রয়টার্স–ইপসস জনমত জরিপ
ট্রাম্পের মানসিক ও শারীরিক সক্ষমতা নিয়ে মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ
যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পের তৎকালীন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বয়স ও মানসিক সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগের কারণে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। তারপর ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হয়েছিলেন তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস। সেই নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্প জয়ী হয়েছিলেন।
কিন্তু ট্রাম্পের চার বছরের মেয়াদের এক বছর পার হতেই জনমত জরিপ বলছে, আমেরিকানরা কেবল তাঁর কাজের পারফরম্যান্স নিয়েই অখুশি নন, তাঁরা তাঁর মানসিক সক্ষমতা নিয়েও ক্রমেই চিন্তিত হয়ে পড়ছেন।
এই অস্বস্তি অবশ্য বাইডেনের মতো অতটা তীব্র নয়। বাইডেন যখন নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান, তখন তাঁর বয়স ছিল ৮১। কিন্তু বর্তমানে ৭৯ বছর বয়সী ট্রাম্পের জন্য এটি একটি ক্রমবর্ধমান সমস্যা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
সাম্প্রতিক একাধিক জরিপে দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক কোনো না কোনোভাবে ট্রাম্পের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। এমনকি অনেক রিপাবলিকানও এ বিষয়ে উদ্বিগ্ন।
সবচেয়ে চমকপ্রদ জরিপটি এসেছে গত মঙ্গলবার ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম ‘স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন’–এর ভাষণের ঠিক আগে। এই ভাষণে তিনি কংগ্রেসে দীর্ঘতম বক্তৃতার নিজের রেকর্ডটিই ভেঙে দিয়েছেন।
রয়টার্স-ইপসস পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, ৬১ শতাংশ মার্কিন মনে করেন, ট্রাম্প ‘বয়সের সঙ্গে সঙ্গে খামখেয়ালি হয়ে গেছেন’। এমনকি ৩০ শতাংশ রিপাবলিকানও এই মতের সঙ্গে একমত।
এই জরিপটি ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের কিছু জরিপের কথা মনে করিয়ে দেয়। তখনো অনেক মার্কিন নাগরিক তাঁর মানসিক তীক্ষ্ণতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। ২০২১ সালে ক্যাপিটল হিলে হামলার পর কুইনিপিয়াক ইউনিভার্সিটির জরিপে প্রায় ৫০ শতাংশ ভোটার তাঁকে ‘মানসিকভাবে স্থিতিশীল নন’ বলে মনে করতেন। তবে তা কখনোই বর্তমানের ৬১ শতাংশের মতো গরিষ্ঠতায় পৌঁছায়নি।
রয়টার্স-ইপসস জরিপে আরও দেখা গেছে, যাঁরা মনে করেন, ট্রাম্প ‘মানসিকভাবে তীক্ষ্ণ ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম’, তাঁদের সংখ্যা কমে গেছে। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে এই হার ছিল ৫৪ শতাংশ, যা বর্তমানে ৪৫ শতাংশে নেমে এসেছে।
তবে ট্রাম্প প্রায়ই কগনিটিভ টেস্টে (মানসিক পরীক্ষা) সফল হওয়ার বড়াই করে থাকেন। গত মঙ্গলবার রাতে তিনি ১ ঘণ্টা ৪৭ মিনিট ভাষণ দিয়েছেন। অবশ্য তিনি এখনো বাইডেনের মতো খারাপ অবস্থায় নেই। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে যখন বাইডেন নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান, তখন মাত্র এক-চতুর্থাংশ মার্কিন নাগরিক তাঁকে মানসিকভাবে তীক্ষ্ণ মনে করতেন।
অন্যান্য জরিপও একই কথা বলছে। গত মাসে সিএনএনের এক জরিপে দেখা গেছে, ট্রাম্পের ‘কার্যকরভাবে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের মতো স্ট্যামিনা ও তীক্ষ্ণতা আছে’—এমনটি বিশ্বাস করা মানুষের হার ৫৩ শতাংশ থেকে কমে ৪৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এই ৪৬ শতাংশ হার বাইডেনের ২০২৩ সালের হারের (২৫% থেকে ৩২%) চেয়ে অনেক বেশি।
গত সপ্তাহে ওয়াশিংটন পোস্ট-এবিসি নিউজ-ইপসসের পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, অর্ধেকের বেশি মানুষ মনে করেন, ট্রাম্পের কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালনের মতো মানসিক তীক্ষ্ণতা (৫৬ শতাংশ) বা শারীরিক সুস্থতা (৫১ শতাংশ) নেই। ২০২৩ সালের মে মাসের তুলনায় মানসিক তীক্ষ্ণতার বিষয়ে সন্দেহ ১৩ পয়েন্ট বেড়েছে এবং শারীরিক সুস্থতার বিষয়ে সন্দেহ বেড়েছে ২৩ পয়েন্ট।
এসব সংখ্যা বাইডেনের শেষ সময়ের মতো অতটা খারাপ নয়। তখন বাইডেনের উভয় ক্ষেত্রেই হার ৬০ শতাংশের ওপরে ছিল। তবে ট্রাম্পের মানসিক তীক্ষ্ণতা নিয়ে সন্দেহের হার (৫৬ শতাংশ) বর্তমানে ঠিক সেই পর্যায়ে আছে, যেখানে বাইডেন তাঁর মেয়াদের এই সময়ে ছিলেন। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাইডেনের হার ছিল ৫৪ শতাংশ।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের আরেক জরিপে দেখা গেছে, ট্রাম্পের মানসিক সুস্থতার ওপর ‘খুব আত্মবিশ্বাসী’ মানুষের সংখ্যা এক বছর আগে থাকা ৩৯ শতাংশ থেকে কমে বর্তমানে ৩২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। শারীরিক সুস্থতার ক্ষেত্রে এটি ৩৫ শতাংশ থেকে ২৮ শতাংশে নেমেছে।
রয়টার্স-ইপসস জরিপের মতোই রিপাবলিকান ও রিপাবলিকানঘেঁষা স্বতন্ত্র মানুষের মধ্যে এসব সংখ্যা বেশ উদ্বেগজনক। ট্রাম্পের নিজ সমর্থকদের মধ্যে মানসিক সুস্থতার ওপর ‘খুব আত্মবিশ্বাসী’ মানুষের হার ৭৫ শতাংশ থেকে কমে ৬৬ শতাংশ হয়েছে এবং শারীরিক সুস্থতার ক্ষেত্রে এটি ৬৫ শতাংশ থেকে ৫৫ শতাংশে নেমেছে।
অর্থাৎ রয়টার্স ও পিউ উভয় জরিপেই দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্পের নিজের শিবিরের প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৩ জন বা তার বেশি মানুষ এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।
ট্রাম্পের ক্ষেত্রে এই সূচক কেন খারাপ হচ্ছে
একটি ব্যাখ্যা হতে পারে যে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমার সঙ্গে সঙ্গে এসব সংখ্যাও কমছে। মানুষ যখন সামগ্রিকভাবে ট্রাম্পের ওপর বিরক্ত হচ্ছেন, তখন হয়তো তাঁরা তাঁর অদ্ভুত আচরণগুলোকে আরও বেশি নেতিবাচকভাবে দেখছেন।
তবে আমরা দেখছি, যাঁরা ট্রাম্পকে পছন্দ করেন, তাঁরাও এখন উদ্বিগ্ন। ট্রাম্পের কথার মধ্যে ভুল করা—যেমন বারবার আইসল্যান্ড ও গ্রিনল্যান্ডকে গুলিয়ে ফেলা—হয়তো মানুষের মনে দাগ কাটছে। এ ছাড়া তাঁর হাতে কালশিটে দাগ নিয়ে আলোচনা, জনসমক্ষে তাঁর ঘুমিয়ে পড়ার গুঞ্জন, তাঁর স্বাস্থ্য পরীক্ষার বিষয়ে হোয়াইট হাউসের তথ্য দিতে দেরি করা এবং তাঁর জনসমক্ষে উপস্থিতির কর্মসূচি—এসবই মানুষের মনে প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
যা–ই হোক, এটি পরিষ্কার যে ইতিহাসের সবচেয়ে বয়সী নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট এখন ঠিক একই সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন, যেমনটি কয়েক বছর আগে তাঁর পূর্বসূরি হয়েছিলেন।