নিজের অনুগত বিল পুল্টিকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দাপ্রধান বানালেন ট্রাম্প, কেন তাঁকে নিয়ে বিতর্ক

  • বিল পুল্টির জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ে কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই

  • তিনি ফেডারেল হাউজিং ফাইন্যান্স এজেন্সির পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন

  • পুল্টি মর্টগেজ নিয়ন্ত্রক হিসেবে তাঁর ভূমিকা ব্যবহার করে প্রতিপক্ষদের লক্ষ্যবস্তু করেছেন

  • সিনেটের অনুমোদন ছাড়া তিনি সর্বোচ্চ ২১০ দিন দায়িত্ব পালন করতে পারেন

বিল পুল্টিফাইল ছবি: রয়টার্স

তুলসী গ্যাবার্ডের পদত্যাগের ঘোষণার পর বিল পুল্টিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গতকাল মঙ্গলবার এ নিয়োগের মাধ্যমে ট্রাম্প তাঁর এমন একজন রাজনৈতিকভাবে অনুগত ব্যক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিস্তৃত গোয়েন্দা কার্যক্রমের নেতৃত্বে বসালেন, যাঁর জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ে কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। এমন এক সময়ে এই নিয়োগ দেওয়া হলো, যখন বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উত্তেজনা চলছে।

৩৮ বছর বয়সী বিল পুল্টি ফেডারেল আবাসন নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা। অপেক্ষাকৃত কম আলোচিত একটি মর্টগেজ (গৃহঋণ) নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান হিসেবে নিজের পদ ব্যবহার করে তিনি ট্রাম্পের কয়েকজন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মর্টগেজ জালিয়াতির অভিযোগে তদন্তের দাবি তুলেছেন। যদিও এসব অভিযোগের কোনোটিই এখন পর্যন্ত ফৌজদারি মামলায় রূপ নেয়নি বা অপরাধমূলক অভিযোগ গঠনের পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

বিল পুল্টি বিদায়ী গোয়েন্দাপ্রধান তুলসী গ্যাবার্ডের স্থলাভিষিক্ত হবেন। ডেমোক্র্যাটরা এবং অন্তত একজন রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা বিল পুল্টিকে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তদারকির জন্য অযোগ্য বলে কঠোর সমালোচনা করেছেন।

বিল পুল্টিকে গোয়েন্দাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ দিতে সিনেটের অনুমোদন নেননি ট্রাম্প। সিনেটের অনুমোদন ছাড়া পুল্টি সর্বোচ্চ ২১০ দিন এই পদে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। এই সময়সীমা তাঁকে আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের সময় পর্যন্ত পদে বহাল থাকার সুযোগ দেবে।

মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার চেষ্টা করবে।

একাধিক দায়িত্ব

ট্রাম্প জানিয়েছেন, বিল পুল্টি ফেডারেল হাউজিং ফাইন্যান্স এজেন্সির পরিচালক এবং সরকার-সমর্থিত মর্টগেজ প্রতিষ্ঠান ফ্যানি মে ও ফ্রেডি ম্যাকের চেয়ারম্যান হিসেবে তাঁর বর্তমান দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখবেন। একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ১৮টি গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করবেন।

অর্থাৎ পুল্টি একই সময়ে আবাসন অর্থায়ন খাতের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো ধরে রাখার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা ব্যবস্থারও নেতৃত্ব দেবেন।

ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ‘উইলিয়ামের (বিল পুল্টির) যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো পরিচালনার ব্যাপক অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি আর্থিক বাজারের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার কাজে যুক্ত ছিলেন এবং ফ্যানি মে ও ফ্রেডি ম্যাকে ১০ ট্রিলিয়ন (১০ লাখ কোটি) ডলারের বেশি সম্পদ ও কার্যক্রম তদারকি করেছেন। গত ১২ মাসে এই পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।’

গোয়েন্দা কার্যক্রমে কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও বিল পুল্টি এখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (সিআইএ) এবং ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সির (এনএসএ) তদারকির দায়িত্বে থাকবেন। এনএসএ হলো একটি বৃহৎ গোয়েন্দা সংস্থা, যা বিদেশি যোগাযোগের ওপর নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহ করে এবং সাইবার হামলার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষায় সহায়তা করে।

সিনেটে রিপাবলিকান দলের নেতা জন থুন বলেছেন, ট্রাম্প যদি বর্তমান অস্থায়ী নিয়োগের মেয়াদ শেষে বিল পুল্টিকে এই পদে স্থায়ীভাবে মনোনয়ন দিতে চান, সে ক্ষেত্রে অল্প ব্যবধানে বিভক্ত সিনেটে এর অনুমোদন পাওয়া কঠিন হতে পারে।

জন থুন আরও বলেন, ‘যদি আমরা তাঁকে এই পদে স্থায়ীভাবে দেখতে চাই, তাহলে তাঁর সামনে দীর্ঘ ও কঠিন একটি পথ অপেক্ষা করছে।’

ট্রাম্পের মনোনীত প্রধান কর্মকর্তা তুলসী গ্যাবার্ড গত মাসে তাঁর পদত্যাগের ঘোষণা দেন, ৩০ জুন তাঁর পদত্যাগ কার্যকর হবে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন তুলসী।

রয়টার্সের খবর অনুযায়ী, হোয়াইট হাউসের সঙ্গে মতবিরোধ ও টানাপোড়েনের কারণে তুলসীকে এই পদ থেকে সরে যেতে বাধ্য করা হয়েছে।

তবে তুলসী গ্যাবার্ড বলেছেন, তাঁর স্বামীর ক্যানসার শনাক্ত হওয়ার পর পারিবারিক কারণে তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

বিল পুল্টির মতোই তুলসী গ্যাবার্ডও ঐতিহ্যগতভাবে নির্দলীয় ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বলে বিবেচিত জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালকের পদটি ট্রাম্পের রাজনৈতিক স্বার্থ এগিয়ে নিতে ব্যবহার করেছেন। তিনি ২০২০ সালের নির্বাচনে জালিয়াতি হয়েছে—ট্রাম্পের এমন ভিত্তিহীন দাবিগুলোর তদন্তের প্রচেষ্টায় অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন।

পুল্টির এই নিয়োগ এমন এক সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ এবং আরও নানা বৈদেশিক নীতিগত চ্যালেঞ্জের মধ্যে জড়িয়ে রয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে ইউক্রেন যুদ্ধ এবং চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স থেকে মন্তব্যের জন্য বিল পুল্টির সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল, কিন্তু সাড়া মেলেনি।

দলীয় গুন্ডা

সিনেট গোয়েন্দা কমিটির সদস্য রিপাবলিকান নেতা জন কর্নিন বলেন, ‘আমি এই কাজের জন্য (বিল পুল্টির মধ্যে) কোনো যোগ্যতার প্রমাণ দেখতে পাচ্ছি না।’

রিপাবলিকান সিনেটর কর্নিন বলেন, পুল্টি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা করতে উৎসাহ দিয়েছেন। তিনি নিউইয়র্কের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিসিয়া জেমস, ক্যালিফোর্নিয়ার সিনেটর অ্যাডাম শিফ এবং ফেডারেল রিজার্ভের গভর্নর লিসা কুকের বিরুদ্ধে মর্টগেজ জালিয়াতির অভিযোগ তুলেছেন।

লেটিটিয়া জেমস ও অ্যাডাম শিফ—দুজনই ডেমোক্রেটিক নেতা। আর লিসা কুক হলেন সাবেক ডেমোক্রেটিক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন মনোনীত একজন নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।

ফেডারেল গ্র্যান্ড জুরি বিচার বিভাগের আনা মামলায় লেটিসিয়া জেমসকে অভিযুক্ত করার আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে। কর্মকর্তারা এখনো অ্যাডাম শিফের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আনেননি তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

ট্রাম্প ফেডারেল রিজার্ভের গভর্নর লিসা কুককে বরখাস্ত করার চেষ্টা করেছিলেন—যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো প্রেসিডেন্টের এমন পদক্ষেপ ছিল নজিরবিহীন। এই পদক্ষেপটি পুল্টির অপ্রমাণিত অভিযোগের ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছিল, পরে আদালত তাঁকে পদে বহাল থাকার অনুমতি দেন। আগামী সপ্তাহে সুপ্রিম কোর্ট এই মামলায় চূড়ান্ত রায় দেবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

সিনেটে ডেমোক্রেটিক নেতা চার্লস শুমার বিল পুল্টিকে ‘দলীয় পক্ষপাতদুষ্ট গুন্ডা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

শুমার বলেন, ‘যে ব্যক্তি নিজের অপছন্দের রাজনৈতিক পদাধিকারীদের বিরুদ্ধে এমন ভিত্তিহীন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও অগ্রহণযোগ্য অভিযোগ আনতে পারে, তাঁকে আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্বে বিশ্বাস করা যায় না।’

পুল্টি তাঁর পরিবারের আবাসন নির্মাণ প্রতিষ্ঠান পুল্টি গ্রুপের উত্তরাধিকারী। তাঁর দাদা ১৯৫০-এর দশকে এই কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন।

আরও পড়ুন