছু সদস্য। রিনি নিকোল গুডকে হত্যার কয়েক দিন পর মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের মিনিয়াপোলিসে, ১০ জানুয়ারি ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

আইসিইর বিরুদ্ধে বিরোধিতা কেমন

আইসিই ও ইউএস কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশনের অভিযানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরের বাসিন্দারা প্রতিবাদ জানিয়েছেন। এখন আইসিই সদস্যদের গ্রেপ্তার অভিযান ভিডিও করা স্থানীয় মানুষের জন্য সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। কখনো কখনো আইসিই সদস্য ও স্থানীয় মানুষেদের মধ্যে ভয়াবহ রকমের সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।

ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের শিকাগো শহরে আইসিইর অভিযান নিয়ে সংবাদমাধ্যমের একটি জোট ইউএস কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। তাদের অভিযোগ, এসব বাহিনীর সদস্যরা সাংবাদিক, ধর্মীয় নেতা ও প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে মাত্রাতিরিক্ত বল প্রয়োগ করেছেন।

একজন কেন্দ্রীয় বিচারক সংবাদমাধ্যমের পক্ষে রায় দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে একটি আপিল আদালত সেই রায় বাতিল করে দেন।

মার্কিন নাগরিকদের মত

বিভিন্ন জরিপে দেখা যায়, ট্রাম্পের অভিবাসন আইন নিয়ে মার্কিন নাগরিকদের দৃষ্টিভঙ্গি সরল নয়।

গবেষণা সংস্থা পিউ রিসার্চ সেন্টারের গত অক্টোবরের এক জরিপ ফলে দেখা যায়, অর্ধেকের চেয়ে কিছু বেশি মার্কিন নাগরিক মনে করেন, কিছু ক্ষেত্রে অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোটা প্রয়োজনীয়। এর আগে গত মার্চে রিসার্চের আরেকটি জরিপে প্রায় সমসংখ্যক মানুষ একই ধরনের মত দিয়েছিলেন।

তবে পিউ রিসার্চ সেন্টারের একই জরিপে বলা হয়, মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে ট্রাম্পের অভিবাসীদের ফেরত পাঠানো নিয়ে ভিন্ন চিন্তাভাবনা আছে। এতে দেখা যায়, ৫৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মার্কিন নাগরিক মনে করেন, অবৈধ অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর পদ্ধতি নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন ‘বাড়াবাড়ি’ করছে। তবে প্রায় ৩৬ শতাংশ মার্কিন নাগরিক এ পদ্ধতিকে সমর্থন করেন।