৫ হাজার কিলোমিটার পথ উড়ে কীভাবে ক্যালিফোর্নিয়ায় গেল গ্যালাপাগোসের অ্যালবাট্রস
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের মধ্যাঞ্চলে উপকূলের কাছে একটি জাহাজে গবেষণার কাজ করছিলেন বিজ্ঞানীরা। সম্প্রতি তাঁরা এক বিরল অতিথি পাখির দেখা পেয়েছেন। এর নাম ঢেউখচিত অ্যালবাট্রস (ওয়েভড অ্যালবাট্রস)। নথিভুক্ত হিসাব অনুযায়ী, মধ্য আমেরিকার উত্তরাঞ্চলে এ প্রজাতির পাখি এবার নিয়ে মাত্র দ্বিতীয়বার দেখা গেছে।
হলুদ ঠোঁট, কালো বোতাম-চোখের এই পাখির ডানার বিস্তার প্রায় ৮ ফুট (২ দশমিক ৪ মিটার)। এই পাখি জীবনের বেশির ভাগ সময় সমুদ্রে ওড়াউড়ি করে কাটায়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জে প্রজননকারী এ পাখি কীভাবে এবং কেন প্রায় ৪ হাজার ৮০০ কিলোমিটার (৩ হাজার মাইল) দূরে ক্যালিফোর্নিয়ায় এল? বিজ্ঞানীরা এ ধাঁধার কূলকিনারা পাচ্ছেন না।
বিজ্ঞানীদের ভাষায়, এটি একটি ‘ভ্যাগ্রান্ট’ পাখি। অর্থাৎ এমন এক ধরনের পাখি, যা তার স্বাভাবিক বিচরণ এলাকা ছাড়িয়ে অনেক দূরে চলে যায়। পাখিটিকে পয়েন্ট পিয়েদ্রাস ব্লাঙ্কাস উপকূল থেকে প্রায় ৩৭ কিলোমিটার দূরে, সান ফ্রান্সিসকো ও লস অ্যাঞ্জেলেসের মাঝামাঝি এলাকায় দেখা গেছে।
গবেষণা জাহাজে থাকা সামুদ্রিক পাখিবিদ ট্যামি রাসেল বলেন, পাখিটির ‘শিগগিরই দক্ষিণে (গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জে) ফিরে যাওয়ার কোনো লক্ষণ দেখাচ্ছে না।’ গত অক্টোবরেও পাখিটিকে সম্ভবত উত্তর ক্যালিফোর্নিয়া উপকূলে দেখা গিয়েছিল।
রাসেল বর্তমানে সান ফ্রান্সিসকো শহরের ফারালন ইনস্টিটিউটের চুক্তিভিত্তিক বিজ্ঞানী এবং ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সান ডিয়েগোর স্ক্রিপস ইনস্টিটিউশন অব ওশানোগ্রাফির পোস্টডক্টরাল গবেষক হিসেবে কাজ করছেন।
রাসেল ফেসবুকে লিখেছেন, ‘যা দেখেছি, তা আমি বিশ্বাস করতে পারছি না। বিষয়টি আমার কাছে এখনো বিস্ময়কর। পাখিটি এত দূরে কীভাবে এল, তা নিশ্চিত করে বলা প্রায় অসম্ভব।’
সম্ভবত কোনো ঝড় পাখিটিকে উত্তরে (ক্যালিফোর্নিয়ার দিকে) ঠেলে দিয়েছে। তবে কিছু পাখির স্বভাবই এমন—তারা অন্যদের চেয়ে অনেক দূরে ঘুরে বেড়ায়।
ই–মেইলে রাসেল লিখেছেন, ‘গত মৌসুমে পাখিটি সম্ভবত প্রজনন করেনি। কারণ, প্রাপ্তবয়স্ক অ্যালবাট্রসরা বসন্তে ডিম পাড়ে। জানুয়ারির মধ্যে ছানারা বাসা ছাড়ে। প্রজননবিহীন এই সময়ে হয়তো সে ঘুরে বেড়াতে বেরিয়েছে। হয়তো শিগগির গ্যালাপাগোসে ফিরে সঙ্গীর সঙ্গে পরের মৌসুমে মিলিত হবে।’
তবে কিছুটা সংশয়ের সুরে এই পাখি–গবেষক বলেন, কে জানে, এটা আর কত দিন এখানে থাকবে বা আদৌ ফিরে যাবে কি না?
নিউইয়র্কের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাখিবিদ্যা গবেষণাগারের (ল্যাব অব অরনিথোলজি) ইবার্ড প্রকল্পের প্রধান মার্শাল ইলিফ বলেন, অ্যালবাট্রসের মতো সামুদ্রিক পাখিরা খাবারের খোঁজে দীর্ঘ দূরত্ব পাড়ি দিতে পারে।
ই-মেইলে ইলিফ লেখেন, ‘কখনো কখনো (এ প্রজাতির) কোনো পাখি একাকী স্বাভাবিক বিচরণ এলাকা ছাড়িয়ে অনেক দূরে, এমনকি ভুল গোলার্ধে বা খুব বিরল ক্ষেত্রে ভুল মহাসাগরেও চলে যেতে পারে। খাদ্যের সংকট পাখিকে ঘুরে বেড়াতে বাধ্য করতে পারে। আবার এটি নিছক একধরনের দুর্ঘটনাও হতে পারে। এখন পর্যন্ত এটিকে নিছক ব্যতিক্রমী ঘটনা ছাড়া অন্য কিছু বলার প্রমাণ নেই।’
ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন) গ্যালাপাগোসের সবচেয়ে বড় এই অ্যালবাট্রস প্রজাতিকে চরম বিপন্ন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।
আমেরিকান বার্ড কনজারভেন্সির তথ্যমতে, এ প্রজাতির পাখির বিচরণক্ষেত্র মূলত উষ্ণমণ্ডলে সীমাবদ্ধ। আগ্নেয়গিরির গলিত পাথরের তৈরি বিস্তীর্ণ মাঠ, ছড়িয়ে থাকা পাথর ও বিরল উদ্ভিদের মধ্যে এরা বাসা বাঁধে।
ঢেউখচিত অ্যালবাট্রস সর্বোচ্চ ৪৫ বছর পর্যন্ত বাঁচে। মাছ, স্কুইড ও ক্রাস্টেশিয়ান (কাঁকড়া ও চিংড়িজাতীয় প্রাণী) এদের প্রধান খাবার।
ট্যামি রাসেল বলেন, ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূলে একাধিক ঢেউখচিত অ্যালবাট্রস দেখা গেলে তা পরিবেশগত কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত হতে পারত।
এই নারী পাখিবিদ আগে লিখেছিলেন, ক্যালিফোর্নিয়া উপকূলে এখন পাঁচ প্রজাতির বুবি পাখির বিচরণ সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। উষ্ণতা বৃদ্ধি ও সামুদ্রিক তাপপ্রবাহের কারণে এটা হয়েছে।
কিন্তু এই নিঃসঙ্গ ঢেউখচিত অ্যালবাট্রস সম্পর্কে রাসেলের মতে, ‘এটা যদি এ প্রজাতির পাখির ভবিষ্যতে উত্তর দিকে সরে যাওয়ার ইঙ্গিত হয়, তাহলে কখন এ প্রজাতির প্রথম পাখিটি এখানে শনাক্ত হয়েছিল, সেটার একটি সূত্র আমরা পেয়ে গেলাম।’