ট্রাম্পের হুমকির পর ওয়াশিংটনকে সহযোগিতার ইঙ্গিত মাদুরোর অনুগত ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী সরকারের

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে আদালতে হাজির করার জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আটককেন্দ্র থেকে হেলিকপ্টারে করে নিউইয়র্কে আদালতের কাছের একটি হেলিপোর্টে নেওয়া হয়। সেখান থেকে ভ্যানে তুলে আদালতে নেওয়ার কথা। যুক্তরাষ্ট্র, ৫ জানুয়ারিছবি: রয়টার্স

ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলা মাদুরোকে আজ সোমবার স্থানীয় সময় সকাল ৯টার দিকে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের একটি ফেডারেল আদালতে হাজির করা হয়েছে। যেখানে তাঁর বিরুদ্ধে ‘মাদক পাচারের’ অভিযোগের শুনানি হবে।

আর কয়েক ঘণ্টা পর নিউইয়র্কে অবস্থিত জাতিসংঘের সদর দপ্তরে সংস্থাটির নিরাপত্তা পরিষদে ভেনেজুয়েলায় পরিচালিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান আইনসম্মত কি না, তা নিয়ে আলোচনা হবে।

লাতিন আমেরিকার দেশ পানামায় ১৯৮৯ সালে প্রায় একই ধরনের সামরিক অভিযান চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। তুলে নিয়ে গিয়েছিল দেশটির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে। এরপর অঞ্চলটিতে ভেনেজুয়েলায় গত শনিবার ভোররাতে সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযান চালাল যুক্তরাষ্ট্র। দ্রুতগতির এ অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনীর সদস্যরা হেলিকপ্টারে করে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে মাদুরোর সুরক্ষিত অবস্থান স্থলে প্রবেশ করেন। অল্প সময়ের মধ্যে নিরাপত্তাবলয় ভেঙে মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে তুলে নিয়ে যান মার্কিন সেনারা।

ওয়াশিংটনের সঙ্গে সহযোগিতার ইঙ্গিত

মাদুরোকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর ভেনেজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন। আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর শপথ নেওয়ার কথা রয়েছে। শুরুতে তিনি মাদুরোই ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট দাবি করে ঔপনিবেশিক শক্তির কাছে মাথা নত না করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন।

কিন্তু গতকাল রোববার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দেন, কারাকাসের নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্রের কথা না শুনলে, ভেনেজুয়েলায় আবার হামলা চালানো হবে। ট্রাম্পের এমন হুমকির পর নিজের অবস্থান পরিবর্তন করে ওয়াশিংটনের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করার ইঙ্গিত দেন রুদ্রিগেজ।

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে তুলে নিয়ে যাওয়ার প্রতিবাদে ‘কোলেকটিভোস’ নামের মিলিশিয়া গোষ্ঠীর সদস্যরা বিক্ষোভ মিছিল করেছেন। ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে, ৪ জানুয়ারি ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

রুদ্রিগেজের বর্তমান অবস্থান

মাদুরোকে ধরে নিয়ে যাওয়ার প্রথম মন্তব্যে রুদ্রিগেজ বলেছিলেন, ‘আমাদের প্রেসিডেন্টকে অপহরণ করা হয়েছে। এটা ঔপনিবেশিক শক্তির তেল লুটের পাঁয়তারা।’

কিন্তু ট্রাম্পের হুমকির পর গতকাল রোববার রুদ্রিগেজ বলেন, ‘আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্মানজনক সম্পর্ক এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী যৌথ উন্নয়ন প্রকল্পে কাজ করতে চাই, যাতে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের স্থায়ী পরিবেশ তৈরি হয়। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, আমাদের জনগণ ও অঞ্চল যুদ্ধ নয়, শান্তি ও সংলাপের দাবিদার।’

৫৬ বছর বয়সী রুদ্রিগেজ দেশটির বামপন্থী এক গেরিলা নেতার কন্যা। তিনি ‘চাভিস্টা’ আন্দোলনের দৃঢ় সমর্থক। ভেনেজুয়েলার প্রয়াত নেতা হুগো চাভেজের নাম ও আদর্শে এ আন্দোলন শুরু করেন মাদুরো। এ আন্দোলনের প্রতি দৃঢ় সমর্থনের কারণে রুদ্রিগেজকে ‘বাঘিনী’ উপাধি দিয়েছিলেন মাদুরো।

আরও পড়ুন

রুদ্রিগেজ ‘চাভিস্টা’ আন্দোলনের সমর্থক হলে অনেকের বিশ্বাস, প্রগতিশীল অর্থনীতির প্রতি তাঁর আস্থা রয়েছে। তাঁর সঙ্গে দেশটির বেসরকারি খাতের সুসম্পর্ক রয়েছে। ভেনেজুয়েলার জনগণের একটি বড় অংশের কাছে তিনি বিলাসবহুল পোশাকের জন্য পরিচিত।

রোববার ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার আবার হামলা চালানোর পাশাপাশি অঞ্চলটির অন্য দেশ কলম্বিয়া ও মেক্সিকোকেও হুমকি দেন। কিউবাকে লক্ষ্য করে ট্রাম্প বলেন, এই দেশের কমিউনিস্ট সরকার ‘নিজেই পতনের মুখে রয়েছে’।

আরও পড়ুন
ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে মাদুরোর অনুগত ‘কোলেকটিভোস’ নামের মিলিশিয়া গোষ্ঠীর সদস্যদের বিক্ষোভ
ছবি: রয়টার্স

জ্বালানি তেলে ট্রাম্পের চোখ

মাদুরোকে ‘স্বৈরশাসক’ ও ‘মাদক সম্রাট’ বলে ভর্ৎসনা করলেও লাতিন আমেরিকার দেশটির বৃহৎ জ্বালানি তেলের ভান্ডারে ভাগ বসানো নিয়ে ট্রাম্পের কোনো লুকোচুরি নেই। মাদুরোকে আটকের কয়েক ঘণ্টা পর সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প খোলামেলাভাবে বলেন, ভেনেজুয়েলার তেল খাতে আমাদের কোম্পানিগুলো শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে। এখান থেকে উভয় দেশের মানুষ উপকৃত হবে।

তথ্যমতে, এখন পর্যন্ত বিশ্বে আবিষ্কৃত জ্বালানি তেলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে ভেনেজুয়েলায়, যার পরিমাণ প্রায় ৩০ হাজার ৩০০ কোটি ব্যারেল। অধিকাংশ তেল মজুত রয়েছে অরিনোকো অঞ্চলে।

কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি অব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগের অভাব এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে জ্বালানি তেলের বিপুল ভান্ডার থেকে ভেনেজুয়েলা তেমন একটা উপকৃত হতে পারেনি।

গত বছর দৈনিক গড়ে ১১ লাখ ব্যারেল তেল উত্তোলন করেছে ভেনেজুয়েলা। অথচ ১৯৭০-এর দশকে দেশটির দৈনিক তেল উত্তোলনের সক্ষমতা ছিল এর প্রায় তিন গুণ।

আরও পড়ুন