প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওজন বেড়েছে, কমানোর পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকেরা

হোয়াইট হাউসের মন্ত্রিসভা কক্ষে কথা বলছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ২৭ মে ২০২৬, ওয়াশিংটনছবি: রয়টার্স

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চিকিৎসকের কাছ থেকে পাওয়া তিন পাতার একটি প্রতিবেদন গতকাল শুক্রবার শেষ রাতে প্রকাশ করেছে হোয়াইট হাউস। এই সপ্তাহে ওয়াল্টার রিড ন্যাশনাল মিলিটারি মেডিক্যাল সেন্টারে তাঁর শারীরিক পরীক্ষা করা হয়েছিল। এই প্রতিবেদনে তারই বিস্তারিত ফলাফল রয়েছে।

অতীতেও ট্রাম্পের চিকিৎসকেরা তাঁর ইতিবাচক স্বাস্থ্য প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন। সেখানে প্রেসিডেন্টের চমৎকার শারীরিক অবস্থা এবং ভালো স্বাস্থ্য অভ্যাসের ওপর জোর দেওয়া হতো। সর্বশেষ প্রকাশিত প্রতিবেদনটি লিখেছেন প্রেসিডেন্টের চিকিৎসক ড. শন পি. বারবাবেলা।

এই চিকিৎসকও ট্রাম্পের স্বাস্থ্য নিয়ে একই রকম আশাব্যঞ্জক মূল্যায়ন দিয়েছেন। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, ৭৯ বছর বয়সী প্রেসিডেন্টের ‘স্বাস্থ্য চমৎকার এবং তাঁর হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস, স্নায়ুতন্ত্র ও সামগ্রিক শারীরিক কার্যক্ষমতা বেশ শক্তিশালী।’

প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন ইতিহাসে প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়া সবচেয়ে বয়সী ব্যক্তি ট্রাম্পকে একগুচ্ছ শারীরিক ও মানসিক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। গত বছর তাঁর হৃদ্‌যন্ত্র ও রক্তনালি ব্যবস্থার পরীক্ষা-নিরীক্ষা বৃদ্ধি এবং ‘ক্রনিক ভেনাস ইনসাফিসিয়েন্সি’ (শারীরিক অবস্থা যেখানে শিরাগুলোর মাধ্যমে রক্ত হৃৎপিণ্ডে ফিরে যেতে সমস্যা হয়) ধরা পড়ার পর প্রেসিডেন্টের একটি ইকোকার্ডিওগ্রাম (হৃৎপিণ্ডের আলট্রাসাউন্ড ছবি) করা হয়েছিল।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের উচ্চ কোলেস্টেরলের ইতিহাস রয়েছে এবং তাঁর এলডিএল (খারাপ) কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে তিনি ক্রিস্টর এবং জেটিয়া নামের দুটি ওষুধ খান। এ ছাড়া হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে তিনি প্রতিদিন উচ্চমাত্রার অ্যাসপিরিনও নেন। কম মাত্রার অ্যাসপিরিন সেবনে চিকিৎসকদের দেওয়া উপদেশ এবং চিকিৎসা নির্দেশিকা তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন।

ওয়াল্টার রিডে ডোনাল্ড ট্রাম্প বেশ কিছু স্নায়বিক পরীক্ষাও দিয়েছেন—যার মধ্যে রয়েছে মন্ট্রিয়ল কগনিটিভ অ্যাসেসমেন্ট বা ‘মোকা’। এটি ১০ মিনিটের একটি পরীক্ষা, যা ডিমেনশিয়া, আলঝেইমার বা অন্যান্য মানসিক সমস্যার লক্ষণগুলো যাচাইয়ের জন্য করা হয়। আগের মতোই ট্রাম্প এই পরীক্ষায় ৩০-এ ৩০ পেয়েছেন।

প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের এপ্রিলে শারীরিক পরীক্ষার পর থেকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওজন ১৪ পাউন্ড বেড়েছে। বর্তমানে তাঁর ওজন ২৩৮ পাউন্ড, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় স্থূলতা বা ওবেসিটির সীমার কাছাকাছি।

ট্রাম্প প্রায়ই তাঁর বন্ধু বা কর্মীদের যাঁরা স্থূলতা কমানোর ওষুধ নেন, তাঁদের নিয়ে জনসমক্ষে রসিকতা করেন। ট্রাম্প নিজে বলেছেন, তিনি কখনো ওজন কমানোর ওষুধ নেননি। সঙ্গে যোগ করেছেন, ‘সম্ভবত আমার নেওয়া উচিত’।

ড. বারবাবেলা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন, ‘তাঁকে (ট্রাম্প) প্রতিরোধমূলক পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে খাদ্যাভ্যাস-সংক্রান্ত গাইডলাইন, কম মাত্রার অ্যাসপিরিন নেওয়া, শারীরিক পরিশ্রম বৃদ্ধি করা এবং ওজন কমানো।’

ট্রাম্প আগামী ১৪ জুন ৮০ বছরে পা দেবেন। তাঁর স্বাস্থ্য নিয়ে জনমনে নানামুখী আলোচনা রয়েছে। তাঁর মধ্যে ক্লান্তির লক্ষণ বাড়ছে এবং প্রেসিডেন্টের স্বাস্থ্যের বিস্তারিত তথ্য নিয়ে তাঁর চিকিৎসক ও সহকারীদের কথায় স্পষ্টতার অভাব দেখা গেছে।

উদাহরণস্বরূপ, ট্রাম্পের হাতে প্রায়ই স্পষ্ট কালশিটে দাগ দেখা গেছে। যখন তাঁর ডান হাতে এই কালশিটে দেখা যায়, তখন হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা বলেছিলেন, এটি হাত মেলানোর কারণে হয়েছে। তিনি মেকআপ দিয়ে সেই দাগগুলো ঢাকা শুরু করেন।

এরপর যখন ট্রাম্পের বাঁ হাতে কালশিটে দেখা যায়, তখন ট্রাম্প বলেন, টেবিলে হাত লাগায় এটি হয়েছে এবং তিনি অ্যাসপিরিন খাচ্ছেন।

ড. বারবাবেলা তাঁর প্রতিবেদনে দুটি ব্যাখ্যাই অন্তর্ভুক্ত করে বলেছেন, এই কালশিটে দাগ হলো ‘অ্যাসপিরিন থেরাপির সাধারণ প্রতিক্রিয়া, যা ক্ষতিকর নয়’।

ট্রাম্পের পায়ে প্রায়ই ফুসকুড়ি বা ফোলাভাব লক্ষ্য করা যায়, যা প্রেসিডেন্টের চিকিৎসক ও সহকারীরা তাঁর ‘ক্রনিক ভেনাস ইনসাফিসিয়েন্সি’-এর ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। গতকাল শুক্রবার ড. বারবাবেলার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘পায়ের নিচের অংশে সামান্য ফোলাভাব লক্ষ করা গেছে, যা গত বছরের তুলনায় ভালো।’

তবে গত বছর ট্রাম্পের স্বাস্থ্য প্রতিবেদনে পায়ের এই ফোলাভাবের কোনো উল্লেখ ছিল না। সেখানে বলা হয়েছিল, ট্রাম্পের ‘অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও পেশিগুলো পুরোপুরি সচল, রক্ত চলাচল স্বাভাবিক। কোনো ফোলাভাব নেই।’

চলতি বছরের শুরুর দিকে প্রেসিডেন্টের ঘাড়ে র‍্যাশ বা ফুসকুড়ি দেখা গিয়েছিল। ড. বারবাবেলা আগে বলেছিলেন, ‘খুবই সাধারণ’ ওষুধ ক্রিম দিয়ে প্রেসিডেন্টের এই র‍্যাশ দূর করার চিকিৎসা চলছে। ড. বারবাবেলা অবশ্য বলেননি, সেই চর্মরোগ আসলে কী ছিল বা ট্রাম্প কী ওষুধ নিচ্ছিলেন। শুক্রবারের প্রতিবেদনের চর্মরোগ (ডার্মাটোলজি) বিভাগে এই র‍্যাশের কোনো উল্লেখ ছিল না।

এক দশকের বেশি সময় ধরে ট্রাম্প, তাঁর চিকিৎসক ও সহকারীরা প্রায়ই প্রেসিডেন্টের ফিটনেস এবং স্বাস্থ্যগত অবস্থা সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত, অস্পষ্ট বা অতিরিক্ত ইতিবাচক বক্তব্য দিচ্ছেন।

ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত চিকিৎসক ড. হ্যারল্ড বোর্নস্টাইন ২০১৫ সালের শেষের দিকে বলেছিলেন, ট্রাম্প হবেন ‘প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত এযাবৎকালের সবচেয়ে স্বাস্থ্যবান ব্যক্তি।’

ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসের চিকিৎসক ড. রনি এল. জ্যাকসন ২০১৮ সালে বলেছিলেন, আরও ভালো খাদ্যাভ্যাস থাকলে ট্রাম্প ২০০ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারতেন।

ট্রাম্প নিজে প্রায়ই কখন এবং কেন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়েছেন, তা ব্যাখ্যা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে ট্রাম্প যখন নির্বাচনী প্রচারে ফিরে আসেন, তখন তাঁর চিকিৎসক এক পৃষ্ঠার একটি অস্পষ্ট স্বাস্থ্য প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিলেন। তাতে ট্রাম্পের ওজন, রক্তচাপ, কোলেস্টেরলের মাত্রা বা কোনো প্রেসক্রিপশনের ওষুধের মতো মৌলিক তথ্যও ছিল না।

ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের আগে তাঁর মৌলিক স্বাস্থ্য রেকর্ডের অনেক তথ্যই প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন।